ক্যান্সারকে পরাজিত করা নারী ফটোগ্রাফার যেভাবে ছোট ভাইয়ের ক্যান্সার নিরাময়েও সহায়তা করলেন

একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হিসাবে ছয়মাস ধরে যে কষ্টকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন কার্লি ক্লার্ক, সেই সময়ের নানা প্রোট্রেট ছবি তুলে রেখেছেন তিনি।

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হিসাবে ছয়মাস ধরে যে কষ্টকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন কার্লি ক্লার্ক, সেই সময়ের নানা প্রোট্রেট ছবি তুলে রেখেছেন তিনি।
    • Author, অলিভার জার্ভিস
    • Role, বিবিসি স্টোরিজ

কার্লি ক্লার্কের যখন ২০১২ সালে ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন সে নিজের শেষ দিনগুলোর ছবি তুলতে শুরু করে। সাত বছর পরে নিষ্ঠুর কাকতালীয় ঘটনার মতো তাকে নিজের ভাইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কাজ শুরু করতে হয়, যখন তার ভাইও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।

''আমার নিজের চুল আমার হাতে, কাপড়ে লেগে থাকতো আর বাথরুমে পড়ে থাকতো। মাথা ধোয়ার পরে চুল আঁচড়ালে চুল পড়া শুরু হয়ে যেতো।''

''আয়নায় আমি দেখতে পেতাম, আস্তে আস্তে আমার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।''

একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হিসাবে ছয়মাস ধরে যে কষ্টকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন কার্লি ক্লার্ক, সেই সময়ের নানা পোর্ট্রেট ছবি তুলে রেখেছেন তিনি।

সবশেষে তিনি তার বাবাকে অনুরোধ করেন যেন তিনি তার মাথা থেকে শেষ চুলগুলো কেটে ফেলে দেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৬ বছর।

''আমার মাথা ভর্তি চুল ছিল। আর এখন আমাকে দেখতে একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মতোই লাগে',' তিনি বলছেন।

আরো পড়তে পারেন:

কার্লি ক্লার্কের যখন ২০১২ সালে ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন সে নিজের শেষ দিনগুলোর ছবি তুলতে শুরু করে।

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, কার্লি ক্লার্কের যখন ২০১২ সালে ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন সে নিজের শেষ দিনগুলোর ছবি তুলতে শুরু করে।

এই ছবিগুলো তোলার ছয় মাস আগে কার্লি ক্যানাডার একটি স্বপ্নচারী মেয়ে ছিলেন, যিনি ভ্যাঙ্কুভারে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের প্রজেক্ট হিসাবে শহরতলীর দারিদ্রের নানা ছবি তুলছিলেন।

তবে ২০১২ সালের পরের ছয়মাস ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন।

তার সমস্যার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া থেকে অ্যাজমা। চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই লড়াইয়ের সময় তার ফুসফুস আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু তিনি সেসব কিছুই আর গুরুত্ব দেননি।

''এই অসুস্থতা, তা যাই হোক না কেন, আমার জীবনধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেবো না,'' তিনি বলেছেন।

আরো পড়ুন:

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আগে কার্লি কানাডার একটি স্বপ্নচারী মেয়ে ছিলেন, যিনি তার ভ্যাঙ্কুভারে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের প্রজেক্ট হিসাবে শহরতলীর দারিদ্রের নানা ছবি তুলছিলেন।

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আগে কার্লি কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের প্রজেক্ট হিসাবে শহরতলীর দারিদ্রের নানা ছবি তুলছিলেন

তিন মাস পরে কার্লি নিজের বুকের এবং শরীরের পেছন দিকে কষ্ট কমানোর জন্য আরো বেশি মরফিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যাতে তিনি একটু ঘুমাতে পারেন।

বিশেষ যত্ন পাওয়ার জন্য ক্যানাডার চিকিৎসকদের পরামর্শে বাড়িতে, ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন কার্লি।

