আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইতিহাসের সাক্ষী: ইরানের মোসাদ্দেককে যেভাবে উৎখাত করেছিল আমেরিকা ও ব্রিটেন
ইরানের ১৯৭৯ সালে শাহের পতন এবং ইসলামী বিপ্লবকে সবাই মানেন দেশটির ইতিহাসে এক মোড়বদলকারী ঘটনা হিসেবে।
কিন্তু এর ২৬ বছর আগে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল যার কথা এখন অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন, কিন্তু সেটিই ছিল বিংশ শতাব্দীতে ইরানের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা - যা দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
সেটি হচ্ছে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান - যাতে উৎখাত হয়েছিলেন ইরানের তৎকালীন জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক, আর ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন শাহ।
এই অভ্যুত্থানের পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল মার্কিন ও ব্রিটিশ দুই গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং এম আই সিক্স।
সেই কাহিনি জানাচ্ছেন বিবিসির এ্যালান জনস্টন।
ইরানের শাহ বরখাস্ত করলেন মোসাদ্দেককে
১৯৫৩ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি। ইরানে একটা ঘটনা ঘটলো। দেশটির সম্রাট রেজা শাহ পাহলবী তার প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করলেন।
কিন্তু আসলে ঘটনাটা মোটেই এমন সরল ছিল না।
এর সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
এতটাই গভীরভাবে যে এমনকি মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করা হয়েছিল সরকারি যে ডিক্রি দিয়ে - সেটাও লিখে দিয়েছিলেন একজন সিআইএ'র এজেন্ট।
"নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কারণে আমরাই সেই আদেশপত্রটি লিখে দিয়েছিলাম" - বলছিলেন কারমিট রুজভেল্ট, যিনি তেহরানে সে সময় সিআইয়ের প্রধান এজেন্ট ছিলেন।
"আমার একজন লোক ছিল - যে নিখুঁত ফারসি জানতো। আমরাই সেই ঘোষণাটি লিখলাম, তার পর সেটা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম শাহের কাছে।"
কারমিট রুজভেল্ট ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্টের নাতি। তিনিই ছিলেন মোসাদ্দেকবিরোধী অভ্যুত্থানের পেছনের কারিগর।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, শাহের হাতে থাকুক তেলের নিয়ন্ত্রণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল যেন তেল সমৃদ্ধ দেশটির সর্বময় নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা-সমর্থক শাহের হাতেই থাকে। তাই পরিকল্পনা হয়েছিল, মোসাদ্দেককে সরিয়ে তার জায়গায় প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো হবে শাহের অনুগত জেনারেল ফজলোল্লাহ জাহেদিকে।
কিন্তু একটা আশংকা ছিল যে এই জেনারেলকে হয়তো অভ্যুত্থানের আগেই গ্রেফতার করা হতে পারে । তা যেন হতে না পারে, সে জন্য মাঠে নামলেন এজেন্ট রুজভেল্ট।
"আমি জেনারেল জাহেদির এ্যাপার্টমেন্টে গেলাম। তাকে আমার গাড়ির পেছনে ওঠালাম তার পর কম্বল দিয়ে তাকে ঢেকে দিলাম। তার পর তাকে নিয়ে গেলাম আরেক এজেন্টের বাড়িতে। সেখানেই তাকে রাখা হলো।"
সেই অভ্যুত্থানে মূল মুহুর্তটা ছিল, প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বাড়ি ও অফিস আক্রমণ করা। এ জন্য কাজে লাগানো হয় শাহের অনুগত সৈন্যদের।
এ ছাড়া 'বিক্ষুব্ধ জনতা' হিসেবে কাজ করার জন্য শহরের বাজার এলাকা থেকে একদল লোককে ভাড়া করা হয়। এই লোকদের পেছনে কিছু নগদ অর্থ খরচ করতে হয়েছিল।
