বেলারুশ: নিষ্ঠুর নিপীড়নের মুখে বিক্ষোভে উত্তাল দেশটির মানুষ এখন আরও নির্ভীক

বেলারুশে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি নির্মমতার যে ছবি প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে, তা দেশটির জনগণকে রীতিমত স্তম্ভিত করেছে। প্রথমে এসব ঘটছিল কেবল রাস্তায়, যেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছে। এরপর যাদের পুলিশ ধরে নিয়ে বিভিন্ন বন্দীশালায় আটকে রেখেছে, তাদের ওপর নিষ্ঠুরতার নানা বিবরণও ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিদিন। বিবিসি নিউজ রাশানের সাংবাদিক তাতসিয়ানা মেলনিচুকের বর্ণনায় বেলারুশের এই গণবিক্ষোভ:

গত রোববার আটক করা হয়েছিল ২৫ বছর বয়সী এক তরুণকে। বন্দী অবস্থায় মারা গেছে এই তরুণ। তার মা জানিয়েছেন, পুলিশের একটি গাড়িতে তার ছেলেকে কয়েক ঘন্টা আটকে রাখা হয়েছিল।

এ সপ্তাহে মিনস্কে আমার বাড়ির খুব কাছের একটি রাস্তা হয়ে উঠেছিল পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের মূল কেন্দ্র।

সেখানে স্টান গ্রেনেড ছোঁড়া হয়। দাঙ্গা পুলিশ যখন লোকজনকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল, তখন তারা চিৎকার করছিল। লোকজন এত জোরে চিৎকার দিচ্ছিল যে, তার নিচে গ্রেনেড ফাটার শব্দ পর্যন্ত চাপা পড়ে যাচ্ছিল।

বিদ্রোহ এবং ক্ষোভ

বেলারুশের এবারের এসব বিক্ষোভে যেভাবে মানুষ অংশ নিচ্ছে, তা অভূতপূর্ব। বহু নগরী, শহর এবং গ্রামে পর্যন্ত এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা গত রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী সভেতলানা টিখানোভস্কায়াকেই বিজয়ী ঘোষণার দাবি জানাচ্ছে।

আমি আমার জানালা দিয়ে দেখেছি, নিচের রাস্তা দিয়ে ছেলে-মেয়েরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দৌড়ে যাচ্ছে। একটু দম নিয়ে তারা আবার পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ফিরে আসছে।

এই বিক্ষোভ চলছে এখন প্রতি রাতে। আমার নারী প্রতিবেশিরা তাদের স্বামী এবং ছেলেদের এই বিক্ষোভে যোগ দেয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছিল। পরিবারের প্রিয়জনদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। কেবল যে বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে তা নয়, যারা বিক্ষোভে যায়নি, তাদেরও ধরা হচ্ছে।

যেমন আমার এক বন্ধুর ছেলে, যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার, তাকে ধরা হয় নির্বাচনের আগে। তিন রাত তাকে একটি সেলে আটকে রাখা হয়। দক্ষিণ বেলারুশের গোমেলে আটক অবস্থায় যার মৃত্যু ঘটে, সেই আলেক্সান্ডার ভিখর তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার মা।

সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে তা যথেষ্ট। এই সংঘাত ১০০ জন পুলিশ যে আহত হয়েছে এবং ২৮ জনকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে সেটি মনে করিয়ে দিচ্ছে তারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে ড্রাইভাররা ট্রাফিক পুলিশের উপর গাড়ি তুলে দেয়ার চেষ্টা করেছে। তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তাদের থামানোর জন্য অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে।

বেলারুশের মানুষ এখন ভীষণ ক্ষুব্ধ পুলিশ, কর্তৃপক্ষ এবং সর্বোপরি প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেংকোর উপর। এখানে আমি যত জনের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কেউ পুলিশ যা করছে তা সমর্থন করে না।

লোকজন যখন টেলিভিশনে বেলারুশের প্রেসিডেন্টকে কথা বলতে দেখে, তখন তারা তাকে বিদ্রুপ করে। এরপর বেলারুশে কী ঘটবে, সে সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন এবং কীভাবে তিনি নিজেকে রক্ষা করবেন, সেটা নিয়ে তারা জল্পনা-কল্পনা করে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে শ্লোগান

আমার এক বন্ধু মিনস্ক শহরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাজটা এখন কঠিন। কারণ শহরের কেন্দ্রস্থলে কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমার বন্ধু যখন এ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে মেট্রো কর্মীদের কাছে অভিযোগ করলেন, তখন তারা এর জন্য ক্ষমা চাইলেন। তারা এজন্যে দোষারোপ করলেন মিস্টার লুকাশেংকোকে।

