ভারতে ট্রান্সজেন্ডার আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদঃ "নিজের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করার অধিকার আমার নিজের"

ভারতের পার্লামেন্টে পাশ হওয়া ট্রান্সজেন্ডার বিলটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের পার্লামেন্টে পাশ হওয়া ট্রান্সজেন্ডার বিলটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারতের পার্লামেন্টে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার রক্ষায় একটি বিল পাস হওয়ার পর ওই সম্প্রদায়ভুক্ত নারী-পুরুষদের অনেকেই এই নতুন আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন।

ভারতের ট্রান্সজেন্ডার সমাজের পক্ষ থেকে এদিন দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন এই বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, তারা বিক্ষোভও দেখিয়েছেন।

তারা বলছেন, এই আইনে যেভাবে তাদের জেলা প্রশাসকের সামনে হাজির হয়ে অস্ত্রোপচারের প্রমাণ দাখিল করে ট্রান্সজেন্ডার সার্টিফিকেট জোগাড় করার কথা বলা হয়েছে সেটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

অনেক বিরোধী দলীয় এমপি-ই এই বিলটিতে নানা সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন, কিন্তু তার একটিও গ্রহণ না-করে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিজেপি সরকার এই বিলটিকে রাজ্যসভায় পাস করিয়ে নেয়।

ভারতের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী থাওয়ারচাঁদ গেহলট, তার মন্ত্রণালয়ই বিলটি এনেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী থাওয়ারচাঁদ গেহলট, তার মন্ত্রণালয়ই বিলটি এনেছে

ভারতে ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশনস অ্যান্ড রাইটস) বিল ২০১৯ রাজ্যসভায় পাস হয়ে গেলেও এই আইন যাদের জন্য আনা, তারাই কিন্তু মনে করছেন এতে ভারতে তাদের জীবনযাপন আগেকার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠবে।

তিনদিন আগে রাজধানী দিল্লিতে যখন তৃতীয় লিঙ্গ ও ট্রান্সজেন্ডার-ভুক্ত মানুষজন 'প্রাইড' র‍্যালিতে সামিল হন, এই বিলের বিরুদ্ধে তখন থেকেই তারা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন, বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি তুলছিলেন।

একজন ট্রান্স আন্দোলনকারী বলছিলেন, "এই বিলটিতে তিনটি প্রধান সমস্যা আছে। প্রত্যেক মানুষের অধিকার থাকা উচিত নিজের লিঙ্গ কী হবে সেটা নিজেরই নির্ধারণ করার, সেই আত্মস্বীকৃতির অধিকার এখানে নেই।"

"দ্বিতীয়ত, ট্রান্স-দের যে পরিবারে জন্ম সেখানেই যদি তাদের থাকতে বাধ্য করা হয় তাহলে তাদের ওপর ভায়োলেন্সের সম্ভাবনা বাড়ে।"

দিল্লির রাজপথে 'প্রাইড' পদযাত্রা। ২৪ নভেম্বর, ২০১৯

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির রাজপথে 'প্রাইড' পদযাত্রা। ২৪ নভেম্বর, ২০১৯

"আর তৃতীয়ত, নারীদের ধর্ষণ করলে যেখানে কম করে সাত বছরের জেলের বিধান আছে সেখানে ট্রান্স-দের ধর্ষণ করলে কেন ছমাস থেকে দুবছরের সাজা হবে? এই শাস্তির ব্যাপারেও তো সমতা আনা দরকার।"

নতুন আইনে বলা হয়েছে, কারও ট্রান্সজেন্ডার পরিচিতির আইনি স্বীকৃতি পেতে হলে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হবে।

অন্যান্য খবরঃ

তারপর নারী থেকে পুরুষ অথবা পুরুষ থেকে তিনি নারী হয়েছেন, সেই অস্ত্রোপচারের প্রমাণ দেওয়ার ভিত্তিতে তিনি সার্টিফকেট পাবেন।

