নতুন উদ্যমে মহাকাশে বুদ্ধিমান প্রাণী খুঁজতে চান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা

Very Large Array (VLA) observatory

ছবির উৎস, Getty Images

যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় মানমন্দিরের প্রধান বলেছেন পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধানের বিষয়টিতে আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

ডক্টর অ্যান্থনি বিসলি বিবিসিকে বলেন - এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে গত কয়েক দশক ধরে সরকারি অর্থায়ন ক্রমাগত কমেই আসছে। এই ক্ষেত্রে সরকারের সমর্থন বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অ্যামেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সাইন্সের একটি বৈঠকে এই মন্তব্য করেন ডক্টর বিসলি।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি অবজারভেটরির পরিচালক ডক্টর বিসলি মনে করেন যে 'জোতির্বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রের মত মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণের খোঁজের বিষয়টিও' গুরুত্বের সাথে নেয়ার সময় হয়েছে।

পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমত্তা অনুসন্ধানের বিষয়টি বিজ্ঞানের ঠিক প্রথাগত গবেষণার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে পড়ে না।

ডক্টর বিসলি'র মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি সংস্থা জানিয়েছে যে নিউ মেক্সিকোর একটি মানমন্দির 'ভেরি লার্জ অবজারভেটরি'কে পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব খোঁজায় অর্থ সহায়তা দেবে তারা।

ভেরি লার্জ অবজারভেটরি একটি মানমন্দির যেখানে একাধিক অ্যান্টেনা রয়েছে এবং এই মানমন্দিরে পৃথিবীর সবচেয়ে সুসজ্জিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রও রয়েছে বলে মনে করা হয়।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বারক্লি'র যে দলটি মহাকাশে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজায় নিয়োজিত রয়েছে, সেই দলের প্রধান ডক্টর অ্যান্ড্রু সিয়েমিওন মন্তব্য করেন যে ভেরি লার্জ অবজারভেটরি মহাকাশে প্রাণ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় যোগ দেয়ায় এই কাজে সফলতার সম্ভাবনা '১০ গুণ, বা ১০০ গুণও' বেড়ে যেতে পারে।

আরো পড়তে পারেন:

ভেরি লার্জ অবজারভেটরির টেলিস্কোপ, যেটি দিয়ে মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজা হবে, দেখতে অনেকটা এরকম হবে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভেরি লার্জ অবজারভেটরির টেলিস্কোপ, যেটি দিয়ে মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজা হবে, দেখতে অনেকটা এরকম হবে

পৃথিবীর বাইরে আসলেই কী প্রাণের অস্তিত্ব আছে?

আমাদের পৃথিবীর বাইরে প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কিনা বা সত্যিই এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে কিনা, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক কখনই শেষ হবার নয়।

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে এ বিষয়ে মানুষের কৌতুহল শুধু বেড়েছেই।

এ মাসের শুরুতেই বৈজ্ঞানিক মনিকা গ্রেডি মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি 'প্রায় নিশ্চিত' যে জুপিটারের একটি চাঁদ 'ইউরোপা'য় প্রাণের অস্তিত্ব আছে।

তবে সেটি হাঁটাচলা করতে পারার বা কথা বলতে পারা কোনো এলিয়েন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

লিভারপুল হোপ ইউনিভার্সিটির গ্রহ ও মহাকাশ বিষয়ক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিকা গ্রেডি বলেন, সেখানে যে ধরণের প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে, তা 'অক্টোপাসের বুদ্ধিমত্তার কাছাকাছি প্রাণী' হতে পারে।

তিনি মনে করেন ঐ প্রাণীটি ইউরোপার বরফের নিচে থাকতে পারে।

বৃহস্পতি গ্রহের যে ৭৯টি চাঁদের সম্পর্কে জানা গেছে, ইউরোপা তার মধ্যে একটি। এটি ১৫ মাইল পুরু বরফের আস্তরণে ঢাকা।

এবছরের শুরুতে মার্কিন মহাকাশ বিজ্ঞানীদের একটি দল ধারণা প্রকাশ করেন যে তারা যদি মহাকাশে অক্সিজেনের অস্তিত্ব খুঁজে বের করতে পারেন তাহলে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেতেও সক্ষম হবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহে অক্সিজেন গ্যাস খোঁজার একটি পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছেন বলে জানিয়েছেন।

মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠে মহাকাশ স্টেশন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠে মহাকাশ স্টেশন

প্রাণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে মঙ্গলগ্রহে!

অধ্যাপক গ্রেডি মনে করেন মঙ্গলগ্রহে প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেলেও সেখানে খুব উন্নত বুদ্ধির কোনো প্রাণী পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

তিনি বলেন: "মঙ্গলগ্রহে যদি প্রাণের সন্ধান পাওয়াও যায়, সেটি খুবই ক্ষুদ্র আকৃতির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন ধরুন, ব্যাকটেরিয়ার মত।"

বৃহস্পতি গ্রহ ও তার কয়েকটি চাঁদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বৃহস্পতি গ্রহ ও তার কয়েকটি চাঁদ

মহাকাশের বার্তা!

গত সপ্তাহে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশ থেকে প্রতি ১৬ দিন অন্তর পাঠানো বার্তা শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

এই ধরণের সিগন্যাল বা বার্তা পাওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, তবে এর আগে আসা এরকম বার্তা একেবারেই এলোমেলোভাবে এসেছে। এরকম ধারাবাহিক বিরতিতে এর আগে সিগন্যাল পাওয়া যায়নি।

এই বার্তাগুলো কোথা থেকে আসছে সে বিষয়ে এই মুহুর্তে তারা নিশ্চিত না হলেও এগুলো ব্ল্যাক হোল বা বড় কোনো নক্ষত্র থেকে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, সিগন্যালটি মাঝারি আকারের কোনো ছায়াপথ থেকে আসছে যেটি ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত হতে পারে।

পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার পরিকল্পনা রয়েছে নাসা'র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার পরিকল্পনা রয়েছে নাসা'র

যেভাবে মহাকাশে প্রাণ খোঁজার পরিকল্পনা

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা হিমায়িত গ্রহ বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপাতে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতে মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

২০২৩ সালে প্রথম মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

মঙ্গলগ্রহে এরই মধ্যে 'অপরচুনিটি' ও 'ইনসাইট'এর মত মহাকাশযান পাঠিয়েছে নাসা, যেগুলো থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা বোঝার চেষ্টা করেছে মঙ্গলগ্রহে প্রাণের ধরণ আসলে কেমন।

এছাড়া আগামী কয়েকবছরেও মঙ্গলগ্রহে বেশ কয়েকটি অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

তবে অধ্যাপক গ্রেডির মতে, "পৃথিবী থেকে অন্যান্য গ্রহের দূরত্ব এতই ব্যাপক যে সেসব গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে আমরা আদৌ সফল হবো কিনা তা কখনোই বলা যায় না।"

"আর এখন পর্যন্ত মহাকাশ থেকে যেসব সিগন্যাল পাওয়া গেছে, দু:খজনকভাবে সেগুলোর মধ্যে কোনোটাই যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য বা আসল নয়।"

আমাদের পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা বা সত্যিই এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে কিনা, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক কখনোই শেষ হবার নয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আমাদের পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা বা সত্যিই এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে কিনা, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক কখনোই শেষ হবার নয়

মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা সেবিষয়ে গবেষণা চালাতে একসময় বছরে প্রায়‌ এক কোটি ডলার বিনিয়োগ করতো নাসা। তবে ১৯৯৩ সালে সেনেটর রিচার্ড ব্রায়ানের প্রণীত এক আইনের ফলে বন্ধ হয়ে যায় অর্থায়ন। সেনেটর ব্রায়ান মনে করতেন এই গবেষণায় নিয়োজিত অর্থ অপচয় হচ্ছে।

সেসময়ের পর থেকে মহাকাশে বুদ্ধিমান প্রাণের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশে সেরকম কোনো সরকারি অর্থায়ন হয়নি।

সেসময় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা হাতে গোনা কয়েকটি গ্রহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গিয়েছিল।

কিন্তু আমরা জানি এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে।

ডক্টর সিয়েমিওন মনে করেন মহাকাশবিজ্ঞানের এই অগ্রগতির ফলেই অনেক বিজ্ঞানী এখন পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধান করতে আগ্রহী হয়েছেন।

ডক্টর সিয়েমিওন বলেন, "মানুষ রাতের আকাশের দিকে যখনই তাকিয়েছে, তখনই তার মনে হয়েছে 'ওখানে কি কেউ আছে?'"

"এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার সক্ষমতা এখন আমাদের আছে, যেটিকে হয়তো মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলা যাবে।"