সেখানে ২০১২ সালের মার্চে তার শরীরে হজকিন লিম্ফোমা নামের একটি বিরল ও আগ্রাসী ধরণের ক্যান্সারের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তার বাম দিকের ফুসফুস ও বুকের দেয়ালে আঙ্গুর আকৃতির একটি টিউমার বড় হয়ে উঠেছে।

নিজের পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের ছবি তুলতে শুরু করেন কার্লি

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, নিজের পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের ছবি তুলতে শুরু করেন কার্লি

তার পরিবারের জন্য এই সংবাদ মেনে নেয়া ছিল কষ্টকর একটা ব্যাপার।

''আমার বাবা-মার মনে হলো, কেউ যেন তাদের পাকস্থলী কেটে বের করে নিয়েছে। আমাদের পরিবারে ক্যান্সারের খুব বেশি ইতিহাস ছিল না।''

''আমার ছেলেবন্ধুও ভেঙ্গে পড়লো। সে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ইংল্যান্ডে চলে এলো আমার সঙ্গে থাকার জন্য।''

''আমার জীবন যেন ধীর গতিতে চলতে শুরু করলো। ওষুধের পর ওষুধ, অন্তহীন পরীক্ষা, বিশাল সূচ, গলার ভেতর দিয়ে পাইপ ঢুকানো আর এসবের মধ্যে আশা করা যে একদিন এসব কষ্টের দিন শেষ হবে,'' বলছেন কার্লি।

কার্লির বাম দিকের ফুসফুস ও বুকের দেয়ালে আঙ্গুর আকৃতির একটি টিউমার বড় হয়ে উঠেছে।

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, কার্লির বাম দিকের ফুসফুস ও বুকের দেয়ালে আঙ্গুর আকৃতির একটি টিউমার ধরা পড়ে।

সে সময় পৃথিবী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি, এবং নিজের সম্পর্কেও, পাল্টে যাচ্ছিল। সেসব সময় ছবিতে তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

''আমি ভাবলাম, সৃষ্টিশীল কিছুর মধ্যে ব্যস্ত হলে হয়তো এই কঠোর বাস্তবতা থেকে নিজেকে বের করে নিতে পারবো এবং আমার বর্তমান মানসিক আঘাত সামলে উঠতে পারবো,'' কার্লি বলছেন।

রিয়েলিটি ট্রমা হচ্ছে তার আত্মছবির একটি ধারাবাহিক, যেখানে হাসপাতালের ভেতর ও বাইরে তার জীবন পাল্টে যাওয়ার ছবি রয়েছে।

কার্লি ক্লার্কের ওষুধপত্র

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, কার্লি ক্লার্কের ওষুধপত্র

ছোট বা বড় সাক্ষাৎ, যাই হোক না কেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে যখন তখন ট্রাইপড এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের স্বাধীনতা দিয়েছে। অনেক সময় চিকিৎসক এবং সেবিকারা তার জন্য ক্যামেরার শাটার টিপে দিয়েছে।

কার্লি চেয়েছেন, তার কাজ যেন অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে যাতে তারা চেহারায় ক্যান্সারের ছাপ পড়লেও সেটার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন। সেটা যেন তাদের পরিচয়কে মুছে ফেলতে না পারে।

দুই মাসেই ১২ কেজি ওজন হারিয়েছিল কার্লি এবং তাকে নিয়মিত রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তখন তার ঘনঘন হাসপাতালে যাওয়ার দরকার হয়ে পড়ছিল।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থার সময় তিনি প্রায়ই অচেতন বা ঘুমিয়ে পড়তেন, হাসপাতালের প্রায় সব খাবার খেতে অনীহা প্রদর্শন করছিলেন। কোন পড়াশুনা করতে পারছিলেন না। এমনকি নিজের ছবি তুলতে বা ছেলে বন্ধুকে ফোন করতেও ক্লান্ত লাগতো।

কেমোথেরাপি নিচ্ছেন কার্লি ক্লার্ক

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, কেমোথেরাপি নিচ্ছেন কার্লি ক্লার্ক

তার কাশির সঙ্গে মাঝে মাঝে রক্ত বেরিয়ে আসতে শুরু করছিল।

কিন্তু তারপর একদিন, প্রায় তিন মাসের কেমোথেরাপির পর, তার কাশি বন্ধ হয়ে গেল। তার অন্যান্য লক্ষণগুলো কমে গেল।

