করোনাভাইরাস: ভারতে রবিবারে স্বাস্থ্যকর্মীদের তালি বাজিয়ে ধন্যবাদ, দুদিন পরেই সামাজিক হেনস্থা

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীতে যখন স্বাস্থ্যকর্মী, অর্থাৎ ডাক্তার-নার্সরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তার মধ্যেই ভারতে অভিযোগ উঠছে যে সেখানে তাদের সামাজিক হেনস্থার মুখে পড়তে হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় কিছু এলাকার বাসিন্দারা তাদের পাড়ায় থাকা ডাক্তার নার্সদের অন্যত্র চলে যেতে চাপ দিচ্ছেন।

তাদের ভয়, করোনাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে চিকিৎসক বা নার্সদের শরীরেও করোনা সংক্রমণ হতে পারে, যাতে শেষ পর্যন্ত তারাও আক্রান্ত হবেন।

এরকম কিছু ঘটনা অন্যান্য দেশে ঘটেছে, তবে এবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় চিকিৎসক এবং নার্সদের একইভাবে সামাজিক হেনস্থার ঘটনা সামনে এলো।

চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীরা বলছেন, দুদিন আগেই সারা দেশ যেখানে হাততালি বা থালা, কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জরুরী পরিষেবা চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ধন্যবাদ দিলেন, তারপরেই এ কেমন অমানবিক ব্যবহার!

কলকাতার একটি বেসরকারী হাসপাতাল, যেখানে এক করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে সোমবার, সেখানকার এক পুরুষ নার্স নাম উল্লেখ না করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমার অনেক সহকর্মীকে যেমন ভাড়া বাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে, আমাদের বাড়ির মালিক তেমন কিছু বলেন নি, কিন্তু অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা আপত্তি তুলছেন।"

"কেউ বলছেন এই সময়টা ডিউটিতে না গিয়ে বাড়িতে থাকতে, আর কাজে গেলে সেখানেই থেকে যেতে। আমরা তো নিজেরাও আক্রান্ত হতে পারি! সেই ঝুঁকি নিয়েও কাজ করছি। সমাজ যদি আমাদের এইসময়ে পাশে না দাঁড়ায়, সেটা খুবই লজ্জার।"

চিকিৎসা কর্মীরা বলছেন, তাদের অনেককে যেমন বাড়ি ছাড়ার কথা বলছেন মালিকরা, পাড়াপড়শীরাও বলছেন - হাসপাতাল থেকে বাড়ি না আসার কথা বলছেন। কোথাও আবার পাড়ার দোকানে গেলেও কথা শোনাচ্ছেন মানুষজন।

সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ যেমন চিকিৎসা কর্মীদের প্রতি মায়ামমতা দেখাচ্ছে না, ছাড় দিচ্ছে না তাদের সন্তানদেরও।

একটি হাসপাতালের আরেক পুরুষ নার্সের কথায়, "আমি যেহেতু আমরি হাসপাতালে কাজ করি, তাই আমার মাধ্যমে আমার মেয়েরও ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে, এরকম একটা ভয় ঢুকেছে পাড়ায়। সেরকম হলে কি আমি নিজেই পরিবারের সঙ্গে থাকব?"

"ওর সঙ্গে খেলাধুলোও করছে না অন্য বাচ্চারা। আবার ওর প্রাইভেট টিউটর বারে বারে শুধু ওকেই জিজ্ঞাসা করছেন যে সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে গেছে কী না - অন্য বাচ্চাদের কিছু বলছেন না কিন্তু উনি। আমি তাই বাচ্চার পড়া আপাতত বন্ধ রেখেছি।"

ওই নার্সের অভিমান, "দুদিন আগে লোক দেখানো কাঁসর ঘন্টা হাততালি দেওয়া হল আমাদের মতো স্বাস্থ্যকর্মীদের আর তারপরেই এরকম হেনস্থা হচ্ছে। আসলে আমরা যতই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিই না কেন, আমাদের পাশে কেউই দাঁড়ায় না!"

সরকারী - বেসরকারী ক্ষেত্রের বেশ কিছু চিকিৎসককেও একইরকম সামাজিক হেনস্থার মুখে পড়তে হচ্ছে - বেশিরভাগেরই অভিযোগ তাদের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা হচ্ছে।

তবে চিকিৎসকেরা চাইছেন না সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে নিজেদের আরও বেশি করে সমাজের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যেতে - তাতে হেনস্থা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা।

কলকাতার প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কুণাল সরকার বলছিলেন, তিনিও তার পরিচিত অনেক চিকিৎসকদের কাছ থেকে জেনেছেন এরকম হেনস্থার ঘটনা।

"খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে এগুলো। তবে এগুলো নতুন কিছু নয়। আগেও যখন যক্ষ্মা বা কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা করতেন ডাক্তাররা, বা আরও হালে এইচ আই ভি রোগীর চিকিৎসা করা ডাক্তারদের এরকম সামাজিক হেনস্থার মুখে বারে বারেই পড়তে হয়েছে।"

"আসলে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের মনে চিকিৎসা পরিষেবা দিই আমরা যারা, তাদের সম্পর্কে একটা অন্য রকম মনোভাব আছেই - যেগুলো এইসব সময় বেরিয়ে আসে। ওই তালি বা ঘন্টা বাজিয়েছে অনেক মানুষ ঠিকই, কিন্তু তাদের মনোভাব পাল্টায় নি," বলছিলেন ডাক্তার সরকার।

ডাক্তার - নার্সদের হেনস্থার কথা অনেক চিকিৎসা কর্মীই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পোস্ট করছেন।

সেগুলোতেও একই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সামনের সারিতে থেকে করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন যারা, তাদের কদিন আগেই অভিনব ধন্যবাদ দেওয়ার পরে এ কেমন অমানবিক আচরণ এক শ্রেণীর মানুষের!

চিকিৎসকরা যৌথভাবে সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছেন যাতে এরকম হেনস্থা বন্ধ হয়।