কীভাবে ঘৃণার শিকার হন একজন কুষ্ঠরোগী: 'কল থেকে পানি নিতে দেয় না, এক পুকুরে গোসল করে না’

ছবির উৎস, MANAN VATSYAYANA
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে এখনো বছরে নতুন করে প্রায় চার হাজার মানুষ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয় বলে বলছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
এ রোগে আক্রান্ত হলে কেবল শারীরিক যন্ত্রণাই নয়, মানসিক ও সামাজিক নিগ্রহের শিকার হতে হয় বেশির ভাগ মানুষকে।
যদিও চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে কুষ্ঠ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য একটি রোগ।
বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগ নিয়ে কাজ করা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, বেশির ভাগ সময় একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসেন রোগীরা।
তার আগে চর্মরোগ এবং স্নায়ুর সমস্যা হিসেবে চিকিৎসা করাতে গিয়েও দেরী করেন অনেকে, ফলে আক্রান্তদের ভোগান্তি হয় অনেক বেশি।
'একটি পা কাটা গেছে আমার'
নীলফামারীতে আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার কুষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন এই নারী, যিনি জানিয়েছেন ছয় বছর আগে তার এই রোগ ধরা পড়ে।
সংগত কারণেই তার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি জানিয়েছেন, যখন চিকিৎসকের কাছে পৌঁছান ততদিনে তার পুরো পায়ে পচন ধরেছিল।
"আমার শুরুতে হাতে-পায়ে দাগ ছিল। আস্তে আস্তে হাত ও পায়ের আঙুল বাঁকা হয়ে যেতে থাকলো। বাড়ির লোকে কেউ বুঝতে পারেনি। পরে ওইসব জায়গায় ঘা হয়ে গেল, তখন ডাক্তারের কাছে গেলাম, ডাক্তার বললো অনেক দেরি হয়ে গেছে।"
এরপর হাসপাতালে ভর্তি হলে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
গত ছয় বছর যাবত তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। পুরোপুরি সুস্থ না হলেও আগের তুলনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে তার।
তিনি জানিয়েছেন, তার ছোট বোনেরও যখন কুষ্ঠ হয়, তখন তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কারণে দ্রুত শনাক্ত করতে পেরেছেন।
"যে কারণে ওর চিকিৎসা আমার চেয়ে ভালো হইছে, ও প্রায় সুস্থ হয়ে গেছে।"
'লোকে ঘেন্না করে, চাপকল থেকে পানি নিতে দেয় না'
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কুষ্ঠ একটি জীবাণুবাহিত সংক্রামক ব্যাধি।
আক্রান্ত হলে ত্বকে ক্ষত, স্নায়বিক ক্ষয় বা অনুভূতি শূন্যতা এবং দুর্বলতা বা শরীরে অসাড়তা বোধ হতে পারে।
এতে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হয়, প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা না নিলে ত্বকে পচন ধরে, কোন ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান কেটে ফেলতে হয়।

ছবির উৎস, AFP Contributor
কিন্তু শারীরিক ভোগান্তির সাথে সাথে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আক্রান্ত রোগীকে ব্যাপকভাবে মানসিক এবং সামাজিক নিগ্রহের শিকারও হতে হয়।
কুষ্টিয়ার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ আরেকজন নারী কুষ্ঠ রোগী বিবিসিকে বলছিলেন, সাত বছর বয়সে তার এই রোগ ধরা পড়ে।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই পরিবারের বাইরে চারপাশের মানুষের কাছ থেকে তিনি অবজ্ঞা আর অবহেলা পেয়ে এসেছেন।
"আমি এতদিন পর্যন্ত বিয়ে বসিনি এই কারণে। পরিবারের লোকেরা হয়ত ঘেন্না করেনা। কিন্তু আশেপাশের সব লোকে ঘেন্না করে, দেশ-গ্রামে চাপকল থেকে পানি নিতে দেয় না। সবাই যে পুকুরে গোসল করে সেখানে নামতে দেয় না আমাকে, বাড়ির বাইরে কেউ তাদের টয়লেটে যেতে দেয় না।"
বাংলাদেশ পরিস্থিতি
কুষ্ঠ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগগুলোর একটি হলেও, দেশে এখনো এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রায় নেই বললেই চলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে কুষ্ঠ আক্রান্ত রোগীর হার প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে একজনের নিচে নামিয়ে আনা।
সেই বিচারে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে।
কিন্তু সরকারের সাথে কাজ করে এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এখনো প্রতিবছর প্রায় চার হাজার মানুষ নতুন করে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়।
সংস্থাটি বলছে, ২০১৯ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সারাদেশে ৩২০৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
কুষ্ঠ নির্মূল কেন করা যাচ্ছে না?