তিনি ভাবলেন, চিকিৎসায় কাজ হতে শুরু করেছে। বায়োপসিতেও সেটা নিশ্চিত হওয়া গেল যে, ক্যান্সার হারতে শুরু করেছে। জীবন সম্পর্কে তার ধারণা আবার বদলে গেল।

''অসহায়ত্ব বদলে যেন আশাবাদ তৈরি হতো শুরু করলো- এবং তারপরে আনন্দ। যখন আপনি মৃত্যুর খুব কাছাকাছি আসবেন, তখন আপনি আপনার জীবন পুরোদমে কাটাতে চাইবেন।''

হাসপাতালের ওয়ার্ড কষ্টের স্থান থেকে যেন অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। হাসপাতাল কর্মীরা বন্ধু হয়ে উঠছে, এমনকি কোন কোন রোগীও।

সেখানে এক বয়স্ক দম্পতি ছিল, যাদের ভিন্ন ধরণের লিউকেমিয়া ছিল। অনেক সময় কার্লির সঙ্গে একই দিনে তাদেরও চিকিৎসা দেয়া হতো।

একদিন এক স্বামী জানালেন, তার স্ত্রী আর ক্রিসমাস দেখতে পারবে না।

'আমি সেই ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরলাম। তারা কখনোই আমার স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না।''

চিকিৎসা চলার সময় হাসপাতালে কার্লি ক্লার্ক

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, চিকিৎসা চলার সময় হাসপাতালে কার্লি ক্লার্ক

কার্লি যত ভালো বোধ করতে শুরু করলো, ততই সে বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে শুরু করলো।

তার ছেলেবন্ধু এবং বন্ধুরা তাকে প্রায়ই দুপুরের খাবারের জন্য বাইরে নিয়ে যেতো, অনেক সময় গাড়িতে করে সৈকতে বেড়াতে নিয়ে যেতো।

সহপাঠী এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে সে বুঝতে শুরু করলো যে, তার ছবিগুলো অন্যান্য মানুষকে স্পর্শ করতে শুরু করেছে।

কার্লি বলছেন, এসব ছবিতে শুধুমাত্র ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের শারীরিক বা মানসিক প্রভাবের বিষয়গুলো আসেনি, বরং, এটা যে ভীতিকর নয়, সেটাই ফুটে উঠেছে।

''যেসব ছবি আমি তুলেছিলাম, সেগুলো যখন দেখি, তা আমাকে শক্তি যোগায় কারণ এসব ছবিতে আমি জীবনপ্রান্তের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরের একটা অংশ তখনো বলতো যে, আমি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারবো।''

হাসপাতালের বিছানায় কার্লি, ওষুধে প্রতিক্রিয়ায় পিঠে লালচে র‍্যাশ

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, হাসপাতালের বিছানায় কার্লি, ওষুধে প্রতিক্রিয়ায় পিঠে লালচে র‍্যাশ

অন্যান্য ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের এসব ছবি দেখাতে শুরু করেছেন কার্লি। তাদের অনেকের ছবির পোর্ট্রেটও তিনি তুলতে শুরু করেছেন। সে সময় অনেকের মুখে হাসিও ফুটে ওঠে।

কার্লি বলছেন, ''এটা যদি সত্যি হয় যে, একটু হাসি বা সহায়তা, আন্তরিকতা একজন মানুষের আবেগকে পরিবর্তন করতে পারে, দিনকে উজ্জ্বল করতে পারে, তাহলে একটি ইতিবাচক ছবি একজনের জীবন পরিবর্তনেও সহায়তা করতে পারবে'।'

''এটা হয়তো কারো কারো মানসিক শক্তির কারণ হতে পারে এবং তাদের ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে যাতে তারা কষ্টের ভেতর দিয়ে গেলেও আশাবাদ ধরে রাখতে পারেন যে, খুব তাড়াতাড়ি এই কষ্টের শেষ হবে। আমার মতে, সব কঠিন সময়ের মধ্যেই এটাই মানুষকে ধরে রাখে'' কার্লি বলছেন।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন কার্লির চিকিৎসার সমাপ্তি হয়, তখন সে তার এই যাত্রাপথের পুরো সময়টা পেছন ফিরে যেন দেখতে পেলেন। ১৫টি রোল আর দেড়শ ছবি- এবং তিনি ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

কেমোথেরাপির এক পর্যায়ে কার্লি ক্লার্ক

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, কেমোথেরাপির এক পর্যায়ে কার্লি ক্লার্ক

এটা ছিল তার জীবনে উৎসব করার একটি সময়। কিন্তু যখন তারা বাড়িতে ফেরার সময় এলো, সেটা তার জন্য সহজ ছিল না।

যখন তিনি তার অব্যবহৃত ওষুধপত্র বাক্সে ভরে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিলেন, তখন বরং তার খারাপ লাগতে শুরু করলো যে, তিনি আর এই হাসপাতালে থাকছেন না।

''হাসপাতালের কর্মীরা এবং কোন কোন রোগী যেন আমার পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিল। আমরা অনেক মাস ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম।''

কয়েকমাস পরে কার্লি ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান এবং ছেলেবন্ধুর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার তিনি বাড়িতে আসেন এবং বছরে দুইবার ফলোআপের জন্য হাসপাতালে যান।

যতবার তিনি সেখানে গিয়েছেন, তিনি পুরনো সেই মানুষগুলোকে দেখতে পান।

কার্লি ক্লার্ক

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, আরোগ্য হয়ে ওঠার পর কার্লি ক্লার্ক

চিকিৎসা শেষ হওয়ার কয়েক বছর পরে যখন একবার পরামর্শ নেয়ার জন্য সেই হাসপাতালে কার্লি গেলেন, সেখানকার অপেক্ষা কক্ষে একজন নারীকে দেখতে পেলেন।

ইনি ছিলেন সেই নারী, যার সম্পর্কে তার স্বামী বলেছিলেন যে, তিনি ক্রিসমাস পর্যন্ত বাঁচবেন না।

''আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, যে ইনিই সেই নারী। সময়টা যেন সুন্দর হয়ে গেল।''

কার্লি তখন চারপাশের মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে রাখার একটা তাগিদ বোধ করলেন।

২০১৪ সালে তিনি কয়েকমাস ভারতে কাটান।

তার সেই ভ্রমণের ছবি ২০১৮ সালের আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র পুরস্কার পেয়েছে। সেই বছরই তার রিয়েলিটি ট্রমার 'লাস্ট ডে অফ কেমোথেরাপি' ছবিটি পোর্ট্রেট অব ব্রিটেন অ্যাওয়ার্ডের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়।

যারা সফলভাবে চিকিৎসা শেষ করতে পেরেছেন

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, যারা সফলভাবে চিকিৎসা শেষ করতে পেরেছেন

যখন তার ইমেইলের ইনবক্স নানা ধরণের পুরস্কার অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে ভরা আর তার ক্যালেন্ডারে নানা ছবি তোলার কর্মসূচীতে ভরপুর, তখন তিনি স্থানীয় হাসপাতাল সেন্ট উলফ্রেডে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের জীবনের শেষ সময়কার ছবি তোলার একটি প্রজেক্ট গ্রহণ করলেন।

তিনি চাইছিলেন, কীভাবে অন্তিম অসুস্থতা মানুষের মানসিকতার ওপর প্রভাব ফেলে এবং কীভাবে মানুষ তাদের শেষ সময়গুলো কাটায়, কীভাবে শেষ বিদায় জানায় বা শখ মেটায়, সেগুলোর তথ্যচিত্র তৈরি করতে।

কিন্তু গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসে তার ভাই, লি-এর একটি টেলিফোন পেয়ে তার সেই পরিকল্পনা থমকে যায়।

তিনি বোনকে জানালেন, তাদের ছোটভাই জো-র হজকিন লিম্ফোমা ক্যান্সার ধরা পড়েছে- যে ক্যান্সার ছয় বছর আগে কার্লির হয়েছিল।

''আমরা দুজনেই টেলিফোনের দুই প্রান্তে কাঁদতে শুরু করলাম,'' কার্লি বলছেন।

এই ছবির শিরোনাম 'লাস্ট ডে অব কেমোথেরাপি'

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, এই ছবির শিরোনাম 'লাস্ট ডে অব কেমোথেরাপি'

জোর বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর এবং কলেজে ভর্তি হয়েছে। কার্লির তুলনায় তার ক্যান্সার প্রাথমিক দিকে ছিল কিন্তু কার্লির মতো সেও রোগ সনাক্ত হওয়ার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল।

''সে তার পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিল না, আমরা কেউই ছিলাম না,'' কার্লি বলছেন।

যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল জো, মেয়েবন্ধুর সঙ্গে সময় কাটিয়ে, গাড়ি চালনা শিখে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে।

কিন্তু যত বেশি সে হাসপাতালে যাতায়াত করতে শুরু করলো, তার পড়াশোনার ফলাফলে প্রভাব পড়তে শুরু করলো এবং বন্ধু সংখ্যাও কমে গেল।

ভাইয়ের সঙ্গে আরো বেশি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে এ বছরের শুরুর দিকে কার্লি জানতে চাইলেন, সে তার কিছু ছবি তুলতে পারে কিনা। জো রাজি হলেন।

ভারতে ছবি তোলার সময় কার্লি ক্লার্ক

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, ভারতে ছবি তোলার সময় কার্লি ক্লার্ক

জো-র বয়স যখন অনেক কম, তখন বাড়ি ছেড়েছিল তার চেয়ে ষোল বছরের বড় কার্লি। কিন্তু তার একমাত্র বোন হিসাবে সে সব সময়েই তার প্রতি দায়িত্ব বোধ করেছে। ছোট থাকার সময় কীভাবে ছবি আঁকতে হয়, সেটা সে শিখিয়েছে।

পরবর্তীতে কার্লি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য লন্ডন চলে যায়, তখন মাঝেমাঝে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো। প্রতিটি সাক্ষাতের সময় কার্লি দেখতে পেতো জো খানিকটা লম্বা হয়েছে, গলা খানিকটা ভারী হয়েছে।

কিন্তু এখন হাসপাতালের ওয়ার্ডে ক্যামেরার পেছনে তাকিয়ে কার্লি বুঝতে পারছে, তার ছবিতে জো-র বড় ধরণের পরিবর্তন ফুটে উঠছে।

তার সোনালী চুলগুলো পড়ে যেতে শুরু করেছে। কার্লি বুঝতে পারছিল, তার মতো মাথা একেবারে কামানোর আগে এভাবেই চুল পড়তে থাকবে।

পরবর্তী ধাপে কেমোথেরাপির জন্য যে স্টেরয়েড দেয়া হচ্ছিল জোকে, তা তাকে দেখতে বয়স্ক করে তুলছিল এবং তার ওপর নাটকীয় পরিবর্তন এনে দিচ্ছিল।

আরো বেশি পরামর্শ এবং সহায়তার জন্য কার্লির ওপর নির্ভর করতে শুরু করলো জো।

রোগ সনাক্ত হওয়ার আগে কার্লি এবং জোর ছবি

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, রোগ সনাক্ত হওয়ার আগে কার্লি এবং জোর ছবি

ছোট থাকার সময় কার্লিকে ক্যান্সারের ভেতর দিয়ে যেতে দেখেছে জো, সে জানতো এই রোগ তার বোনের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে। সেই সঙ্গে সে এটাও দেখেছে যে, তার বোন ক্যান্সারকে হারিয়ে দিয়েছে।

''যখন তার ভেতর দ্বিধা বা সন্দেহ তৈরি হয়, তখন তার ভেতর এটা আশাবাদ তৈরি করে, ইতিবাচকভাবে ভাবতে শেখায় যে, আমি এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলাম,'' কার্লি বলছেন।