আরও পড়ুন:

মিস্টার লুকাশেংকো বিক্ষোভকারীদের বেশিরভাগকেই বেকার এবং অতীতে অপরাধী ছিল বলে দাবি করেছেন। তিনি এদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আর পুলিশ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে যাকে পাচ্ছে , তাকেই পাকড়াও করে নিয়ে আসছে। বিশেষ করে তরুণদের। এটি মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

বেলারুশের মানুষ এখন তাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, শ্লোগান দিচ্ছে, পুলিশ দেখলে গালি দিয়ে তাদের চলে যেতে বলছে। আর পুলিশ তখন লোকজনের বাড়ির বারান্দা লক্ষ্য করেও রাবার বুলেট ছুঁড়ছে।

রাস্তায় এখন দাঙ্গা পুলিশের দিকে ছুটে গিয়ে মহিলারা তাদের অনুরোধ করছেন সভ্য আচরণ করার জন্য, কাকুতি-মিনতি করছেন মানুষের ওপর হামলা বন্ধ করার জন্য।

বেলারুশে এর আগেও মানুষের আন্দোলন দমন করা হয়েছে। তবে ২০০৬ এবং ২০১০ সালের সেসব বিক্ষোভ তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল। কিন্তু এবার যেরকম নির্দয়ভাবে বিক্ষোভ দমন করা হচ্ছে, তা আঁতকে উঠার মতো। এমনটি এর আগে দেখা যায়নি। রাস্তায় যারা বিক্ষোভকারী এবং পথচারীদের ওপর হামলা করছে, তাদের পরণে কালো পোশাক, মুখে মুখোশ। তাদের পোশাকে কোন ব্যাজ নেই, তারা কোন পরিচিত বাহিনীর ইউনিফর্ম পরেনি। বিবিসির একটি টিমও এরকম ঘটনার শিকার হয়েছে।

যদিও মানুষ এখনো এসবের পরোয়া করছে না, তারপরও ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

বেলারুশের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে সেখানে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে। সেখানে এমনিতেই মানুষের আয় বেশি নয়। আর কেউ এই বিক্ষোভে সমর্থন দিলে, তার চাকুরি হারানোরও ঝুঁকি আছে।.

নেতৃত্ববিহীন বিরোধী শিবির

তবে তরুণ বিক্ষোভকারীরা মরিয়া, তাদের মধ্যে কোন ভয় যেন কাজ করছে না। এরা মূলত বেলারুশের সাধারণ মানুষ।এরা বিরোধী দলের পোড় খাওয়া কর্মী নয়, যাদের এর আগের বিক্ষোভগুলিতে দেখা গিয়েছিল। এদের কোন নেতা নেই।

বেলারুশের আগের বিরোধী দলগুলো শেষ হয়ে গেছে। যারা প্রেসিডেন্ট লুকাশেংকোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল বা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিল, তারা হয় জেলখানায়, নয়তো দেশ থেকে পালিয়ে প্রবাসে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে।

যে নতুন প্রজন্মের বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমেছে, এখনো পর্যন্ত তাদের কোন পরিষ্কার দাবি বা রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। তাদের একমাত্র শ্লোগান: 'দূর হও', 'বেলারুশ দীর্ঘজীবি হোক', 'বন্দীদের মুক্তি দাও'।

সভেতলানা টিখানোভস্কায়া নিজে কোন বিরোধী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিনী। কিন্তু তিনি যেরকম সোজাসাপ্টা ভঙ্গীতে পথে নেমেছিলেন, তা আসলে মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পেরেছিল। কিন্তু তাকেও দেশ ছাড়তে হয়েছে।

কিন্তু এখনো বেলারুশে নেতৃত্ব আছে, সংগঠন আছে। একটি ক্রাউডফান্ডিং উদ্যোগে এপর্যন্ত দশ লাখ ডলার চাঁদা উঠেছে। এই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে আন্দোলনে আহত এবং গ্রেফতার হওয়া লোকজনের জন্য। এ থেকে আইনজীবিদের ফি এবং জরিমানাও মেটানো হবে।

বুধবার রাতে বিক্ষোভ কিছুটা শান্ত ছিল। বেলারুশের মানুষ এখন তাদের কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে ধর্মঘটে যাওয়ার কথা ভাবছে।

কিছু কারখানা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এরই মধ্যে ধর্মঘট শুরু করেছেন। তারা এই সহিংসতার অবসান চান। তারা সভেতলানা টিখানোভস্কায়াকে নির্বাচনে বিজয়ী বলে স্বীকার করে নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন।