আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিমানের মুনাফা: দেনা শোধ না করে লাভ কতটা যৌক্তিক?
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
এ বছরের ৪ঠা জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠার ৪৮তম বার্ষিকী পালন করেছে। এই ৪৮ বছরের মধ্যে ২৮ বছরই লোকসান করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সেই সঙ্গে যাত্রী সেবার মান, নিরাপত্তা এবং সময়ানুবর্তিতাসহ নানা ক্ষেত্রে দেশীয় বেসরকারি বিমান সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সমান তালে বিমান এগিয়ে যেতে পারেনি।
যাত্রীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বেসরকারি একটি সংস্থায় কাজের সূত্রে নিয়মিত ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা যাতায়াত করেন শুভ্রা রহমান বসুনিয়া, যিনি বলছেন, সেবার মানে পিছিয়ে থাকলেও নিরাপত্তায় বিমান এগিয়ে।
"প্রথম কথা বিমানের টিকেট পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত সেবার মান অন্য এয়ারলাইন্সের চেয়ে বিমানে ভালো এটা বলা যাবে না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি বিমান উড্ডয়নের সময় থেকে অবতরণ পর্যন্ত যাত্রীর নিরাপত্তায় বিমান সবচেয়ে এগিয়ে।"
তবে, উদ্যোক্তা সাদিয়া আফরিন অ্যানি, যিনি কাজের সূত্রে প্রায়ই দেশের বাইরে যাতায়াত করেন, তিনি বলছেন, বিমানের উড্ডয়ন এবং অবতরণের সময় ঠিক না থাকার কারণে তিনি বিমানকে প্রথম পছন্দে রাখেন না।
আরো পড়ুন:
"বিমান সময় ঠিক রাখতে পারে না, মানে দেশ থেকে বাইরে যেতে বা ধরুন বিদেশ থেকে দেশে আসার সময় ফ্লাইট 'ডিলে' প্রায় নিয়মিত হয়। আমি যেমন এখন থাইল্যান্ডে যাবো, সেক্ষেত্রে অন্তত চার-পাঁচ হাজার টাকা কমে টিকেট পেলেও আমি বিমানের টিকেট কাটিনি। আমি বিদেশী একটি সংস্থার টিকেট কেটেছি"
সরকার কী বলছে
এসব অভিযোগ স্বীকার করে বিমান বলছে, এগুলো বহু বছর থেকে চলে আসলেও সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি এসব ঘাটতি উত্তরণে মনোযোগ দিয়েছে।
গত ১০ বছরের মধ্যে ছয় বছর বিমানের মোট লোকসান হয় এক হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, বাকি সময়ে সংস্থাটির মোট লাভের পরিমান ৭৭৭ কোটি টাকা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মোঃ. মাহবুব আলী বলেছেন, ঘাটতি উত্তরণে বাড়তি মনোযোগ দেবার কারণেই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লাভের মুখ দেখেছে বিমান। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ২১৮ কোটি টাকা লাভ করেছে।
"বছরের পর বছর ধরে বিমান লোকসান করার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, আমরা একে একে সেসব চিহ্নিত করে সমাধান করার চেষ্টা করছি। যেমন অভিযোগ রয়েছে বিমানের টিকেট পাওয়া যায় না, কিন্তু বিমান খালি যায়। সেক্ষেত্রে টিকেট বিক্রিতে অনিয়মের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছি আমরা।"
"এছাড়া বিমানের যেসব পারচেজ এবং মেইনটেনেন্স এসব ক্ষেত্রে যেসব দুর্বলতা এবং অনিয়ম সেসব দূর করার চেষ্টা করছি আমরা, সামনে আরো ভালো হবে আশা রাখি।" এসব চেষ্টার কারণে বিমান মুনাফা করতে পেরেছে বলে মনে করেন মিঃ আলী।
তিনি আরো জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আগের চেয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ।
ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালে প্রায় দুই বছর পর ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে কার্গোবাহী সরাসরি বিমান চলাচলের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
কিন্তু লাভ আসলে কতটা লাভ?
নব্বই এর দশকে ক্রমাগত লোকসানের মুখে বিমান বাংলাদেশকে বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
২০০৭ সালে বিমানকে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করা হয়, কিন্তু তারপরেও বিমান লোকসান এড়াতে পারেনি।
এমনকি ২০১৯ সালে সংসদে প্রতিমন্ত্রী মিঃ আলী জানিয়েছিলেন ২০১৭-১৮ সালেও বিমানের লোকসান হয় ২০১ কোটির বেশি টাকা।
কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিমান মোট আয় করে পাঁচ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা, একই সময়ে সংস্থাটির ব্যয় হয় পাঁচ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা।
এতে ২১৮ কোটি টাকা লাভ হয় সংস্থাটির।
কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যে লোকসান কাটিয়ে মুনাফা করার যে দাবী বিমান করছে, তাকে পুরোপুরি যৌক্তিক মনে করেন না বিশ্লেষকেরা।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা পদ্মা অয়েল কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেয়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ বিমানের কাছে এখনো সংস্থাটির পাওনা দুই হাজার ৬৩ কোটি টাকা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম প্রশ্ন তোলেন, বিমানের যে বিশাল ঋণ, তা পরিশোধ না করে কিভাবে লাভের হিসাব করা যায়
"যেকোন বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় এর জ্বালানি অর্থাৎ জেট ফুয়েলের পেছনে। এরপর আরো অন্তত ১০-১৫ শতাংশ খরচ হয় বিভিন্ন কর এবং ফি এর পেছনে, যেটি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আদায় করে। এখন বিমানের জ্বালানি ব্যয়ের একটি বড় অংশ অপরিশোধিত যদি থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান লাভ কিভাবে করলো---সেটা একটা বড় প্রশ্ন।"
কেবল পদ্মা অয়েল নয়, আরেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের কাছেও বিমানের বকেয়া রয়েছে কয়েকশো কোটি টাকা।
তবে, বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বিমানের দুর্ঘটনার হার অন্য দেশীয় বিমান সংস্থার চেয়ে অনেক কম।
বিমান কী বলছে?
১৯৭২ সাল থেকে পদ্মা অয়েল এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের কাছে বিমানের কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি দেনার একটি বড় অংশ 'গভর্নমেন্ট ইক্যুয়িটি'তে পরিণত করা হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাওনা অর্থের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ে ২০১৯ সালে বেশ কয়েকবার বৈঠক হলেও এখনো বিষয়টি সুরাহা হয়নি।
বিমান বলছে, পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য বিমানের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা চুক্তি হয়েছে।
বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার বলছেন, এই ঋণের সঙ্গে মুনাফার হিসাব মেলানো যাবে না।
"বিমানের যেটা বকেয়া অর্থ সেটাকে আলাদা হিসাবে নেয়া হয়েছে। সেটা আমাদের ম্যানেজমেন্ট আলাদাভাবে দিচ্ছে, আলাদা অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কিস্তিতে দেয়া হচ্ছে। তবে এ বছর আমাদের নেট মুনাফা ২১৮ কোটি টাকা। আর সেটা অর্জন করার জন্য আমাদের টিকেট বিক্রি এবং নতুন রুট চালু করা হয়েছে, সেটার ভূমিকা রয়েছে।"
প্রায় আট বছর বন্ধ থাকার পর আজই বিমান ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটে আবার ফ্লাইট চালু করেছে। ২০১২ সালে বিমান সংকটের কারণে এ রুটে ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা।
মিজ খন্দকার আরো জানিয়েছেন, গত অর্থবছরে মুনাফার সাথে সাথে বিমানের যাত্রী পরিবহন সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান গত বছর পাঁচ লাখ সাত হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহণ করেছে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে সাড়ে ২২ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে।