আজহারউদ্দিনকে ঘিরে বেটিং কেলেঙ্কারি ভারতীয় ক্রিকেট যেভাবে সামলেছিল

মহম্মদ আজহারউদ্দিন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মহম্মদ আজহারউদ্দিন
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

জনৈক ক্রিকেট বুকির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অপরাধে বাংলাদেশের জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন সাকিব আল হাসানকে আইসিসি দুবছরের সাজা দেওয়ার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট নি:সন্দেহে এক গভীর সঙ্কটে পড়েছে।

ইতিহাস বলছে, প্রায় দুদশক আগে ভারতীয় ক্রিকেটও প্রায় একই রকম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০০ সালে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তখনকার ক্যাপ্টেন মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে আজীবন নির্বাসিত করে।

নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন টিমের আরও বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার।

খেলাটার ওপর ভারতীয় ক্রিকেট অনুরাগীদের আস্থাই যেন তখন টলে গিয়েছিল।

মুম্বাইতে বিসিসিআই বা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সদর দফতর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুম্বাইতে বিসিসিআই বা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সদর দফতর

সেই সঙ্কট ভারতীয় ক্রিকেট কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিল?

আর তা থেকে আজ বাংলাদেশেরও কি কিছু শিক্ষণীয় আছে?

এ সব প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই গিয়েছিলাম দিল্লি ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র ফিরোজ শাহ কোটলায় - যার নতুন নাম অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম।

সাকিব আল হাসান বিতর্কের পর বাংলাদেশ তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলল এই মাঠেই।

আর উনিশ বছর আগে এই দিল্লিতেই কিন্তু ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ফাঁস হয়েছিল।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের আগের প্রস্তুতি

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের আগের প্রস্তুতি

যাতে পরপর অভিযুক্ত হন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপ্টেন হ্যান্সি ক্রোনিয়ে, আর তার কিছুদিন পর ভারতের অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন।

সিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা কে মাধবন তখন ঘোষণা করেছিলেন, "আজহারউদ্দিনের বিরুদ্ধে ম্যাচ পাতানোয় যুক্ত থাকার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।"

কিন্তু সেই অভাবনীয় সঙ্কট থেকে ভারতীয় ক্রিকেট আজ অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পেরেছে, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও তিরাশির বিশ্বকাপজয়ী দলের অলরাউন্ডার মদনলাল।

তার কথায়, "বিসিসিআই কিন্তু তখন ব্যাপারটা ভালই সামলেছিল।"

"উপযুক্ত তদন্ত হয়েছিল, দোষীদের খুঁজে বের করার দরকার ছিল আর সেটা করাও হয়েছিল।"

ভারতের সাবেক অলরাউন্ডার ও জাতীয় নির্বাচক মদনলাল

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, ভারতের সাবেক অলরাউন্ডার ও জাতীয় নির্বাচক মদনলাল

"সব খেলোয়াড়কে সতর্ক করা হয়েছিল - আর তখন জাতীয় দলের নির্বাচক থাকার সুবাদে জানি এধরনের প্রলোভন কীভাবে ঠেকাতে হবে সেটাও তাদের শেখানো হয়েছিল।"

"ফলে খুচরো কিছু ঘটনা বাদ দিলে ভারতীয় ক্রিকেটে কিন্তু সেরকম বড় তোলপাড় আর আসেনি", বলছিলেন মদনলাল।

ক্রিকেট খেলাটার ওপর ভারতীয়দের ভরসা যে এখন অনেকটাই ফিরে এসেছে, তা মানেন তরুণ প্রজন্মের অনুরাগীরাও।

এমনই একজন ক্রিকেট ফ্যান ভূমিকার কথায়, "আমি এর পুরো কৃতিত্ব দেব সৌরভ গাঙ্গুলিকে।"

আজহারের পর ভারতীয় ক্রিকেট দলের নেতৃত্বে আসেন সৌরভ গাঙ্গুলি (ডানদিকে)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আজহারের পর ভারতীয় ক্রিকেট দলের নেতৃত্বে আসেন সৌরভ গাঙ্গুলি (ডানদিকে)

"ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, বড় মেট্রো শহরগুলোর বাইরেও ছোট ছোট শহর থেকে প্রতিভা তুলে এনে যেভাবে সততার সঙ্গে তিনি একটা তরুণ দলকে সাজিয়েছিলেন, তার একটা দারুণ প্রভাব পড়েছিল", বলছিলেন ভূমিকা।

আজহারের নির্বাসনের পর ভারতের ক্রিকেট অধিনায়কের দায়িত্ব পান সৌরভই।

পরবর্তী কয়েক বছরে তার নেতৃত্বে এবং সাচিন-দ্রাবিড়-কুম্বলে-লক্ষ্মণের মতো তারকা এবং যুবরাজ-হরভজন-জাহির খানের মতো প্রতিভারা মিলে ভারতীয় ক্রিকেটকে যে একটা নতুন চেহারা দিতে পেরেছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

ক্রীড়া সাংবাদিক শামিনা শেখও একমত, সময় লাগলেও ফলে খেলাটার ওপর ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরে এসেছিল।

ভূমিকা (বাঁয়ে) ও শামিনা শেখ

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, ভূমিকা (বাঁয়ে) ও শামিনা শেখ

"পুরো ক্রিকেটের ওপর থেকে ভরসা টলে গিয়েছিল তখন।"

"লোকে সে সময় এ প্রশ্নও তুলত, বোর্ডের অজান্তে কি আর এত কিছু হয়েছে?"

"তবে ধীরে ধীরে এটা তারা বুঝতে পারে, তিন-চারজন ক্রিকেটারের জন্য সবাইকে দোষারোপ করাটা ঠিক নয় - পুরো ক্রিকেট খেলাটাই দোষী ব্যাপারটা সেরকম নয়", বলছিলেন শামিনা।

যে বেটিং চক্রে ঢুকে পড়ে মহম্মদ আজহারউদ্দিন ক্রিকেট থেকে আজীবন নির্বাসিত হয়েছিলেন বস্তুত তার 'নার্ভসেন্টার' ছিল দিল্লি।

আজহারের ঘনিষ্ঠ বুকি মুকেশ গুপ্তা ছিলেন দিল্লিরই ব্যবসায়ী।

ক্রিকেটে ফিক্সিং নিয়ে সে সময়ে লেখা হয়েছিল বেস্টসেলার বই 'নট কোয়াইট ক্রিকেট'

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, ক্রিকেটে ফিক্সিং নিয়ে সে সময়ে লেখা হয়েছিল বেস্টসেলার বই 'নট কোয়াইট ক্রিকেট'

আর মনোজ প্রভাকর, অজয় জাডেজা বা অজয় শর্মার মতো টিমের অন্য যে ক্রিকেটাররা শাস্তির মুখে পড়েন তারাও ছিলেন দিল্লি ক্রিকেটেরই তারকা।

এই শহরে ক্রিকেটে ফিক্সিং নিয়ে যারা বহুদিন লেখালেখি করছেন, তারাও মনে করেন ভারতের মতোই বাংলাদেশকে এখন সমস্যাটা অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

এদেরই একজন ফিক্সিং নিয়ে 'নট কোয়াইট ক্রিকেট' নামে বেস্টসেলার বইয়ের লেখক প্রদীপ ম্যাগাজিন।

মি ম্যাগাজিন বিবিসিকে বলছিলেন, "যদি একটা ডিনায়াল মোডে থাকি - বলতে থাকি যে বেচারা সাকিব তেমন কোনও ভুল করেনি বা ওকে বড্ড বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাতে কিন্তু কোনও লাভ হবে না।"

দিল্লির ক্রিকেট লেখক প্রদীপ ম্যাগাজিন

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির ক্রিকেট লেখক প্রদীপ ম্যাগাজিন

"মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব টিটোয়েন্টি লিগ বিপিএল নিয়েও ইতিপূর্বে ফিক্সিংয়ের বহু অভিযোগ উঠেছে।"

"সুতরাং তাদেরকে এখনই একটা কঠোর অবস্থান নিতে হবে।"

"এটাও ভাবতে হবে যে সাকিবের মতো বড় তারকাও যদি বুকিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে তাহলে না-জানি নেপথ্যে আরও কত কী ঘটছে!" বলছিলেন প্রদীপ ম্যাগাজিন।

দুদশক আগে ভারতীয় ক্রিকেটকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গিয়ে যেভাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে হয়েছিল, ফলে অনেকটা একই ধরনের চ্যালেঞ্জ এখন বাংলাদেশের সামনেও।