এরতুগ্রুল: 'মুসলিম গেম অফ থ্রোনস' নামে অভিহিত তুরস্কের নাটক নিয়ে পাকিস্তানে তুমুল উৎসাহ, বিতর্ক

    • Author, শায়েস্তা ফারুকি
    • Role, বিবিসি মনিটরিং

তুরস্কের জনপ্রিয় ঐতিহাসিক টিভি নাটক ডিরিলিস এরতুগ্রুল (এরতুগ্রুলের পুনরুত্থান) পাকিস্তানের টিভি দর্শকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এপ্রিল মাস থেকে নাটকটি ডাব করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো শুরু হওয়ার পর থেকে এই নাটক দর্শকদের মধ্যে রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছে।

অনুষ্ঠানটির সাড়া জাগানো জনপ্রিয়তা অবশ্য পাকিস্তানে বিপরীতধর্মী মতেরও জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে এই নাটক নিয়ে লেখা হচ্ছে, চলছে আলোচনা।

কেউ কেউ মনে করছেন স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য এটা একটা হুমকি এবং সমাজে এটা সহিংসতার জন্ম দেবে। অপর পক্ষ মুসলিমদের এই বীরত্ব গাথায় রীতিমত উদ্বুদ্ধ।

এই নাটক নিয়ে এই মুহূর্তে পাকিস্তানে শুধু তারকা আর বিশ্লেষকরাই মন্তব্য করছেন না, এই বিতর্কে সক্রিয়ভাবে সোচ্চার হয়েছেন দেশের রাজনীতিকরাও।

পাকিস্তানে এই প্রথম, যে কোন তুর্কি নাটক জনপ্রিয় হল তা নয়। কিন্তু এরতুগ্রুল - যাকে অনেকেই অভিহিত করে থাকে 'মুসলিম গেম অফ থ্রোনস্' নামে - এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী।

এই নাটকের পেছনে সরাসরি সমর্থন রয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের। ধারণা করা হচ্ছে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক কারণে তিনি এই নাটকটির সম্প্রচারে বিশেষ মদত দিচ্ছেন।

'ইসলামভীতি'র বিরুদ্ধে অস্ত্র?

এই বিদেশি সিরিয়াল পাকিস্তানে যে জনপ্রিয়তার জোয়ার এনেছে সম্ভবত তার পেছনে মূল কারণ মি. খানের ব্যক্তিগত উৎসাহ।

তিনি নিজে যে শুধু এই নাটকটি দেখানোর সুপারিশ করেছেন এবং পিটিভিকে এটা সম্প্রচার করতে বলেছেন তাই নয়, তিনি বলেছেন ইসলামী সভ্যতার গুরুত্ব বুঝতে পাকিস্তানের মানুষকে সাহায্য করবে এই নাটক।

তার এই মন্তব্যের পর থেকেই পাকিস্তানে এই নাটক দেখতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে এবং এটা ভিউয়ারশিপের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। ঊর্দুতে ভাষান্তর করা সিরিয়াল নাটকের নাম দেয়া হয়েছে এরতুগ্রুল ঘাজি - যোদ্ধা এরতুগ্রুল।

সমালোচকরা বলছেন ইমরান খান এই সিরিয়ালে মদত দিচ্ছেন কারণ তিনি সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ তুলে ধরতে চান এবং তিনি মনে করছেন পাকিস্তানে একটা আদর্শ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় তার লক্ষ্য পূরণে এই সিরিয়াল সাহায্য করবে।

তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করার পর থেকে বলে আসছেন যে, "আমি এমন একটা পাকিস্তান গড়ে তুলতে চাই, যেটা হবে মদিনায় নবীর সৃষ্ট প্রথম মুসলিম সমাজের আদর্শে অনুপ্রাণিত।"

কিন্তু অনেকে মনে করছেন এখানে মি. খানের বক্তিগত আগ্রহই শুধু জড়িত নেই।

দেশটির শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডন লিখছে "এর মূল কারণ সম্ভবত নিহিত রয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের সময় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান ও সেসময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের আলাদা এক বৈঠকের মধ্যে।"

সেপ্টেম্বর ২০১৯এর ওই বৈঠকে মি. খান, মি. এরদোয়ান আর মি. মাহাথির যৌথ উদ্যোগে একটি টিভি চ্যানেল চালু করার আইডিয়া নিয়ে কথাবার্তা বলেন, যে চ্যানেল তারা চাইছিলেন ক্রমশ বেড়ে ওঠা ইসলামভীতি ও ইসলাম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে মত তৈরি করবে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

নভেম্বর ২০১৬য় মি. এরদোয়ান তুরস্কে এক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে এই সিরিয়াল নাটকের প্রশংসা করে বলেছিলেন এটি "জাতির হৃদয় জয় করেছে"। পাকিস্তানে এই সিরিয়ালের বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যমে "মি. খানও সম্ভবত তুরস্কে রাজনৈতিক পয়েন্ট অর্জন করতে চাইছেন। পাকিস্তান তুরস্কের সাথে তাদের সম্পর্ক আরো জোরদার করতে চাইছে,"এক নিবন্ধে লিখছে পাকিস্তানের দ্য ডিপ্লোম্যাট সাময়িকী।

তবে খোলাখুলিভাবে এই সিরিয়ালের প্রতি তার সমর্থন দেখিয়ে দেশের ভেতর কিছু সমালোচনাও কুড়িয়েছেন মি. খান।

ডন পত্রিকা এক খবরে জানায়, বিরোধী রাজনীতিক মুশতাক আহমদ খান সম্প্রতি সংসদে বলেছেন: " (মি. খান) আপনি এরতুগ্রুল নাটক সম্প্রচার করে এখানে মদিনা গড়ে তুলতে পারবেন না"।