বাংলাদেশে সরকার বিনামূলে কুষ্ঠ রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসার কাজ করে থাকে।
কিন্তু লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনালের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাসুমা পারভীন বলছেন, রোগী শনাক্ত করা এবং তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই চ্যালেঞ্জের কাজ।
আরো পড়তে পারেন:
"সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত করা। কারণ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের লোকবল খুবই কম। প্রতি উপজেলায় মাত্র একজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন, যিনি যক্ষ্মা এবং কুষ্ঠ - এই দুই রোগের জন্য কাজ করেন।
"ফলে গ্রামে গ্রামে গিয়ে রোগী খুঁজে বের করা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।"
তিনি আরো বলছেন, "দ্বিতীয় সমস্যা হলো, ধরুন একজনের রোগ শনাক্ত হলো, তার রেজিস্ট্রেশন হলো। এখন সেই রেজিস্ট্রেশনের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় পাঠানোর পর তার নামে ওষুধ পাঠানো হবে।
এতে যে সময় লাগে এর মধ্যে অনেক রোগী ঝরে যায়। আবার একই সঙ্গে ঢাকা থেকে দ্রুত পাঠাতে হলে কুরিয়ার করতে হয়, তত অর্থ বরাদ্দ সব সময় থাকে না।"
মিজ পারভীন বলছেন, এছাড়া বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগীদের জন্য এই মূহুর্তে মাত্র তিনটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল রয়েছে।
যে কারণে এ রোগ নির্মূলে এখন স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং রোগ শনাক্তে সরকারের অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
এই মূহুর্তে লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল ছাড়া আরো সাতটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কুষ্ঠ প্রতিরোধে কাজ করছে।
প্রতিকারের কী উপায়?
কুষ্ঠ আক্রান্ত হলে তা থেকে প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে জাতীয় কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ইন্সটিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের চিকিৎসক শ্যামলী সাহা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে কুষ্ঠ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য একটি রোগ।
"প্রথম ব্যাপার হচ্ছে দ্রুত যাতে রোগ শনাক্ত করা যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু না করলে কুষ্ঠ রোগ সংক্রামক হতে পারে, যে কারণে কেবল সচেতনতাই পারে একজন মানুষকে বাঁচাতে।"
"যেহেতু এই রোগের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়, সে কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বা ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের মধ্যে এর সংক্রমণ হতে পারে। আমরা দেখেছি বেশির ভাগ সময় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি। "
ডা সাহা জানিয়েছেন, এ রোগে আক্রান্ত হলে শারীরিক সক্ষমতা হারায় মানুষ, ফলে তখন তার জীবিকা নির্বাহ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া চিকিৎসার পাশাপাশি যে যত্ন নেয়া প্রয়োজন, অর্থাৎ রোগীর বিশ্রাম প্রয়োজন সেটি বেশির সময় পান না একজন কুষ্ঠরোগী।
এছাড়া একটু ভালো হলে অনেক রোগী ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন। কিন্তু পুরো মেয়াদে নিয়মিত ওষুধ খেলেই রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।
আরো পড়তে পারেন:








