আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের আসামিরা জীবনে শেষবারের মতো কী খেয়েছেন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণদণ্ড প্রথা সম্পর্কে মানুষের ধারণা আরও পরিষ্কার করতে ফটোগ্রাফার জ্যাকি ব্ল্যাক আসামিরা শেষবারের মতো যেসব খাবার খেয়েছিলেন, সেসব খাবার কিনে প্লেট সাজিয়ে ছবি তুলেছেন।

"একটি অপরাধ যার জন্য আপনি হয়তো সত্যি দোষী, কিংবা নির্দোষ,আপনার প্রাণদণ্ড কার্যকর করার আগে আপনি শেষবারের মতো কী খেতে চাইবেন?" এক বিবৃতিতে প্রশ্ন করছেন আমেরিকান ফটোগ্রাফার জ্যাকি ব্ল্যাক।

"সেই খাবার যখন আপনার সামনে আনা হবে, তখন হয়তো আপনি কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবেন।

"এর মাধ্যমে আমরা হয়তো মার্কিন বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে এবং প্রাণদণ্ড সম্পর্কে আমাদের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবো।

‍"মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামীর ব্যাপারে হয়তো আমাদের সহমর্মিতা তৈরি হবে।"

জ্যাকি ব্ল্যাক একই সঙ্গে প্রাণদণ্ড কার্যকর হয়েছে এমন বন্দিদের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করেছেন। তাদের শিক্সাগত যোগ্যতা, পেশা এবং তাদের শেষ বিবৃতিও রেকর্ড করেছেন।

ডেভিড ওয়েইন স্টোকার

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ১৬ই জুন, ১৯৯৭

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৮ম শ্রেণি

পেশা: ভারি মেশিন চালক / কাঠমিস্ত্রি

বিবৃতি: "আপনার ক্ষতির জন্য আমি সত্যি খুব দু:খিত ... কিন্তু আমি কাউকে খুন করিনি।"

অ্যান্টনি রে ওয়েস্টলি

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ১৩ই মে, ১৯৯৭

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৮ম শ্রেণি

পেশা: শ্রমিক

বিবৃতি: "আপনাদের বলতে চাই যে আমি কাউকে খুন করিনি। আপনাদের সবাইকে ভালবাসি।"

টমাস অ্যান্ডি বেয়ারফুট

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ৩০শে অক্টোবর, ১৯৮৪

শিক্ষাগত যোগ্যতা: জানা নেই

পেশা: তেল খনির গুন্ডা

বিবৃতি: "আমার আশা, অতীতে ডাইনি অপবাদে নারীকে পুড়িয়ে মারার মতোই আজও আমরা যেসব খারাপ কাজ করছি একদিন আমরা সেদিকে নজর ফেরাতে পারবো। আমি সবাইকে জানাতে চাই যে কারও বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। সবাইকে আমি ক্ষমা করছি।আশা করি আমি যাদের ক্ষতি করেছি, তারা আমাকে ক্ষমা করবেন।"

জেমস রাসেল

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ১৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯১

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ১০ম শ্রেণি

পেশা: সঙ্গীত শিল্পী

বিবৃতি: তার বিবৃতিটি ছিল তিন মিনিট দীর্ঘ। হয় সেটা রেকর্ড করা হয়নি, নয়তো লিখে রাখা হয়নি।

জেফ্রি অ্যালেন বার্নি

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ১৬ই এপ্রিল, ১৯৮৬

শিক্ষাগত যোগ্যতা: জানা নেই

পেশা: জানা নেই

বিবৃতি: "আমি যা করেছি তার জন্য দু:খিত। এই শাস্তি আমার পাওনা ছিল। যিশু আমাকে ক্ষমা করুন।"

জনি ফ্র্যাঙ্ক গ্যারেট

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৭ম শ্রেণি

পেশা: শ্রমিক

বিবৃতি: "ভালবাসার জন্য এবং দেখাশোনার জন্য আমার পরিবারকে ধন্যবাদ জানাই। বাদবাকি সবাইকে আমি পরোয়া করি না।

উইলিয়াম প্রিন্স ডেভিস

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ১৪ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৭ম শ্রেণি

