ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে জ্বলছে পশ্চিমবঙ্গ

হাওড়ায় বিক্ষোভকারীদের হাতে জ্বলে যাওয়া বাস।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হাওড়ায় বিক্ষোভকারীদের হাতে জ্বলে যাওয়া বাস।
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা

ভারতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নানা জায়গায় দ্বিতীয় দিনের মতো সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে।

হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, উত্তর চব্বিশ পরগণা এবং মালদাসহ বিভিন্ন জেলায় রেল আর সড়ক অবরোধ করেছেন বিক্ষোভকারীরা।

হাওড়ার সাঁকরাইলে এবং মুর্শিদাবাদের একাধিক রেল স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে।

হাওড়ায় অন্তত পনেরোটি সরকারি ও বেসরকারি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আবার, হাওড়া এবং মুর্শিদাবাদে বিক্ষোভকারীরা জাতীয় মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে পথ অবরোধ করে রাখেন।

মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় দমকলের একটি গাড়িতেও আগুন দেয়া হয়।

মালদায় একটি রেল স্টেশনের কর্মীদের সাথে বিক্ষোভকারীদের হাতাহাতি হয় বলে জানা যাচ্ছে।

রেল লাইনের ওপর বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেয়ার ফলে বেশ কয়েকটি জায়গার সঙ্গে রাজ্যের রাজধানী কলকাতার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

রেল স্টেশন ও চলন্ত ট্রেনে ইটপাটকেল ছোঁড়ার জেরে দূরপাল্লার অনেক ট্রেন বাতিল করা হয়। বাতিল হয় শহরতলীর রেল চলাচলও।

হাওড়ায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশী অ্যাকশন।

ছবির উৎস, STR

ছবির ক্যাপশান, হাওড়ায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশী অ্যাকশন।

পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এসব জায়গায় পুলিশের শক্তি জোরদার করা হয়।

একক নেতৃ্ত্বহীন 'স্বতঃস্ফূর্ত' প্রতিবাদ

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এসব বিক্ষোভের নেতৃত্বে কোন একটি সংগঠন ছিল না।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিক্ষোভ হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত।

এইসব সহিংসতার পটভূমিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর একটি ভিডিও বার্তা শনিবার সকাল থেকেই স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে প্রচারিত হয়েছে, যেখানে তিনি রাজ্যবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করবেন না, উত্তেজনা বা আতঙ্ক ছড়াবেন না এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে পা দেবেন না।

তিনি এটাও বলেছেন যে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা হলে কাউকে ছাড়া হবে না।

এর আগে তিনি গণতান্ত্রিক উপায়ে বিক্ষোভ করার পরামর্শ দিলেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুব্ধ জনগণ তা দৃশ্যত উপেক্ষা করেছে।

নাগরিকত্ব আইন: একই বিক্ষোভ, ভিন্ন কারণ

নাগরিকত্ব আইনের কপি জ্বালিয়ে দিচ্ছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, নাগরিকত্ব আইনের কপি জ্বালিয়ে দিচ্ছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

সম্পর্কিত খবর:

পশ্চিমবঙ্গে যে বিক্ষোভ হচ্ছে তার সঙ্গে আসামের বিক্ষোভ-প্রতিবাদের একটা মূল ফারাক রয়েছে।

অসমীয়া সংগঠনগুলো নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে কথিত অবৈধ বাংলাদেশীদের ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার অধিকারের গোটা বিষয়টারই বিরোধিতা করছেন।

তারা বলছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে বাংলাদেশ থেকে আসামে আসা কোন ধর্মের মানুষকেই নাগরিকত্ব দেয়া যাবে না। এটাই আসাম চুক্তিতে উল্লেখিত রয়েছে।

একই সঙ্গে এটাও বলা হচ্ছে যে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়াও ভারতের সংবিধানের পরিপন্থী।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে যে বিরোধিতা হচ্ছে, সেখানেও ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়া সংবিধানের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে রাজ্যের মুসলমানদের আতঙ্ক যে তাদের একটা অংশকে এই আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রহীন বানানো হচ্ছে।

এই একই উদ্বেগ রয়েছে আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যেও।

তারা বলছেন, এনআরসি থেকে যে ১৯ লক্ষ লোকের নাম বাদ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে থেকে অমুসলিমদের নতুন এই আইনের মাধ্যমে নাগরিক করে নেয়া হতে পারে, কিন্তু মুসলমানরা হয়তো বাদই থেকে যাবেন।

নাগরিকত্ব রাজনীতির যোগবিয়োগ

বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানরা।

ছবির উৎস, Pacific Press

ছবির ক্যাপশান, বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানরা।

ঘটনাচক্রে, পশ্চিমবঙ্গে এই আইনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে যেসব মুসলিম সংগঠন তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে রাজ্যের দলিত এবং উদ্বাস্তু সংগঠনগুলোর একাংশ।

আবার ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস, বামপন্থী দলগুলো এবং মানবাধিকার কর্মীরাও এই আইনটির বিরোধিতা করছেন।

অন্যদিকে, বিজেপির উদ্বাস্তু নেতাদের বক্তব্য, নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে যে শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে কথিত ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে চলে আসা অমুসলিম মানুষ - অর্থাৎ মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা -- নাগরিকত্বের অধিকার পাবেন তা নয়।

তারা ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের সময় যারা চলে এসেছিলেন সেই সব হিন্দু উদ্বাস্তু এবং তাদের সন্তানরা নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী হবেন বলে বিজেপি নেতারা দাবি করছেন।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: