পেঁয়াজ: রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলতে ভারতের ওপর চাপ বাড়ছে, আন্দোলনে মহারাষ্ট্রের চাষীরাও

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

বিদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার জন্য ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সোমবার আচমকা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা প্রত্যাহার করার জন্য সে দেশের সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

কূটনৈতিকভাবে যেমন বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নোট পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে, তেমনি ভারতের ভেতরেও পেঁয়াজ চাষী ও ব্যবসায়ীরা সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটানা আন্দোলন শুরু করেছেন।

মহারাষ্ট্রের সিনিয়র রাজনীতিবিদ ও এনসিপি দলের নেতা শরদ পাওয়ারও পেঁয়াজচাষীদের দাবিকে সমর্থন করছেন, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলকেও তিনি রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন।

তবে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে সরকারি মুখপাত্র পেঁয়াজ রফতানি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।

বস্তুত ভারতের পেঁয়াজ অবাধে বাংলাদেশ কিংবা নেপাল-শ্রীলঙ্কায় রফতানি করতে দিতে হবে, এই দাবিতে এ দেশের চাষীরা রাস্তায় নেমেছেন এমন ঘটনা স্মরণকালের মধ্যে ঘটেনি।

আরও পড়তে পারেন:

কিন্তু ভারতের পেঁয়াজের প্রধান পাইকারি বাজার, নাসিকের কাছে লাসালগাঁওতে জাতীয় সড়ক অবরোধ করে মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষীরা গত তিনদিন ধরে ঠিক সেটাই করে যাচ্ছেন।

রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে সেখানে স্লোগান দিচ্ছেন রাজ্যের পেঁয়াজ চাষীরা, মহারাষ্ট্রে যাদের বলা হয় 'কান্ডা শ্বেতকারী'।

কৃষক গঙ্গাধর শাঠে বিবিসিকে বলছিলেন, "স্বর্ণের ভরি বাহান্ন হাজার রুপি ছাপিয়ে গেছে, মাংসের কেজি সাতশো রুপির বেশি - তাতে কারও মাথাব্যথা নেই, আর পেঁয়াজের দাম পঞ্চাশ রুপি ছুঁতে-না-ছুঁতেই রফতানি বন্ধ করে দিতে হবে, এটা আবার কেমন কথা?"

আসলে করোনাভাইরাস লকডাউনের প্রথম কয়েক মাসে মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজচাষীরা তাদের ফলনের তেমন একটা দাম পাননি বললেই চলে।

দেশের বড় বড় শহরের খুচরো বাজারেও পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি পনেরো-বিশ রুপির মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছে।

সবেমাত্র দু-তিনসপ্তাহ আগে পেঁয়াজের দাম বাড়তে আরম্ভ করে - আর তারাও অল্প লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন।

পেঁয়াজ বিদেশে রফতানি হলে লাভের অঙ্কটাও বেশি হয়, কিন্তু এখন সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই তারা সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ।

মাঝারি মাপের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী ভীমা দীঘালে জানাচ্ছেন, "পরে ভাল দাম পাওয়ার আশায় আমি মে মাসে পাঁচশো কুইন্টাল পেঁয়াজ মজুত করেছিলাম।"

"লকডাউনে দাম তো মেলেইনি, সেই মজুতের বেশিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সামান্য যেটুকু বাঁচাতে পেরেছিলাম তা দিয়ে ক্ষতি এখন কিছুটা পুষিয়ে নেব ভেবেছিলাম, কিন্তু সরকার সেই আশাতেও বাদ সাধল!"

মারাঠি অর্থনীতিবিদ মিলিন্দ মুরাগকরও বিবিসিকে বলছিলেন, "পেঁয়াজ রফতানি আটকে দিয়ে সরকার যেমন বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পথ বন্ধ করে দিল - তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিরও বিপুল ক্ষতি করল।"

"লকডাউনের আগে থেকেই অর্থনীতির বেহাল দশা চলছে, রফতানি বন্ধ করলে তা তো একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে! এ জিনিস একেবারেই মানা যায় না," মন্তব্য মি. মুরাগকরের।

ধারণা করা হচ্ছে, বিহারের আসন্ন নির্বাচনকে মাথায় রেখে পুরোপুরি রাজনৈতিক কারণেই সরকার রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে - যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দাম নাগালে রাখা যায়।

তবে সেই নিষেধাজ্ঞা থেকে বাংলাদেশ যাতে ছাড় পেতে পারে সে জন্য ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত।

নিষেধাজ্ঞা যাতে পুনর্বিবেচনা করা হয়, সে জন্য গত বাহাত্তর ঘন্টায় দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরানও ভারতের শীর্ষ সরকারি পর্যায়ে নানা মহলেই কথাবার্তা বলেছেন, আর তাতে কিছুটা ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া গেছে বলে আভাস দেয়া হয়েছে।