মুসলিম মূল্যবোধ 'সঠিকভাবে জাগ্রত'

এই সিরিয়াল নাটকে ১৩শ শতকের মুসলিম ওঘাজ তুর্কি শাসক এরতুগ্রুলের জীবন কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। মনে করা হয় তার পুত্র ওসমান ঘাজি ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।

এতে মোঙ্গল দখলদার, ক্রিশ্চান, বাইজেন্টাইন এবং আনাতোলিয়ার নাইট টেম্পলারের বিরুদ্ধে মুসলিম ওঘাজ তুর্কি বীরদের লড়াইয়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

পাকিস্তানে নয়া দাউর-এর মত কিছু মিডিয়া ওয়েবসাইট বলছে এই নাটক "অটোমান সাম্রাজ্য এবং মুসলিম মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করেছে"

স্থানীয় একটি জনপ্রিয় দৈনিক দ্য নেশন-এর এক নিবন্ধেও লেখা হয়েছে এই নাটক "মুসলিম বীর, ইসলামের ইতিহাস এবং আদর্শকে সঠিক আলোকে তুলে ধরেছে"।

টিভি সিরিয়াল এবং চলচ্চিত্রগুলোতে মুসলিমদের একটা "নেতিবাচক আলোকে দেখানো হয়", আর সে কারণে এই সিরিয়াল একটা পরিবর্তন নিয়ে এসেছে যেটা মানুষ পছন্দ করছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

"মুসলিমরা সবসময় চেয়েছে বিশ্বের মিডিয়াতে মুসলমানদের একটা ইতিবাচক ও শক্তিশালী দিকগুলো সামনে আনা হোক। ডিরিলিস এরতুগ্রুল তাদের সেই দীর্ঘদিনের চাওয়াকে মিটিয়েছে- মুসলিমদের বীরত্বের জয়গান এই সিরিয়াল," এক নিবন্ধে লিখেছে ইংরেজি ভাষার ওয়েবসাইট দ্য গ্লোবাল ভিলেজ স্পেস।

সাংবাদিক আমনা হায়দার ইশানি, দ্য নিউজ ডেইলিতে লিখেছেন- এই টিভি অনুষ্ঠান "বিশ্বে ইসলামভীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে"।

তবে পারভেজ হুদভয়ের মত অ্যাকটিভিস্টের এ ব্যাপার দ্বিমত রয়েছে।

"এর (এরতুগ্রুল) উদ্দেশ্য যদি হয় ইসলামকে শান্তি ধর্ম হিসাবে তুলে ধরা এবং ইসলামভীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, তাহলে আমার মতে এই নাটক সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে," ডন পত্রিকায় এক নিবন্ধে নাটকে যে ভয়ঙ্কর সহিংসতা ও শিরশ্ছেদের দৃশ্য দেখানো হয়েছে তার উল্লেখ করে তিনি এই মন্তব্য করেন।

আবার সমাজবাদী কর্মী একাধারে রাজনীতিকও জিবরান নাসিরের মত হল এই ধারাবাহিক সিরিয়াল পাকিস্তানিদের মধ্যে "পরিচয়ের সংকট" তৈরি করছে।

পাকিস্তানে এই সিরিয়াল নাটকের বিপুল জনপ্রিয়তার কথা তুরস্কের সংবাদমাধ্যমগুলোতেও আলোচিত হচ্ছে

রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত সংবাদ সংস্থা আনাদলু এজেন্সি ২৪শে মে পাকিস্তানে স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে লিখেছে দেশটির জনগণ এই নাটককে ভালবেসে "ইসলামের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরছে" এবং দেখছে "একজন মুসলিম শাসকের কেমন হওয়া উচিত"।

'নিষ্প্রাণ ঘরোয়া বিষয়'

কেউ কেউ বলছে পাকিস্তানের টিভি সিরিয়ালগুলোতে ভাল বিষয়ের অভাব বিদেশি নাটকগুলোর বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে অন্যতম একটা কারণ।

দ্য গ্লোবাল ভিলেজ স্পেস পাকিস্তানের টু্ইট ব্যবহারকারীদের মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছে এদের অনেকেই মনে করছে "পাকিস্তানি সিরিয়ালগুলোয় গৎবাঁধা নিষ্প্রাণ ঘরোয়া যেসব কাহিনি দেখানো হয়, তার পাশে এরতুগ্রুল একটা অভিনব বিনোদন।"

"এটা খুবই পরিষ্কার যে পাকিস্তানে অসংখ্য টিভি চ্যানেল আছে কিন্তু মানসম্মত অনুষ্ঠান দেয়া হচ্ছে না," দ্য নিউজের এক নিবন্ধ লিখছে।

পাকিস্তানে টিভি বেশ জনপ্রিয় মাধ্যম, কিন্তু ইসলামী মূল্যবোধ তুলে ধরার রেওয়াজ টিভি চ্যানেলগুলোতে সেভাবে নেই। যদিও "আলিফ" নামে একটি অনুষ্ঠান আছে যেখানে ইসলামী মূল্যবোধকে ফোকাস করে অনুষ্ঠান হয়।

তুরস্কের এই টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা পাকিস্তানি প্রযোজকদের ভাবাচ্ছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফোয়াদ চৌধুরি সহ অনেকেই আশংকা করছেন এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি অনুষ্ঠান দেশের বিনোদন জগতকে গ্রাস করেবে এবং স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে এই সিরিয়াল এরতুগ্রুল দেশটিতে যে তুমুল বিতর্ক উস্কে দিয়েছে, সাংবাদিক ইশানি আশা করছেন তার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানে স্থানীয়ভাবে আরও ভাল অনুষ্ঠান তৈরি করতে প্রযোজকরা উদ্বুদ্ধ হবেন। ।