লন্ডনে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ: বর্ণবাদের যাতাকলে ৩০ বছর

নরওয়েল রবার্টস (বাম থেকে প্রথম)
ছবির ক্যাপশান, নরওয়েল রবার্টস (বাম থেকে প্রথম)

নরওয়েল রবার্টস লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ ফোর্সের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সদস্য।

প্রতিষ্ঠানের বর্ণবাদি দুর্নাম ঘোচানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া সংস্কারের অংশ হিসাবে এই কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু চাকুরীতে ঢোকার পর দশকের পর দশক ধরে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তো বটেই, তার সহকর্মীদের কাছ থেকেও তাকে নিত্যদিন বর্ণবাদি আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

নরওয়েল রবার্টস সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন বিবিসির অ্যালেক্স লাস্টের কাছে।

চাকরির ইন্টারভিউতে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কেন তিনি পুলিশে যোগ দিতে চান।

"আমি বলেছিলাম, আমি মানুষকে সাহায্য করতে চাই, তাছাড়া পুলিশের চাকরি স্থায়ী এবং নিরাপদ।"

তবে কাজে ঢুকে এমন ঝক্কি যে তাকে পোহাতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবেননি যুবক নরওয়েল।

"কেউ যদি আমাকে সাবধান করতো আমি হয়তো এই চাকরি নেওয়ার আগে দুইবার ভাবতাম। আমি সহ্য করে গেছি, কিন্তু আমার প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কখনই নয়।"

'উইন্ডরাশ' কৃষ্ণাঙ্গরা ব্রিটেনে নানা বর্নবাদি বিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, 'উইন্ডরাশ' কৃষ্ণাঙ্গরা ব্রিটেনে নানাভাবে বর্নবাদি বিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন

'তারা আমার রক্তের রং দেখতে চেয়েছিল'

নরওয়েল রবার্টস ৯ বছর বয়সে বিধবা মায়ের হাত ধরে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চল আ্যাঙ্গুইলা থেকে ইংল্যান্ডে এসেছিলেন। তারা ছিলেন কথিত উইন্ডরাশ প্রজন্ম যাদেরকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের পুনর্গঠনে ক্যারিবিয় অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।

প্রচুর সংখ্যায় আসা কৃষ্ণাঙ্গ এই অভিবাসীদের তখন চরম বৈষম্য এবং বর্ণবাদি আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চাকরি বা বাসস্থান পাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ ছিল।

লন্ডনে নেমে নরওয়েলের মা গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন। তারা দুজন লন্ডনের কাছে কেন্ট এলাকার ব্রমলি নামের একটি ছোটো শহরে বাসা নিয়েছিলেন। তারাই ছিলেন ব্রমলির প্রথম এবং একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবার।

"স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর, উঁচু ক্লাসের কজন ছাত্র একদিন আমার মাথায় আঘাত করলো। তারা দেখতে চেয়েছিল আমার রক্তের রং কেমন। এখনও আমার মাথায় সেই দাগ রয়ে গেছে।"

টিকতে না পেরে মা ও ছেলে চলে আসেন লন্ডনের ক্যামডেন টাউনে।

"নতুন স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখানে বেশ কিছু কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে-মেয়ে ছিল, এশীয় ছেলেমেয়ে ছিল। পরিবেশ পরিস্থিতি বেশ ভালোই ছিল। আমি জীবন উপভোগ করতে শুরু করলাম।"

৭০ এর দশকে লন্ডনে অভিবাসনের বিরুদ্ধে মিছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ৭০ এর দশকে লন্ডনে অভিবাসনের বিরুদ্ধে মিছিল

পুলিশের চাকরি, বর্ণবিদ্বেষের নতুন অধ্যায়

তার বয়স যখন ১৬ নরওয়েলকে বাড়ি ছাড়তে হলো। কারণ সৎ বাবা তাকে পছন্দ করতেন না। কিশোর নরওয়েল তখন একটি ল্যাবরটরিতে টেকনিশিয়ানের কাজ নিলেন। সে সময় একদিন সংবাদপত্রে পুলিশের চাকরির একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ে তার।

নরওয়েল বললেন তিনি আবেদন করেছিলেন কিছুটা মজা করতে। কারণ তিনি জানতেন লন্ডনের পুলিশে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নেই এবং সেখানে তার কোনোদিনও চাকরি হবেনা।

"আমি বিজ্ঞাপন দেখে ভেবেছিলাম - দেখিনা আবেদন করে চাকরিটা হয় কিনা। অবশ্য আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে আমাকে নেওয়া হবে।"

কিন্তু লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ চাকরি হলো নরওয়েল রবার্টসের। তাকে হেন্ডন পুলিশ ট্রেনিং কলেজে পাঠানো হলো।

সেসময় তার ঐ নিয়োগের কথা বড় করে ব্রিটেনের রেডিও-টিভি সংবাদপত্রে প্রচারিত হয়েছিল।

