করোনাভাইরাস: সংক্রমণ রোধে এক দেশের নেয়া পদক্ষেপের সাথে আরেক দেশের পদক্ষেপের তুলনা করা কি সম্ভব?

তুলনামূলক বিচার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এক দেশের চিত্র বা অন্য দেশের সাথে তুলনামূলক বিচার করাটা উচিত নয়

একটি বিষয় নিয়ে নাগরিকদের সবারই কমবেশি আগ্রহ রয়েছে, তা হলো অন্য দেশের তুলনায় কারো নিজের দেশ কতটা কার্যকরভাবে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করছে।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি, ৫৩ হাজার, মানুষ মারা গেছে কোভিড-১৯ এ।

কিন্তু অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলের সাথে তুলনা করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যাটাও মাথায় রাখতে হবে - যেই সংখ্যাটা ৩৩ কোটি।

আর পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে বড় পাঁচটি দেশের হিসেব করলে - যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন - দেখা যায় তাদের মোট জনসংখ্যা ৩২ কোটির কাছাকাছি।

দুই অঞ্চলের জনসংখ্যা কাছাকাছি হলেও করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজারের কিছু বেশি মানুষ মারা গেছে, আর পশ্চিম ইউরোপের পাঁচটি দেশ মিলিয়ে মারা গেছে প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি মানুষ।

সুতরাং, দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান দিয়ে আসলে একটি দেশের চিত্র বা অন্য দেশের সাথে তুলনামূলক বিচার করাটা উচিত নয়।

Banner image reading 'more about coronavirus'

করোনাভাইরাস ঠেকাতে যে সাতটি বিষয় মনে রাখবেন

Banner

মৃত্যুর সংখ্যা

একটি দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক সময়ই নির্ভর করে ঐ দেশ কোন পদ্ধতিতে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করছে, তার উপর।

যেমন ফ্রান্সে প্রতিদিনের মৃত্যুর তালিকায় বৃদ্ধ নিবাসে বসবাস করা ব্যক্তিদের মৃত্যুও নথিভুক্ত করা হলেও ইংল্যান্ডে শুধুমাত্র হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়।

আবার মৃত্যুর কারণ চিহ্নিত করার কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান না থাকায়ও একেক দেশে মৃত্যুর কারণ উল্লেখের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা গেছে।

যেমন, পরিসংখ্যানের মধ্যে তালিকাভুক্ত হতে হলে কি একজনকে পরীক্ষিত ভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে হবে, নাকি চিকিৎসকের সন্দেহ হলেই হবে?

আবার, মারা যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রধান কারণ ভাইরাসই হতে হবে?

ভাইরাসের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়ে থাকলে কী তাকে করোনাভাইরাসে মৃত ধরে নেয়া হবে?

সেরকম ক্ষেত্রে মৃত্যুর সনদে লেখা কারণ কী হবে?

তুলনা করার ক্ষেত্রে আমরা কী আসলেই এ ধরণের বিচ্যুতিগুলো হিসেবে নিয়ে তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করি?

চীন অথবা ইরানের মত যেসব দেশের মানুষ কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকা, সেসব দেশের সরকারের দেয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চীন অথবা ইরানের মত যেসব দেশের মানুষ কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকা, সেসব দেশের সরকারের দেয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে

মৃত্যুর হার

চলমান করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সময় একেক দেশের মৃত্যুর হার নিয়ে প্রচুর বিশ্লেষণ হয়েছে। তবে এই মৃত্যুর হার পরিমাপের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।

একটি হলো মৃত্যুর সংখ্যার সাথে শনাক্ত হওয়া রোগীর অনুপাত - যতজন শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে কতজন মারা গেছেন?

কিন্তু একেক দেশ একেক পদ্ধতিতে রোগী শনাক্ত করছে। যেমন যুক্তরাজ্য শুধু মূলত সেসব মানুষকেই পরীক্ষা করছে যারা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর্যায়ে অসুস্থ।

এই হিসেবে পরীক্ষা করলে অন্য অনেক দেশের তুলনায় - যেসব দেশে আরো বেশি মানুষকে পরীক্ষা করা হচ্ছে - যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর হার বেশি হতে পারে।

একটি দেশে যত বেশি পরীক্ষা পরিচালনা করা হবে, সেদেশে তত বেশি মৃদু উপসর্গসহ অথবা কোনো উপসর্গ ছাড়া করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হবে।

সুতরাং শনাক্ত হওয়া রোগীদের অনুপাতে মৃত্যুর হার আর মোট মৃত্যুর হার এক বিষয় নয়।

আরেকটি গণনা পদ্ধতি হলো একটি দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে ঐ দেশে মোট কতজন মারা গেছে - যেটি প্রতি এক লক্ষ বা দশ লক্ষ মানুষে কতজন মারা গেলো, সেই হিসেবে যাচাই করা হয়।

কিন্তু সেটি আংশিকভাবে যাচাই করা হয় একটি দেশ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কোন ধাপে রয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে।

বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে যদি কোনো দেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার জন্য অন্য দেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘতর সময় পেয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথমদিক থেকেই বিপুল পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথমদিক থেকেই বিপুল পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে

রাজনৈতিক বিবেচনা

যেসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, সেসব দেশের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য সহজে বিশ্বাসযোগ্য নয়।

যেমন, চীন অথবা ইরানে যে পরিমাণ মানুষ মারা গেছে বলে সেসব দেশের সরকার বলছে, তা কি সঠিক? আমরা আসলে জানি না।

প্রতি দশ লাখ মানুষে কতজন মারা গেছে - সেই হিসেবে চীন তাদের দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা যাচাই করেছে।

কিছুদিন আগে উহানে হওয়া মৃত্যুর হার সংশোধন করে ৫০% বাড়ানোর পরও চীনের মৃত্যুর হার অনেক কম।

এরকম ক্ষেত্রে আমরা কি আসলেই পরিসংখ্যান বিশ্বাস করতে পারি?