"আমরা আমাদের প্রধান এজেন্টদের কিছু টাকা দিয়েছিলাম। তারা বলেছিল, খুব বেশি টাকা লাগবে না, তবে কিছু অর্থ পেলে লোকেরা খুশি হবে। আমরা তাদের ৭০ হাজার ডলার দিলাম। সব মিলিয়ে আমাদের টাকা বলতে লেগেছিল এটুকুই। আমার জানা মতে এ অর্থ দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লোককে। এদের মধ্যে ছিল একদল ভারোত্তলক - যারা মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাদের বেশ মোটা অংকের টাকা দেয়া হয়েছিল।"
পশ্চিমা দেশের সাথে মোসাদ্দেকের দ্বন্দ্ব
এই অভ্যুত্থানের আগে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের দ্বন্দ্ব চলেছিল। তিনি দৃঢপ্রতিজ্ঞ ছিলেন যে তেলের একটা বড় অংশ সেদেশের জনগণের জন্য সংরক্ষিত রাখতে।
এ জন্য তিনি এ্যাংলো-ইরানীয়ান তেল কোম্পানিটি জাতীয়করণ করেছিলেন - যা পরিচালনা করতো ব্রিটিশরা। তাই এ সিদ্ধান্ত ক্ষিপ্ত করে তোলে ব্রিটেনকে।
ক্রুদ্ধ ব্রিটেন ইরানের তেল উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন স্নায়ুযুদ্ধের যুগ। লন্ডন থেকে ওয়াশিংটনকে এটা বোঝানো হয় - এমন ঝুঁকি আছে যে ইরান হয়তো কমিউনিস্ট শিবিরে যোগ দিতে পারে।
তখন আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে এ ব্যাপারে তাদের কিছু একটা করতে হবে।
ইরানের শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে মোসাদ্দেকের প্রতি জোর সমর্থন ছিল। কিন্তু ইরানী সমাজের কিছু শক্তিশালী অংশের সাথে তার একটা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছিল।
সিআইএ বুঝতে পারলো যে ইরানের শাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব উস্কে দিয়ে সহজেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে।
নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন শাহ
প্রথম দফা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, শাহ তার স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে বাগদাদ চলে যান।
তবে বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দ্বিতীয় দফা অভ্যুত্থানে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। প্রধানমন্ত্রী হন জেনারেল জাহেদি, এবং নির্বাসন থেকে তেহরান ফিরে আসেন শাহ।
মি. মোসাদ্দেকের নাতি হেদায়েত মতিন দফতরী সেসময় ছিলেন ছাত্র। তিনি ১৯৫৩ সালের আগস্ট মাসে ছুটি কাটাতে এসেছিলেন তেহরানে। তার মনে আছে সেই অভ্যুত্থানের সময় কি ঘটেছিল।
"সেদিন দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল একেবারেই স্বাভ।বিক। তার পর হঠাৎ করেই আমরা শুনলাম লোকজনের গোলমাল, গোলাগুলির শব্দ। আমরা দাদুর বাড়ির খুব কাছেই থাকতাম। যখন আমরা বুঝতে পারলাম যে ওই বাড়িটা ঘেরাও হয়ে যাচ্ছে, তখন আমার এক সম্পর্কীয় ভাই প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির ভেতরে গেল, সেখান থেকে আমার দাদী এবং তার কয়েকজন কাজের লোককে বের করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এলো।"
"এর পর আমরা ওই ভবনটিতে আর ঢুকতে পারি নি। চারদিকে যত রাস্তা বা গলি ছিল সব দিক থেকে বাড়িটা ঘিরে ফেলা হলো, ট্যাংক এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমার দাদুর বাড়ির ওপর আক্রমণ চালানো হলো। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির ভেতরে ট্যাংক ঢুকে পড়লো, ছাদটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া হলো।"
"আমরা তার এবং তার সাথে থাকা অন্য লোকদের জীবনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। তার মধ্যে ছিলেন কয়েকজন মন্ত্রী এবং রক্ষী - যারা প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলেন।"
"তবে এক পর্যায়ে মোসাদ্দেক ঠিক করলেন এখানে কোন রক্তপাত হতে দেয়া যাবে না। তিনি ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। তিনি ঠিক করলেন, তিনি সাদা পতাকা হাতে বেরিয়ে আসবেন - যাতে তাকে রক্ষার দায়িত্বে থাকা সৈন্য ও কর্মকর্তারা প্রাণে বেঁচে যান।"
"কিন্তু কিছু লোক মারা গিয়েছিল। আমার দাদুর একজন দেহরক্ষী নিহত হয় তার ঘরের দরজার ঠিক পেছনেই।"
মোসাদ্দেক হাতে সাদা পতাকা নিয়ে ওই ভবন থেকে বেরুতে পারেন নি। দোতলার জানালার ভেতর দিয়ে সেই সাদা পতাকার ওপরও গুলি করা হয়।
"তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা পেছনের দরজা দিয়ে বেরুবেন, বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে একজন প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেবেন। "
লুটতরাজের জন্য লোক আনা হয়েছিল
"তারা তাই করলেন। তার সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন কর্ণেল। অনেক বছর পরে তিনি বলেছিলেন, তিনি পেছন ফিরে দেখতে পাচ্ছিলেন যে কিছু লোককে বাড়ি লুট করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।"
"তিনি বলেছিলেন, সেই লোকগুলো লুটতরাজে এমন ব্যস্ত ছিল যে বাড়ির লোকেরা যে সিঁড়ি দিয়ে পালাচ্ছে এটা তারা টেরই পায় নি। আমার দাদু এবং তার সাথের লোকেরা এক প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, তার পর আরেকটি বাড়িতে গিয়ে রাত কাটালেন।"
"প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হিংস্রভাবে লুটতরাজ চালানো হলো। কেউ কেউ দরজা জানালা পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেল। তারা ছিল অশিক্ষিত লোক, তাদেরকে টাকা দিয়ে আনা হয়েছিল শুধু লুটপাট করার জন্যেই এবং তারা খুশি মনেই সেটা করেছিল।"
"একটা দৃশ্য আমার সব সময় মনে পড়ে। আমার দাদীর একটা সেলাই মেশিন ছিল - সেটার পায়ের নিচে চাকা লাগানো ছিল। একজনকে দেখলাম আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সেটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আমি লোকটাকে দেখছিলাম। ভাবছিলাম, এরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে না যে তারা কি করছে, তারা তাদের নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছে।"
কয়েকদিনের মধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক গ্রেফতার হলেন। বিচারের পর তাকে কারাদন্ড দেয়া হলো।
পরে অবশ্য তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন, তবে তাকে ১৯৬৩ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত গৃহবন্দী করে রাখা হয়।।
আরো পড়তে পারেন:
মি. মোসাদ্দেকের নাতি হেদায়েত মতিন দফতরী দেখেছেন কীভাবে মি. মোসাদ্দেক তার জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়েছেন।
"তিনি নিশ্চয়ই জানতেন যে কারা কিভাবে তার পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু তার দু:খ ছিল এই যে ইরানের সেনা কর্মকর্তারা - যাদের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র, তার আইন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা - তারাই এতে জড়িত ছিলেন। "
"যারা এম আই সিক্স ও সিআইএর দালাল ছিল তাদের প্রতি তার ততটা ক্ষোভ ছিল না, কিন্তু সেনা কর্মকর্তারা যে এতে জড়িত হয়েছিলেন, নিজ সরকারের সাথে বেঈমানি করেছিলেন - এই ভাবনা তাকে সারাজীবন কষ্ট দিয়েছে।"
যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন ১৯৫৩ সালে যা চেয়েছিল তা তারা অর্জন করতে পেরেছিল। অভ্যুত্থানের পর ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।
কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবে তিনিও ক্ষমতাচ্যুত হন।
কিন্তু মোসাদ্দেক সরকার উৎখাতের ঘটনাটিকে দেখা হয় গণতন্ত্রের পথে ইরানের যাত্রার প্রতি এক বড় আঘাত হিসেবে।
পশ্চিমা বিশ্বে অনেকেই এ ঘটনার কথা প্রায় ভুলে গেছে, কিন্তু ইরানের বহু মানুষের মনে এ ঘটনা স্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছে।
তারা এখনো ব্রিটেন এবং আমেরিকাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখে।