করোনা ভাইরাস: হজে বিধিনিষেধের কারণে যেভাবে ধস নেমেছে মক্কা আর মদিনার অর্থনীতিতে

ছবির উৎস, Sajjad Malik
মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন সাজ্জাদ মালিক। তার কণ্ঠে হতাশা।
“এখানে কোন কাজ নেই , চাকরি নেই, বেতন নেই – কিচ্ছু নেই।”
মক্কায় পবিত্র কাবা বা মসজিদ আল-হারামের কাছেই তার ট্যাক্সি বুকিং অফিসে বসে বলছিলেন সাজ্জাদ।
“সাধারণত হজের দু-তিন মাস আগে থেকে শুরু করে আমি এবং এখানকার ড্রাইভাররা কয়েক মাসে যে পরিমাণ টাকা উপার্জন করে তাতে তাদের বাকি বছরটা চলে যায়। কিন্তু এখন? কিছুই নেই।“
সাজ্জাদের প্রতিষ্ঠানে গাড়ির ড্রাইভারদের একজন সামিউর রহমান। তিনি হলেন সৌদি আরবের বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের একজন – যারা সাধারণত: বিদেশি। তিনি মক্কার জনপ্রিয় ঘড়িওয়ালা টাওয়ারের আশপাশের রাস্তাগুলোর যানবাহনের ভিড় কেমন সে সম্পর্কে আপডেট পাঠান।
সাধারণত হজের সময় এলাকাটা হাজিদের ভিড়ে এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
রাস্তায় থাকে তাদের কাফেলা, পরনে তাদের সাদা পোশাক, মাথায় সৌদি আরবের প্রচণ্ড গরম থেকে আত্মরক্ষার জন্য ছাতা।
কিন্তু এখন ড্রাইভারদের যানবাহনগুলো যাত্রীশূন্য। শহরটাকে দেখাচ্ছে প্রায় একটা ভূতুড়ে নগরীর মতো।

ছবির উৎস, Samiur Rahman
সাজ্জাদের ড্রাইভাররা বরং রাস্তায় জমা হওয়া কবুতরদের ছবি পাঠাচ্ছেন – মানুষের চেয়ে রাস্তায় তাদের সংখ্যাই যেন বেশি।
“আমার ড্রাইভাররা খেতে পাচ্ছে না” – বললেন সাজ্জাদ,“তারা এখন একটা ছোট্ট ঘরে চার-পাঁচজন করে থাকছেন, যেসব ঘরে বড়জোর দুজন লোক থাকতে পারে।“
আপনি সরকারি কোন সাহায্য পাচ্ছেন? জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সাজ্জাদকে।
“না। কিছুই পাইনি, একেবারেই কিচ্ছু না। আমার কিছু সঞ্চয় আছে যা ভেঙে এখন চলছি। কিন্তু আমার এখানে অনেক লোক কাজ করে – ৫০ জনেরও বেশি। তারা প্রচণ্ড দুর্দশার মধ্যে আছে।“
“গতকালই আমার এক বন্ধু ফোন করেছিল। সে বললো, ‘দয়া করে আমাকে কিছু একটা কাজ দাও, যত কম বেতনেই হোক।‘ বিশ্বাস করুন, এসব কথা বলতে গিয়ে লোকে কাঁদতে শুরু করে।“
এ বছরের হজকে কেন্দ্র করে এখানে কঠোর সব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সৌদি আরবে যেভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছিল - তা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক সংক্রমণের অন্যতম।
সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, কোভিড-১৯ বিস্তার ছড়ানো ঠেকাতে তারা বছরের এই সময়টায় যে লক্ষ লক্ষ হজযাত্রী আসেন - তার সংখ্যা ব্যাপকভাবে সীমিত করেছে।
স্বাভাবিক সময়ে সারা বিশ্ব থেকে মক্কায় হজ করতে আসেন ২০ লক্ষ লোক।
কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। শুধুমাত্র যারা আগে থেকেই সৌদি আরবের বাসিন্দা তারাই হজ করতে পারবেন। ফলে এবার হজযাত্রীর সংখ্য নেমে এসেছে মাত্র এক হাজারে।
কঠোর সব বিধিনিষেধ
হজযাত্রীরা পবিত্র জমজম কূপ থেকে সরাসরি পানি পান করতে পারবেন না। প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা বোতলে পানি ভরে দেয়া হবে।
হজ পালনের সময় একটি করণীয় হলো মিনায় শয়তানের প্রতীক তিনটি স্তম্ভের দিকে প্রস্তর নিক্ষেপ। এবার যে পাথরগুলো নিক্ষেপ করা হবে তা আগে থেকেই জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
হজের সীমিত আকার এবং এসব বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে সৌদি আরবের বাইরেও।
এসময় যে লক্ষ লক্ষ হজযাত্রী আসেন তাদের খাবার – বিশেষত: মাংসের চালান আসে প্রতিবেশী দেশ কেনিয়ার মত দেশগুলো থেকে।
সেখানকার কৃষকরা এজন্য প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু পালন করেন – এবছর তা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।
“কেনিয়ার গবাদিপশু খাতে অনেক টাকার ব্যবসা হয়। কেনিয়ার বহু পরিবারের অর্থসংস্থান হয় এ থেকে। অধিকাংশ কৃষকের জন্যই – বিশেষত হজের সময়টায় – গবাদিপশু পালন তাদের জীবনধারার অংশ হয়ে গেছে” – বলছিলেন কেনিয়ার লাইভস্টক প্রডিউসার এ্যাসোসিয়েশনের প্যাট্রিক কিমানি।