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর একটি ইতালি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর একটি ইতালি

জনসংখ্যা বিবেচনা

একটি দেশের সাথে আরেকটি দেশের জনসংখ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকতে পারে।

বিশেষ করে বিন্যাসের ক্ষেত্রে - যেমন গড় বয়স অথবা কোন ধরণের এলাকায় কী পরিমাণ মানুষ থাকে, এর ভিত্তিতে।

যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যেও তুলনা করা হয়েছে, তবে এই তুলনা করার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। আয়ারল্যান্ডে জনসংখ্যার ঘনত্ব যুক্তরাজ্যের চেয়ে অনেক কম এবং তাদের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে বাস করে।

এর চেয়ে ডাবলিন শহর আর একই আয়তনের যুক্তরাজ্যের কোনো একিটি শহরাঞ্চলের তুলনা করা বেশি যুক্তিযুক্ত।

আবার বয়সের কাঠামো অনুযায়ী দুই অঞ্চলে যথাযথ পরিমাপ করা হচ্ছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

যেমন, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশগুলোর তুলনা করা ঠিক হবে না, কারণ আফ্রিকার দেশগুলোর জনসংখ্যা বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ।

আর কোভিড-১৯ এ অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ব্যক্তিরাই বেশি মারা গেছে বলে এখন পর্যন্ত দেখা গেছে।

বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যসেবা

ইউরোপ আর আফ্রিকার দেশগুলোর মানুষের বয়সের তারতম্যই যে তাদের তুলনার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়, তা নয়।

প্রায় প্রতিটি ইউরোপিয়ান দেশই অধিকাংশ আফ্রিকান দেশের চেয়ে বেশি অর্থায়ন পেয়ে থাকে।

Woman and girl look at view of Manhattan, New York

ছবির উৎস, Getty Images

দেশগুলো তাদের স্বাস্থ্যসেবার মানের ভিত্তিতে প্রতিটি দেশ এই মহামারি পরিস্থিতিতে নিজেদের নাগরিকদের সেবা দিচ্ছে এবং একেক দেশের ক্ষেত্রে এই গুণগত মান একেক রকম।

সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ডি ট্যাটেম বলেন, "মানুষ স্বেচ্ছায় চিকিৎসা নিতে আসে কিনা, হাসপাতালের সেবা পাওয়া কতটা সহজ, ভাল চিকিৎসা পেতে আপনার কত খরচ করতে হয় - এই বিষয়গুলো একেক জায়গায় একেক রকম।"

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'কো মরবিডিটি'র মাত্রা - অর্থাৎ কোন দেশের মানুষের মধ্যে কী পরিমাণ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা (ডায়বেটিস, হৃদরোগ অথবা উচ্চ রক্তচাপ) বিরাজমান, সে বিষয়টি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই এ ধরণের কোনো রোগে ভুগতে থাকলে তার মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

পরীক্ষা

মহামারির শুরুর দিকে যেসব দেশ বিপুল পরিমাণ পরীক্ষা করেছে এবং পরবর্তীতে শনাক্ত হওয়াদের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করেছে, তারাই পারতপক্ষে সবচেয়ে সফলভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে সক্ষম হয়েছে।

জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অন্য অনেক দেশের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম।

নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের মধ্যে কী পরিমাণ পরীক্ষা চালানো হয়েছে, তা অপেক্ষাকৃত কম মৃত্যুহারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে।

সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনো না কোনো মাত্রায় জারি করা হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনো না কোনো মাত্রায় জারি করা হয়েছে

আবার সব দেশের পরীক্ষার পরিসংখ্যানও এক নয়।

কোনো কোনো দেশ কতজনকে পরীক্ষা করা হলো সেটা নথিভুক্ত করে, আবার কোনো কোনো দেশ মোট পরীক্ষার সংখ্যা (অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই শনাক্ত করতে একাধিকবার পরীক্ষা চালাতে হয়) নথিভুক্ত করে।

কখন পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পরীক্ষা কোথায় করা হচ্ছে সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়া অনেক আগেই বহু মানুষের পরীক্ষা করেছে এবং ভাইরাস ছড়ানোর মাত্রা সম্পর্কে তাদের একটি তাদের মধ্যে ধারণা তখন থেকেই তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সেদিক থেকে দেখলে, ইতালিও বিপুল সংখ্যক পরীক্ষা করেছে এবং সেখানে মৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি।

ইতালিতে মহামারি ছড়িয়ে যাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে তারা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়েছে।

যুক্তরাজ্যও একই নীতি অনুসরণ করছে।

তুলনা করা কঠিন

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেসন ওকে বলেন, "অন্য একটি দেশ কেন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আরেক দেশের চেয়ে ভালো করছে, সেটি আমরা জানতে চাই, যেন আমরা তাদের নেয়া পদক্ষেপ থেকে কিছু শিখতে পারি।"

"এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুস্পষ্ট তুলনা পাওয়া যায় কোন দেশ কী পরিমাণ পরীক্ষা করছে, সেই ভিত্তিতে।"

কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এই মহামারি পরিস্থিতি শেষ না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিকভাবে জানা যাবে না যে কোন দেশ কতটা কার্যকরী ভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করতে পেরেছে।