মুজিব জন্মশতবার্ষিকী: ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা যেভাবে দেখেছেন শেখ মুজিবুর রহমান মুজিব

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, আকবর হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তরুণ বয়সে যখন মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সে সময় কলকাতায় ঘটে যায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সে দাঙ্গার বর্ণনা তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছেন শেখ মুজিব।
সেই দাঙ্গা শেখ মুজিবের মনে গভীর দাগ কেটেছিল তার মনে। তিনি তখন পুরোদস্তুর মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।
তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দাবিতে ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' পালনের ঘোষণা দেন, এর পরিপ্রেক্ষিত শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা।
শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইতে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেছেন এভাবে..
"হাশিম সাহেব আমাদের নিয়ে সভা করলেন। আমাদের বললেন, 'তোমাদের মহল্লায় মহল্লায় যেতে হবে, হিন্দু মহল্লায়ও তোমরা যাবে। তোমরা বলবে, আমাদের এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আসুন আমরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে দিনটি পালন করি।' আমরা গাড়িতে মাইক লাগিয়ে বের হয়ে পড়লাম। হিন্দু মহল্লায় ও মুসলমান মহল্লায় সমানে প্রোপাগান্ডা শুরু করলাম। অন্য কোন কথা নাই, 'পাকিস্তান' আমাদের দাবি। এই দাবি হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। ফরোয়ার্ড ব্লকের কিছু নেতা আমাদের বক্তৃতা ও বিবৃতি শুনে মুসলিম লীগ অফিসে এলেন এবং এই দিনটা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে হিন্দু মুসলমান এক হয়ে পালন করা যায় তার প্রস্তাব দিলেন। আমরা রাজি হলাম। কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রোপাগান্ডার কাছে তারা টিকতে পারল না। হিন্দু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিল এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।"

ছবির উৎস, সিআরআই
কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় আক্রান্তদের রক্ষা করতে শহর চষে বেড়িয়েছেন তরুণ শেখ মুজিব ও তার রাজনৈতিক সঙ্গীরা।
দাঙ্গার সময় শেখ মুজিব ও তার একজন রাজনৈতিক সহযোগী মোয়াজ্জম চৌধুরীর উপর অন্যতম দায়িত্ব ছিল মুসলমান অধ্যুষিত একটি বস্তি পাহারা দেবার।
কারণ তারা দুজনের কাছেই বন্দুক ছিল এবং দুজনেই বন্দুক চালাতে জানতেন। শেখ মুজিবুর রহমান এমনটা লিখেছেন তার আত্মজীবনীতে।
সে বস্তি পাহারা দিতে গিয়ে শেখ মুজিব জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন ইতিহাসবিদ ও গবেষক আফসান চৌধুরী।
মি. চৌধুরী বলেন, "তিনি ও মোয়াজ্জম চৌধুরী বন্দুক চালাতে জানতেন। এবং যথেষ্ট সাহস লাগে রাতে বেলায় কলকাতার বস্তি পাহারা দিতে। সে বস্তিতে কলকাতার আসা অভিবাসী শ্রমিকরা থাকতো। এদের বেশিরভাগ গিয়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে।"
১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার বেশ বিস্তারিত বিবরণ আছে শেখ মুজিবের আত্মজীবনীতে।