ছবির উৎস, Patrick Kimani
মি. কিমানি বলছিলেন, তার সমিতির সদস্যরা হজের জন্য সৌদি আরবে প্রতি বছর গড়ে ৫,০০০ গরু রপ্তানি করে। কিন্তু এ বছর তাদেরকে সেই মাংস স্থানীয় বাজার ও কোল্ড স্টোরেজগুলোয় পাঠাতে হচ্ছে।
“ফলে আমরা উদ্বিগ্ন যে এই অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে স্থানীয় বাজারে গরুছাগলের দাম পড়ে যাবে – কারণ দ্রুত বিক্রির জন্য হয়ত স্থানীয় ক্রেতাদের জন্য মাংসের দাম কমিয়ে দেয়া হবে।“
ট্রাভেল কোম্পানিগুলোর মাথায় হাত
গত বছর সৌদি আরবে হজের জন্য সবচেয়ে বেশি বিদেশী হাজি গিয়েছিলেন পাকিস্তান থেকে।
কিন্তু এবার করাচির একটি ট্রাভেল এজেন্সি ‘চীপ হজ এ্যান্ড ওমরা ডীলস’-এর মালিক শাহজাদ তাজ বলছেন, তার ব্যবসা এখন লাটে ওঠার মুখে।
“ব্যবসা এখন কার্যত শূন্যের কোঠায়” – বলছিলেন মি. তাজ, “এমনকি ভ্রমণ-সংশ্লিষ্ট অন্য যে সব কর্মকান্ড যেমন ফ্লাইট, জিনিসপত্র আনা-নেয়া, পণ্য ডেলিভারি সবই বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের কিছুই করার নেই। এমন অবস্থার জন্য আমরা আদৌ তৈরি ছিলাম না।“
“আমরা আমাদের স্টাফের সংখ্যা কমিয়ে একেবারে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এখন আমরা বাড়ি-গাড়ি বা জমিজমার মতো সম্পত্তি বিক্রি করার মত অবস্থায় পৌঁছে গেছি - যাতে কোনমতে এই সময়টা পার হতে পারি। আমি আমার কর্মচারীদের জরুরি সাহায্য হিসেবে কিছু টাকা দিয়েছি। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু তো আমি করতে পারছি না।“
মক্কা এবং মদিনার অর্থনীতিতেও ধস
হজের ওপর বিধিনিষেধের কারণে মক্কা ও মদিনা শহরের অর্থনীতিতেও বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, কারণ হজযাত্রীদের আগমনকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর এই দুটি শহরে শত শত কোটি ডলার সমপরিমাণের ব্যবসা-বাণিজ্য হয়।

ছবির উৎস, SHAHZAD TAJJ
“এটা ঠিক যে হজের আয়োজন করতে প্রতি বছর সৌদি সরকারের যে অর্থ ব্যয় হয় তার অনেকটাই এবার বেঁচে যাবে। কিন্তু মক্কা এবং মদিনা শহরের ব্যবসা-বাণিজ্যের যে ক্ষতি হবে তার পরিমাণ হতে পারে ৯০০ থেকে ১২০০ কোটি ডলার পর্যন্ত” – বলছেন মাজেন আল-সুদাইরি, যিনি রাজধানী রিয়াদের আল-রাজি ক্যাপিটাল নামে একটি আর্থিক সেবাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বিভাগের প্রধান।
মি. আল-সুদাইরি বলছেন, এ ব্যাপারে সৌদি সরকার কিছু সহায়তা দিচ্ছে। সৌদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে, তাদের ঋণের মেয়াদ দু-তিন মাস পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে।
মি. আল-সুদাইরি মনে করছেন যে সবচেয়ে খারাপ সময়টা পার হয়ে গেছে।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আলেক্সাণ্ডার পারজেসি বলেন, সৌদি আরবের জাতীয আয়ের ৮০ শতাংশই আসে তেল থেকে কিন্তু তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় তারা অর্থনীতিতে বৈচিত্র আনবার উদ্যোগসহ আরো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সৌদি অর্থনীতি প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে বলে তারা মনে করেন।
এই সংকটের পরও সাজ্জাদ মালিক দেশে ফিরতে চান না
সাজ্জাদ মালিক সৌদি আরবে এসেছিলেন আট বছরেরও বেশি আগে, পাকিস্তান থেকে।
করোনাভাইরাসের কারণে মক্কায় তার ব্যবসা এখন পড়ে গেলেও তিনি এখনও দেশে ফিরে যেতে চান না।
পাকিস্তানের মতো নিকটবর্তী দেশগুলোর অনেকে যারা যথেষ্ট উপার্জন করতে পারছিলেন না - তাদের জন্য সৌদি আরব ছিল এক ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ।
“সৌদি আরবে কাজ করার কারণে আমি আমার ছেলেমেয়ে, পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারছি। আমরা এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছি। আর হজের সময় আমাদের উপার্জন হয় খুবই ভালো“ – বলছিলেন সাজ্জাদ।
“এই সময়টায় অবশ্য আমাদের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমার জন্য আলহামদুলিল্লাহ - সৌদি আরবই এখনো এক নম্বর“, বলেন তিনি।