কারণ জো-র ক্যান্সার বেশি গুরুতর পর্যায়ে যায়নি। সুতরাং কার্লি ধারণা করছিল, তার আরোগ্য লাভ তাড়াতাড়ি হবে এবং তার ছবির পর্বও কম হবে। এই পর্বটি হবে একজন তরুণের জীবন, যে ক্যান্সার থেকে সেরে উঠেছে।

কিন্তু জো-র প্রথম দফার কেমোথেরাপি সফল হয়নি।

''খবরটি সবাইকে হতভম্ব করে দেয়। আমাদের সম্পর্ক যেন বদলে যায়, এটা যেন অনেকটা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে,'' কার্লি বলছেন।

সিটি স্ক্যানের জন্য অপেক্ষা করছেন জো

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, সিটি স্ক্যানের জন্য অপেক্ষা করছেন জো

আবার ভেঙ্গে পড়ে জো। তাকে আরো চারমাসের কেমোথেরাপি আর কোষ প্রতিস্থাপনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তার যেসব চুল গজিয়েছিল, সেগুলো আবার পড়ে যায়।

জো জানায়, সে আর আলোকচিত্রের বিষয় হতে চায় না - যে সিদ্ধান্তের কারণ উপলব্ধি করতে পারে কার্লি এবং সম্মান করে।

তবে প্রায় একমাস পরে সে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

''তার যে বিষয়টি আমার ভালো লাগে তা হলো সে ইতিবাচকভাবে ভাবছে। সে জানতো, কি ঘটতে চলেছে এবং তার চোখ দূর থেকেই ঝলমল করতে শুরু করেছে,'' কার্লি বলছেন।

''এটা প্রমাণ করে যে, সে কতটা বদলে গেছে এবং একজন তরুণ ক্যান্সার রোগী হিসাবে সে নিজের অবস্থাকে মেনে নিয়েছে'।'

রঙিন চুল সহ জো

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, রঙিন চুল সহ জো

চিকিৎসকের পরামর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে কোষ প্রতিস্থাপন চিকিৎসা বন্ধ করে দেয় জো। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় হচ্ছিল তার-শ্বাসকষ্ট হওয়া, চামড়ার সমস্যা, ডায়রিয়া ইত্যাদি। দাতা কোষ যদি গ্রহীতা কোষকে আক্রমণ করে তাহলে তার জীবন কঠিন করে দিতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছুদিনের মধ্যে মে মাসে তার স্ক্যান রিপোর্ট পরিষ্কার এলো। এর মানে হলো তার উপশম পর্যায় শুরু হবে এবং সে পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যেতে পারবে, লি-র বিয়েতে অংশ নিতে পারবে।

পরবর্তী কয়েক মাস ধরে তার অবস্থা পর্যালোচনার জন্য নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা হলো চিকিৎসকের সঙ্গে, কিন্তু তার ওজন যতটা বেড়েছিল সেটা আমার কমে গেল এবং সবশেষে আবার চুল গজাতে শুরু করলো।

সিটি স্ক্যান করা হচ্ছে জো-র

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, সিটি স্ক্যান করা হচ্ছে জো-র

কার্লি বলছেন, তার ছবি দেখে পরিষ্কার বুঝতে পারা যায় যে, যখন সে এবং জো'র শরীর ও মন একটি অন্তহীন গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল, তখন তারা কী অবস্থার ভেতর দিয়ে গেছে।

''যেসব ছবি আমি তুলেছি, আমার এবং জোর, অনেক কষ্টের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়। তবে সেই সঙ্গে সেগুলো এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, এ ধরণের কঠোর সময়ের মধ্যে মানব শরীর কতটা সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারে'' বলছেন কার্লি।

''এসব ছবি হয়তো সেই সময়ের খানিকটা আভাস তুলে ধরতে পারে। কিন্তু আমার আশা হলো দর্শকরা শুধুমাত্র ভীতিকর দিকটাই দেখবে না, বরং ক্যান্সার থেকে বেঁচে ফেরার প্রতিশ্রুতি এবং এই রোগে ভোগা মানুষদের অসাধারণ আশাবাদের ব্যাপারটিও দেখতে পারবে।''

কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে জোকে

ছবির উৎস, Carly Clarke

ছবির ক্যাপশান, কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে জোকে