এনআরসি নিয়ে কেন ভিন্ন সুর অমিত শাহ আর মোদীর?

রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রী মোদী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রী মোদী
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

সারা ভারত জুড়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি তৈরি করার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আবার দেশকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন বলে বিরোধীরা অভিযোগ তুলছেন।

গোটা দেশ জুড়ে এনআরসি হবে বলে এর আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে ঘোষণা করেছেন।

অথচ রবিবার দিল্লিতে এক জনসভায় নরেন্দ্র মোদী বলেন তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এনআরসি নিয়ে কখনওই না কি কোনও চর্চা ছিল না, কেবল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তারা আসামে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাধ্য হয়েছেন।

সরকারের কাছ থেকে এধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসার পর পর্যবেক্ষকদের ধারণা দেশব্যাপী বিক্ষোভের মুখে সরকার আসলে এনআরসি প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে চায় - আর সোমবার ঝাড়খন্ডে বিজেপির শোচনীয় পরাজয়ও এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ

আসলে ভারত সরকার সারা দেশ জুড়ে নাগরিকদের তালিকা তৈরির অভিযান নিয়ে অগ্রসর হবে কি না, রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভাষণের পর থেকেই তা নিয়ে আবারও চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নরেন্দ্র মোদী সেখানে দাবি করেন, "২০১৪ সালে আমার সরকার ক্ষমতায় আসার পর এনআরসি নিয়ে কোনও চর্চাই ছিল না, কোনও কথাও হয়নি। শুধু যখন সুপ্রিম কোর্ট বলল, তখনই সরকারকে শুধু আসামে এটা করতে হয়েছে।"

কিন্তু মাত্র মাসখানেক আগেই পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এনআরসি নিয়ে ঠিক এর উল্টো সুরে কথা বলেছিলেন।

অমিত শাহ তখন বলেন, "এনআরসি প্রক্রিয়া শুধু সারা দেশেই হবে না - এমন কী আসামেও তা নতুন করে করা হবে।"

ভারতে নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসি-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতে নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসি-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

তার যুক্তি ছিল, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই বৈধ নাগরিকদের তালিকা প্রস্তুত করা ও অবৈধদের চিহ্নিত করা খুব জরুরি।

কিন্তু বিরোধী নেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন, দেশবাসী তাহলে কার কথা বিশ্বাস করবে - মোদী না অমিত শাহ?

সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি যেমন বলছেন, "নাগরিকত্ব আইন আর এনআরসি যে যমজ সন্তান, একটার সঙ্গেই আরেকটা আসবে - অমিত শাহ কিন্তু আগাগোড়া এই প্যাকেজ আকারেই জিনিসটা বিক্রি করে এসেছেন।"

"আর প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আর পার্লামেন্টে অমিত শাহর ঘোষণা দুটো তো একসঙ্গে ঠিক হতে পারে না - কোনটা ঠিক তারা বলুন।"

সিপিআইএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সিপিআইএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি

"আর এনআরসি যদি না-ই করবেন, খোলাখুলি সেটা দেশকে বলুন - সেটাও তো আপনারা বলছেন না!"

দেশব্যাপী এনআরসি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকেই খন্ডন করছেন, টুইট করে তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও।

আর মোদী ও অমিত শাহের বক্তব্যের ফারাক ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন বিজেপি নেতারাও।

বিজেপি এমপি রাকেশ সিনহা যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "লোকে এমনভাবে এনআরসি-কে আক্রমণ করছে যেন এটা কোনও ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ। দেশের নাগরিকদের তালিকা করায় অপরাধটা কোথায়?"

বিজেপি এমপি রাকেশ সিনহা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিজেপি এমপি রাকেশ সিনহা

"আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো এনআরসি করার কোনও সময়সূচী ঘোষণা করেননি, চার্টারও বেঁধে দেননি।"

"আর প্রধানমন্ত্রী বলছেন এখন এনআরসি হবে না, ব্যাস এইটুকুই!", বেশ দুর্বলই শোনায় তার সাফাই।

দিল্লির জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিরোধীরাও সাময়িক কালক্ষেপণের কৌশল হিসেবেই দেখছেন - ভারতব্যাপী এনআরসি শিকেয় তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে নয়।

তারা মনে করছেন, এদিন ঝাড়খন্ড রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয়ও সম্ভবত এনআরসি-কে আরও পিছিয়ে দেবে - কিন্তু বিজেপির রোডম্যাপ থেকে মুছে দেবে না।

দিল্লিতে এনআরসি-বিরোধী সমাবেশে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বৃন্দা কারাট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে এনআরসি-বিরোধী সমাবেশে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বৃন্দা কারাট

দিল্লির যন্তর মন্তরে এদিন এক প্রতিবাদসভায় বামপন্থী রাজনীতিক বৃন্দা কারাট বলছিলেন, "এবছরের জুলাইতেই সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা করা হয়েছে ২০২০-র ১লা এপ্রিল থেকে ঘরে ঘরে গিয়ে জাতীয় আদমশুমারি বা এনপিআর তৈরির কাজ শুরু হয়ে যাবে - আর তার ভিত্তিতেই তৈরি হবে এনআরসি।

"তাহলে প্রধানমন্ত্রী কাকে ধোঁকা দিচ্ছেন?" প্রশ্ন মিস কারাটের।

ভারতে পর্যবেক্ষকরাও তাই মনে করছেন, সারা দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে এনআরসি নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার এখন একটা 'ধীরে চলো' নীতি নিয়ে এগোতে চাইছে - আর সে কারণেই সৃষ্টি করা হয়েছে এই পরিকল্পিত বিভ্রান্তি।