ছবির উৎস, সিআরআই
শেখ মুজিব এবং তার রাজনৈতিক সহযোগীরা ভাবতেই পারেননি যে দাঙ্গা বেধে যেতে পারে।
মুসলিম নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণা অনুযায়ী 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' পালনের অংশ হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে মুসলিম লীগের পতাকাও উত্তোলন করেছেন।
তখনও তিনি দাঙ্গার আঁচ মাত্র দেখেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। শেখ মুজিবের বর্ণনা অনুযায়ী, এক পর্যায়ে দাঙ্গাকারীদের রুখতে তিনি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যান।
শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীতে একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এভাবে, "আমাদের কাছে খবর এলো, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। কয়েকজন ছাত্রকে ছাত্রীদের কাছে রেখে, আমরা চল্লিশ পঞ্চাশজন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভালো ছিল না"।
"দেখি শতশত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করছে। মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তার পিছে ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি ও তলোয়ার হাতে। পাশেই মুসলমানদের কয়েকটা দোকান ছিল। কয়েকজন লোক কিছু লাঠি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াল। আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' দিতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে অনেক লোক জমা হয়ে গেল"।
"হিন্দুরা আমাদের সামনা-সামনি এসে পড়েছে। বাধা দেয়া ছাড়া উপায় নাই। ইঁট পাটকেল যে যা পেল তাই নিয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করে গেল। আমরা সব মিলিয়ে দেড়শত লোকের বেশি হব না। কে যেন পিছন থেকে এসে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের কয়েকখানা লাঠি দিল। এর পূর্বে শুধু ইট দিয়ে মারামারি চলছিল। এর মধ্যে একটা বিরাট শোভাযাত্রা এসে পৌঁছাল। এদের কয়েক জায়গায় বাধা দিয়েছে, রুখতে পারে নাই। তাদের সকলের হাতেই লাঠি। এরা এসে আমাদের সাথে যোগদান করল। কয়েক মিনিটের মধ্যে হিন্দুরা ফিরে গেল, আমরাও ফিরে গেলাম।"
শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী পড়ে বিশ্লেষকদের অনেকেই তাঁর দুটো দিক লক্ষ্য করেছেন।
একটি হচ্ছে, তিনি মুসলিম লীগের জন্য পাকিস্তান আন্দোলন করছেন, এবং দাঙ্গার সময় তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে আক্রান্তদের রক্ষা করছেন।
এক্ষেত্রে কে মুসলমান এবং কে হিন্দু সে বিষয়টি তিনি বিবেচনা করেননি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক খুরশিদা বেগম বলেন, দাঙ্গার সময়টাতে শেখ মুজিব প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যেতেন সহিংসতা থামানোর জন্য।
"উনি মুসলিম লীগের কাজ করছেন সক্রিয় কর্মী হিসেবে। পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে আছেন, আবার তাঁর মন মানসিকতা সবটুকুই অসাম্প্রদায়িক দেখছি। উনি প্রতিদিন সকালে বের হয়ে যাচ্ছেন কিভাবে দাঙ্গা থামানো যায় সে লক্ষ্য নিয়ে," বলছিলেন খুরশিদা বেগম।
কলকাতায় যখন দাঙ্গা শুরু হয় তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, যিনি শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরুও বটে।
মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবে শেখ মুজিব চেয়েছিলেন পাকিস্তান আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে।
কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়ে যখন দাঙ্গা শুরু হয়, তখন দাঙ্গা থামানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন শেখ মুজিব।
যেমনটা বলছিলেন গবেষণা সংস্থা এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মাহফুজা খানম।
"তিনি সবসময় যে কথা বলেছেন যে আগে আমি মানুষ, তারপরে বাঙালী এবং তারপরে মুসলমান। রাজনৈতিক কারণে তাকে মুসলিম লীগের জন্য লড়তে হয়েছিল। কিন্তু মনে প্রাণে তিনি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। যে কারণে তিনি দাঙ্গা থামাতে এগিয়ে গেছেন।"

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণনায় কলকাতার দাঙ্গার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এই দাঙ্গায় শুধু একটি পক্ষ মার খায়নি। উভয় ধর্মের মানুষ রক্তাক্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের মনোভাব ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে। এমনটাই উঠে এসেছে শেখ মুজিবের আত্মজীবনীতে।
"কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য! মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্যা করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়।"
শেখ মুজিব আরো লিখেছেন, যারা দাঙ্গা থামাতে গিয়েছে কিংবা আক্রান্তদের সাহায্য করতে গিয়েছিলেন তারাও বিপদে পড়েছিল।
"মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু'এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি। আমার মনে হয়েছে, মানুষ তার মানবতা হারিয়ে পশুতে পরিণত হয়েছে। প্রথম দিন ১৬ই অগাস্ট মুসলমানরা ভীষণভাবে মার খেয়েছে। পরের দুইদিন মুসলমানরা হিন্দুদের ভীষণভাবে মেরেছে। পরে হাসপাতালের হিসাবে দেখা দেখা গিয়েছে।"
শেখ মুজিব লিখেছেন, একদল লোক ছিল যারা দাঙ্গাহাঙ্গামার ধার ধারেনা। দোকান ভাঙ্গা আর লুট করাই ছিল তাদের কাজ। ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। সন্ধ্যার পর রাস্তায় নামলেই দেখামাত্র গুলির নির্দেশ ছিল।
শেখ মুজিবের ছোটভাইসহ পরিবারের কিছু সদস্য কলকাতায় ছিলেন। তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন তিনি।
এসব কিছুর মধ্যেও আক্রান্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে তিনি পিছপা হননি। এমনটাই বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল।
"একদিকে যখন মুসলমানরা আক্রান্ত হচ্ছে হিন্দু দাঙ্গাকারীদের হাতে, তখন তিনি তাদের রক্ষা করতে গিয়েছেন। আবার অন্যদিকে হিন্দুরা যখন আক্রান্ত হচ্ছে মুসলমান দাঙ্গাকারীদের হাতে তখন তিনি হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন," বলছিলেন অধ্যাপক মেজবাহ কামাল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৪৬ সালের সেই দাঙ্গা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বড় ধরণের পরিবর্তন এনেছিল। সেজন্য পরবর্তী সময়ে অসাম্প্রদায়িকতা তার রাজনীতির মূল ভিত্তি হয়ে উঠে।