পেশা: ছাদ শ্রমিক

বিবৃতি: "আমি যে পরিবারের ক্ষতি করেছি তাদের বলতে চাই যে তাদের চরম বেদনা দেয়ার জন্য আমি অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে খুবই দু:খিত ... গত কয়েক বছর ধরে প্রাণদণ্ড পাওয়া অন্য বন্দিরা আমার প্রতি যে ভালবাসা দেখিয়েছেন সে জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।

"আমি আমার দেহ বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য দান করেছি। আশা করি আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর কারও না কারও কাজে আসবে।"

জেরাল্ড লি মিচেল

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ২২শে অক্টোবর, ২০০১

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ১০ম শ্রেণি

পেশা: কাঠমিস্ত্রি

বিবৃতি: "বেদনা দেয়ার জন্য আমি দু:খিত। আপনাদের কাছ থেকে যে জীবন আমি ছিনিয়ে নিয়েছি তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। আমি ঈশ্বরের কাছেও ক্ষমা চাই। আপনাদের কাছেও মাফ চাই। আমি জানি মাফ করা কঠিন। কিন্তু আমার কৃতকর্মের জন্য আমি অনুতপ্ত।

"আমার পরিবারকে বলতে চাই, তোমাদের সবাইকে আমি ভালবাসি। তোমাদের শক্ত থাকতে হবে। জেনে রেখ, তোমাদের প্রতি আমার ভালবাসা সবসময় থাকবে। আমি জানি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি ফিরে যাচ্ছি। তাই আমার জন্য দু'ফোঁটা সুখের অশ্রুজল ফেল।"

রবার্ট অ্যান্টনি ম্যাডেন

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ২৮শে মে, ১৯৯৭

শিক্ষাগত যোগ্যতা: দ্বাদশ শ্রেণি

পেশা: রাঁধুনি

বিবৃতি: "আপনাদের ক্ষতি করার জন্য এবং আপনাদের দু:খ দেয়ার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কিন্তু আমি ঐ লোকগুলোকে খুন করিনি। আমি আশা করবো এর মধ্য দিয়ে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং অন্যদের সম্পর্কে একটা কিছু শিখতে পারবো। এবং একই সঙ্গে এই ঘৃণা আর প্রতিহিংসার চক্র ভেঙে বের হয়ে বিশ্বে যা কিছু ঘটছে তাকে মূল্য দিতে শিখবো।

"এই ভুল বিচারের জন্য আমি সবাইকে ক্ষমা করছি।"

জেমস বিথার্ড

প্রাণদণ্ড কার্যকরের তারিখ: ৯ই ডিসেম্বর, ১৯৯৯

শিক্ষাগত যোগ্যতা: কলেজ

পেশা: মোটরসাইকেল মেকানিক

তার বিচারের পর বাদী পক্ষের সাক্ষীরা তাদের বয়ান বদলে ফেলে এবং প্যারোল বোর্ডের তিনজন সদস্য তাকে ক্ষমা করার জন্য সুপারিশ করে।

বিবৃতি: "আমি প্রথমেই আমার পরিবারের প্রতি ভালবাসা জানাই।

"এই শেষ ক'টি মুহূর্তে আমি যা বলবে হয়তো লোকে তা শুনতে চাইবে ... আমি বলতে চাই যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন একটি দেশে পরিণত হয়েছে যেখানে মানুষের জীবনের মূল্য শূন্যের কোঠায়। আমার এই মৃত্যু আসলে বড় একটি রোগের উপসর্গ মাত্র।

"একটা সময় আসবে যখন সরকারকে জেগে উঠতে হবে এবং ভিন দেশে গিয়ে সে দেশ ধ্বংস করা বা শিশুদের হত্যা করা বন্ধ করতে হবে। ইরান, ইরাক কিংবা কিউবার মত দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বিশ্বকে বদলানো যাবে না। শুধুমাত্র কিছু নিরীহ মানুষের ক্ষতি হবে।"

লাস্ট মিলস্ নামে এসব ছবি নিউইয়র্কের প্যারিশ আর্ট মিউজিয়ামে ৩১শে জানুয়ারি, ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রদর্শিত হচ্ছে।

সব ছবির কপিরাইট সত্ত্ব সংরক্ষিত।