করোনাভাইরাস: মোকাবিলার সক্ষম দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের কী নেয়ার আছে

    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

গত বছরের শেষ ভাগে চীনের উহান শহরে সর্বপ্রথম করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং কয়েক মাসের মাথায় সেটি ছড়িয়ে পড়ে শতাধিক দেশে ।

শুরুতে চীনে যে হারে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছিল, তখন ধারণাই করা যায়নি যে এতোটা দ্রুত তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীনের মতো সফলতার উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরও।

আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত রোগ সনাক্ত, সফল ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আরও নানা উদ্যোগের কারণে সেটা সম্ভব হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশ, এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ওইসব সফল দেশগুলো থেকে কিছু বিষয় উদাহরণ হিসেবে প্রয়োগ করতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার দুই মাসের মাথায় হংকং-এ প্রথম কোন আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত হন।

তবে যথেষ্ট পূর্ব প্রস্তুতি থাকার কারণে ওই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিতে সেভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারেনি।

ভাইরাসট প্রতিরোধে এমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশও।

আরও পড়তে পারেন:

এ ধরণের সফলতার উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশও করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক।

তিনি বলেন, "করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ একটু নাজুক অবস্থায় আছে। কারণ আমাদের দেশ জনবহুল, আর এই ভাইরাস খুবই সংক্রামক।"

"যেসব দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে তার অনেকগুলোতেই বাংলাদেশিরা কাজ করে। তারা দেশে আসা যাওয়া করে। কিন্তু চীন আগের অবস্থায় নেই। তারা তাদের গবেষণা দিয়ে অনেকটাই কন্ট্রোল করে এনেছে। আমরা তাদেরকে অনুকরণ করে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছি।"

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার আগে থেকেই সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা শুরু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর)।

বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার বসানোর পাশাপাশি হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়েছে। কোয়ারান্টিন করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটি মূলত: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে।

যে কোন সংক্রামক রোগ দেখা দিলে সেটি প্রতিরোধে কোন পর্যায়ে কী ধরণের ব্যবস্থা নিতে হবে সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সংগঠন কিছু নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

তবে যে দেশগুলো সফলতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তারা এই নির্দেশগুলো মেনে চলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

যেমন হংকং স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরী, জিমনেসিয়াম, বন্ধ রেখেছে, সরকারি দপ্তরগুলোয় বাড়ি থেকে কাজ করতে বলা হচ্ছে।

সেখানকার প্রায় শতভাগ মানুষের মুখে মাস্ক পরা। সবাই চেষ্টা করছে ভিড়, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে।

সাধারণ জ্বর বা কাশি থাকলেও তারা কর্মক্ষেত্রে আসছে না। প্রতিটি ভবনের প্রবেশপথের সামনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা রয়েছে।

নিরাপত্তারক্ষীরা সবার শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করছেন।

হংকং ও চীনের মধ্যে মোট ১৪টি বর্ডার পয়েন্টের মাত্র চারটি খোলা রাখা হয়েছে।

সেখান থেকে যারাই হংকংয়ে প্রবেশ করছেন - তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে। কোয়ারেন্টিন যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তা মনিটর করছে হংকংয়ের পুলিশ প্রশাসন।

এদিকে জ্বর নিয়ে কাউকেই দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না সিঙ্গাপুর। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, হ্যান্ডওয়াশ বা এসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে দেশটি।

ভাইরাস নিয়ে গুজব ছড়ানোর প্রমাণ পেলেই হচ্ছে জেল-জরিমানা। স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও যুক্ত হয়েছে এসব কাজে।

আবার দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার অনেক কম । কারণ তারা সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে করোনার অস্তিত্ব শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

এজন্য তারা আধুনিক সব পরীক্ষাগার স্থাপন করেছে। যেখানে করোনা শনাক্ত করতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এবং সপ্তাহে তারা দেড় লাখ নমুনা পরীক্ষা করতে সক্ষম।

তবে বাংলাদেশের এখনই শক্ত কোন অবস্থানে যাওয়ার সময় আসেনি বলে মনে করছেন আইইডিসিআর-এর পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

"আমাদের দেশে পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়ার প্রযোজ্য সময় এখনই এটা নয়। যদি প্রয়োজন হয় আমরা এই পদক্ষেপগুলো নেবো। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে সর্দি-কাশি-জ্বর থাকলে বাসায় বসে নামাজ পড়তে, বিদেশ থেকে কেউ আসলে যেন ১৪ দিন নিজেকে আলাদা রাখেন।"

"আর জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ওষুধ প্রশাসন দেখছে। পরিস্থিতির মাত্রা অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। বাড়াবাড়ি করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।"

এদিকে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সফল দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি আইইডিসিআর এর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে।

ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এরই মধ্যে ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ১৭ই মার্চ মুজিব জন্মশতবর্ষের আয়োজনও সীমিত করে আনা হয়েছে।

ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা খুব বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টারের সহকারী পরিচালক ড. আয়েশা আক্তার।

তিনি বলেন, "সিঙ্গাপুরে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন কমে আসছে, তেমনি তাদের মৃত্যুর সংখ্যা নাই। তাদের উদাহরণ টেনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ওরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল মেনেই চিকিৎসা দিচ্ছে। আমরাও ডেইলি সিঙ্গাপুরের সাথে যোগাযোগ রাখছি।"

"তবে সবার আগে প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা। করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়ার পরও মানুষ যদি সেটা লুকায়, নিয়মগুলো ফলো না করে - তাহলে সেটা কিন্তু আইনত অপরাধ।"

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাংলাদেশে যেহেতু এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে - তাই উচিত হবে প্রচলিত ব্যবস্থায় আরও গতি আনা।