"যে ১৩ সপ্তাহ আমি প্রশিক্ষণ কলেজে ছিলাম, সেসময় কয়েকবার আমাকে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি করা হয়েছে। কারণ আমি ছিলাম লন্ডনের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ। একরকম সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছিলাম।"

প্রশিক্ষণ শেষে তাকে লন্ডনের বো স্ট্রিট পুলিশ স্টেশনে নিয়োগ দেওয়া হলো। তখন ১৯৬৭ সাল। ২১ বছরের নরওয়েলের জীবনে সেদিন থেকে শুরু হলো দু:স্বপ্নের কাল।

প্রথম দিন কাজে যোগ দেওয়ার কথা স্মরণ করছিলেন তিনি।

"প্রথম দিন খুবই রোমাঞ্চ বোধ করছিলাম। কিন্তু আমি যখন যোগদানের জন্য আমার সিনিয়র অফিসারের কাছে গেলাম, তিনি আমাকে আমার গায়ের রং অর্থাৎ 'এন' অক্ষর দিয়ে শুরু শব্দ দিয়ে আমাকে সম্বোধন করলেন। বললেন, তিনি নিশ্চিত করবেন আমি যেন আমার প্রবেশন পিরিয়ড না উৎরোতে পারি।"

নিজের বসের কাছ থেকে প্রথম দিনেই এই বর্ণবাদি আচরণে হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন নরওয়েল।

পুলিশের প্রতি ব্রিটেনের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আস্থা কখনই তেমন ছিলনা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুলিশের প্রতি ব্রিটেনের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আস্থা কখনই তেমন ছিলনা, এখনও কম।

একদিকে পুলিশের বড়কর্তারা নরওয়েলকে দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন পুলিশ ফোর্স আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে বাস্তবে নরওয়েলকে প্রতিদিন কাজের জায়গায় তার শ্বেতাঙ্গ সহকর্মীদের কাছ থেকে হরেক রকম বর্ণবাদি কটূক্তি এবং হেনস্তার শিকার হতে হতো।

"আমার ইউনিফর্মের বোতাম ছিড়ে রাখা হতো। আমার টাই ছিড়ে রাখা হতো। আমার গাড়িতে পয়সা দিয়ে আঁচড় দেয়া হতো।"

কাজের জায়গায় একঘরে

কাজের জায়গায় সহকর্মীরা কেউ তার সাথে বলতে চাইতো না। এড়িয়ে চলতো।

"আমার সাথে কথা বলা হয়তো তাদের জন্য বিপজ্জনক ছিল। কোনো সহকর্মীকে যদি আমার সাথে কথা বলতে দেখা যেত, তাকে একঘরে করে ফেলা হতো। পুলিশ স্টেশনের বয়স সবচেয়ে সিনিয়র অফিসারটি ভীষণ রগচটা ছিলেন। অন্যরা তাকে ভীষণ ভয় পেত। তিনি সবাইকে বলতেন, তারা যেন আমার সাথে কথা না বলে।"

"একটা ব্যাপারে আমি সবচেয়ে কষ্ট পেতাম। কিছু সহকর্মী অফিসের বাইরে আমার সাথে কথা বলতো, কিন্তু কাজে এসে এমন ভাব দেখাতো তারা যেন আমাকে চেনেই না।"

পুরোপুরি একঘরে কারে রাখা হয়েছিল নরওয়েলকে।

"কাজ শেষে আমি সেকশন হাউজে গিয়ে গোপনে কাঁদতাম। কেঁদে হাল্কা হওয়ার চেষ্টা করতাম বাথরুমে ঢুকে ট্যাপ খুলে আমি কাঁদতাম যাতে কেউ শব্দ না শোনে।"

ক্যান্টিনে আমার সহকর্মীরা তাস খেলতো, তাকে নেওয়া হতোনা। একবার খেলার সুযোগ পেয়ে বেশ জুয়া ধরে কিছু পয়সা খুইয়েছিলেন। "কিন্তু আমি অখুশি হইনি। মনে হয়েছিল কিছু পয়সা হারিয়েছি, কিন্তু ওরা তো আমাকে অন্তত খেলতে দিয়েছে।"

সেসময় পুলিশের সাথে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক ছিল খুবই খারাপ। সে কারণে অনেক জায়গায় তার শ্বেতাঙ্গ সহকর্মীদের চেয়ে নরওয়েলের গ্রহণযোগ্যতা ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি।

"বো স্ট্রিটে আমাকে প্রতিদিন হেনস্থা হতে হতো, কিন্তু যখন রাস্তায় আসতাম, বাজারের ফেরিওয়ালারা-কুলিরা আমার সাথে চমৎকার আচরণ করতো। হাতে ফল গুজে দিত। দাম নিতে চাইতো না। সাধারণ মানুষের সাথে আমার সম্পর্ক সবসময় খুব ভালো ছিল। তারা অনেকে বাড়িতে চায়ের দাওয়াত দিত। আমি যেতাম।"

কিন্তু সড়কেও তার সহকর্মীদের কাছ থেকে মুক্তি ছিলনা।

একদিন তিনি কভেন্ট গার্ডেন অপেরা হাউজের বাইরে দাঁড়িয়ে ডিউটি করছেন।। পাশ দিয়ে একটি টহল পুলিশের গাড়ি থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদি গালি ছুড়ে দেওয়া হলো।

"আশপাশে অনেক মানুষ। ফলে আমি খুবই অপমানিত হলাম। আমি রাস্তার উল্টোদিকে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে চিফের রুমে গেলাম। তার কাছে নালিশ করলাম। শুনে তিনি আমাকে বললেন - আমি কি করতে পারি? আমি খুবই মুষড়ে পড়লাম। আমি ভাবলাম - এই প্রথমবারের মতো আমি অভিযোগ করলাম, কিন্তু আমার বস তা আমলেই নিতে চাইছেন না !"

কিন্তু এত কিছুর পরও নরওয়েল পুলিশের চাকরি ছাড়তে চাইলেন না। অন্যরা তাকে যত বিরক্ত করতে লাগলো, তিনি তত জেদি হয়ে উঠলেন যে তিনি চাকরি ছাড়বেন না।

"আমি প্রেসের কাছে গিয়ে অভিযোগ করতে পারতাম, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে যেতে পারতাম। কিন্তু করিনি। কারণ আমি তা করলে, অন্য কৃষ্ণাঙ্গরা আর হয়তো পুলিশে ঢোকার কথা ভাবতই না।"

৭০ দশকের মাঝামাঝি এসে লন্ডন পুলিশে আরো কিছু কৃষ্ণাঙ্গকে নেয়া হয়, তবে সংখ্যায় খুবই কম। ২১ হাজার শ্বেতাঙ্গ পুলিশের বদলে মাত্র ৪০ জনের মত অশ্বেতাঙ্গ।

আশির দশক থেকে ব্রিটিশ পুলিশে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ক্রমে বাড়ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আশির দশক থেকে ব্রিটিশ পুলিশে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ক্রমে বাড়ছে

লন্ডনের অ্যাফ্রো-ক্যারিবিয়ান অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দারা তাকে কীভাবে নিতো?

"আমার মনে আছে এক রাতে চেয়ারিং ক্রস রোডে একটি কফির দোকানে ডাকাতির খবর পেয়ে দৌড়ে গেলাম।। রাত তখন ১১টা। ক্যাফের দরজা খুললো একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। খুলেই আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো - জুডাস। তারপর দৌড়ে পালিয়ে গেল। সে আমাকে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে দেখেছিল কারণ আমি কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও তাকে ধরতে এসেছি!"

"তবে আমার সম্প্রদায় আমাকে কখনই একঘরে করেনি। ডিউটিতে থাকার সময় রাস্তায় নানা বয়সের অনেক কৃষ্ণাঙ্গ এসে আমার সাথে হাত মেলাতো। অভিবাদন জানাতো। আমার খুবই ভালো লাগতো।"

পদোন্নতি, পদক

এক সময় ডিটেকটিভ সার্জেন্ট হিসাবে তার পদোন্নতি হয়। অপরাধ তদন্ত বিভাগে গোয়েন্দা হিসাবে তাকে কাজ করতে হতো। সিআইডিতে যাওয়ার পর চাকরিটা কিছুটা স্বস্তির হয়ে উঠলো।

"তবে আমি যেহেতু জনপ্রিয় ছিলাম, ফলে অনেকে সহকর্মী ঈর্ষা করতো। আমি আমার কষ্টগুলো চেপে রাখতাম। সেটা হয়তো ঠিক নয়, কারণ সে কারণেই হয়তো আমি অনেক কিছু ভুলতে পারিনি।"

১৯৯৬ সালে নরওয়েল রবার্টস তার কাজের জন্য রানীর পদক পেয়েছিলেন। এ নিয়ে তিনি খুবই গর্বিত। পরের বছরই ৩০ বছর চাকরির পর তিনি অবসর নেন।

পরপরই এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে হত্যার ঘটনার তদন্ত রিপোর্টে বলা হয় - লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদি। আর সেই বর্ণবাদের যন্ত্রণা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন নরওয়েল। তবে তিনি মনে করেন পরিস্থিতি এখন অনেক বদলেছে।

"পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। আমি ভাবি, আমি যদি এখন পুলিশে ঢুকতাম তাহলে কত ভালো হতো।"

নরওয়েল রবার্টস চান তার সে সময়ের সহকর্মীদের কেউ এসে তাকে বলেন- 'আমি জানি তোমার কি দুর্ভোগ গেছে, তার জন্য আমি দু:খিত।'

কিন্তু তা কখনই হয়নি।

"কেউই কখনই দোষ স্বীকার করতে চায়নি। তবে আমি মনে করি, আমি যা করেছি তার প্রয়োজন ছিল, এবং আমি তার জন্য গর্বিত।"