সমাজবাদী পার্টির এমপি জয়া ব্চ্চন পার্লামেন্টে এই ধারাটিতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেন, "সার্টিফিকেশনের এই পদ্ধতিটাই মানবতার জন্য অপমান।"

সমাজবাদী পার্টির এমপি জয়া বচ্চন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সমাজবাদী পার্টির এমপি জয়া বচ্চন

"চেহারা, আচার-ব্যবহারে যারা অন্য কোনও মানুষের চেয়ে কোনওভাবে আলাদা নয় তাদের কেন একটি কমিটি বা ডিএমের কাছে গিয়ে বলতে হবে যে আমি ট্রান্সজেন্ডার? এভাবে কোনও মানুষকে আমরা অপমান করতে পারি না।"

কিন্তু বিরোধীদের তোলা কোনও সংশোধনীই শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি - যার পরিণতিতে এদিন প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স ও জেন্ডার নন-কনফর্মিং সমাজের শত শত মানুষ।

দিল্লির সাসা যেমন বলছিলেন, "এই ট্রান্স রাইটস বিল প্রস্তুত করার আগে আমাদের সমাজের কারও সঙ্গে কোনও পরামর্শ করা হয়নি, কোনও মতামত চাওয়া হয়নি।"

"কেউ আমাদের কাছে জানতে চায়নি সমাজে মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য আমরা কী চাই।"

এ বছর প্রাইড র‍্যালি হয়েছে দক্ষিণ ভারতের ব্যাঙ্গালোরেও। ২৪ নভেম্বর, ২০১৯

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এ বছর প্রাইড র‍্যালি হয়েছে দক্ষিণ ভারতের ব্যাঙ্গালোরেও। ২৪ নভেম্বর, ২০১৯

ব্যাঙ্গালোরের রোসা ফেলিসিয়া আবার বলছিলেন, "একজন সরকারি কর্মচারী বলে দেবেন আমরা ট্রান্স কি ট্রান্স নই, এই ভাবনাটাই তো অত্যন্ত নিপীড়নমূলক।"

"এতে আমাদের সঙ্গে বৈষম্যই আরও বাড়বে, আর তাই দেশের এলজিবিটিকিউএ কমিউনিটি এই বিল পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে।"

তবে পার্লামেন্টেই বিজেপি এমপি রূপা গাঙ্গুলি আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই বিল ট্রান্সজেন্ডারদের অনেক সুবিধেও দিয়েছে।

তিনি বলেন, "ট্রান্সদের ক্ষেত্রে একটা যেমন শারীরিক দিক আছে, তেমনি আছে মনস্তাত্ত্বিক দিকও।"

পার্লামেন্টে বিলটিকে সমর্থন করেছেন বিজেপির এমপি রূপা গাঙ্গুলি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পার্লামেন্টে বিলটিকে সমর্থন করেছেন বিজেপির এমপি রূপা গাঙ্গুলি

"কেউ যৌনাঙ্গের গঠনে অসম্পূর্ণতার কারণে ট্রান্স, কারও আবার সব কিছু ঠিকঠাক হয়েও মানসিক কারণে তিনি মনে করেন বিপরীত লিঙ্গের - তিনিও ট্রান্স।"

"এই মানুষগুলোর স্কুলে পড়াশুনো, চাকরি পাওয়া, বাড়ি ভাড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে এখন আর কোনও বৈষম্য চলবে না - চাকরি পাওয়ার পর কেউ নিজেকে ট্রান্স ঘোষণা করলে সেই চাকরি খাওয়াও যাবে না।"

"পরিবারও তাদের ফেলতে পারবে না, আবার কোনও সমাজের কেউ এসে তাদের জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে, সেটাও হবে না", বিলটিকে সমর্থন করে বলেন তিনি।

নতুন আইনে এরকম বেশ কিছু অধিকারের কথা বলা হলেও ট্রান্সজেন্ডাররা নিজেরাই মনে করছেন বিলটির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে - কারণ তাদের মতে এই আইন তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।