পাকিস্তানের আজাদি মার্চ: ইমরান খান বিরোধী বিক্ষোভে নেই নারীরা

ছবির উৎস, AFP
মুখে দাড়ি, হাতে সাদা-কালো পতাকা আর হলুদ রঙের পোশাক পড়ে রাজধানী ইসলামাবাদে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। উদ্দেশ্য, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ।
ক্ষমতায় আসার ১৮ মাসের মাথাতেই বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
এই বিক্ষোভকারীদের বেশিরভাগই জামিয়াত উলেমা-ই ইসলাম ফজল-উর-রেহমান এর সদস্য। এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ইসলামী দলগুলোর একটি। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিতে আসা ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে সারা দেশ থেকে এসেছেন তারা।
কিন্তু যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো সেটি হচ্ছে এই বিক্ষোভে কোন নারী নেই।
তবে নারীদের না থাকাটা ভুল করে হয়নি: গত রোববার আজাদি মার্চ বা মুক্তির বিক্ষোভের জন্য যে লিফলেট ছড়ানো হয়েছিলো তাতে নারীদেরকে বিক্ষোভে না এসে বরং ঘরে থেকে রোজা রাখতে ও দোয়া করার কথা বলা হয়েছে।
আর এটা কাজও করেছে।
বিবিসির উর্দু প্রতিবেদকরা বলেছেন, শুক্রবার জেইউআই-এফ এর গাড়িবহরে কোন নারী ছিল না। এর আগে আরো ৫ দিন দলে পাকিস্তান জুড়ে চলেছে গাড়ি বহরের এই বিক্ষোভ।
আরো পড়ুন:
তারপর শুক্রবার অন্য বিরোধী দলগুলোর সাথে মিলে রাজধানীতে গণ বিক্ষোভের দিনেও আরেকটি নির্দেশ জারি হওয়ার কথা শোনা গেছে: আর তা হলো, এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে নারী সাংবাদিকদের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
অনেক নারী সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলেও তাদেরকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। অনেকে আবার অভিযোগ করেছেন যে, তারা এমন হয়রানির শিকার হয়েছেন যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় ছিল না।

ছবির উৎস, AFP
"এক জন লোক এসে বলতে থাকলো যে নারীদের আসার অনুমতি নেই, নারীরা এখানে আসতে পারবে না। চলে যাও! ধীরে হলেও মিনিট খানেকের মধ্যে কয়েক জন পুরুষ আমাদের ঘিরে ধরে এবং এমন স্লোগান দিতে থাকে। যার কারণে আমাদেরকে বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয়," এক টুইটে বলেছেন সাংবাদিক শিফা জে ইউসুফজাই।
এ বিষয়ে খুব দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেইউআই-এফ নেতা মওলানা ফজলুর রেহমান। তিনি বলেছেন, "নারীদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে আমাদের" এবং "পূর্ণ ড্রেস কোড বা পোশাক নীতি" মেনে নারী সাংবাদিকরা বিক্ষোভে আসতে পারে, বলেছে সংবাদ সংস্থা এপিপি নিউজ।
এরমধ্যে, খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে জেইউআই-এফ নেত্রী নাইমা কিশোয়ার খান নারীদের অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নারীদের নিষিদ্ধ করা হয়নি এবং নারীদের কম অংশগ্রহণের বিষয়ে সাফাই দেন।
"আপনি যদি সামরিক বাহিনীতে দেখেন, সামনের সারিতে পুরুষরা থাকেন এবং পেছনে থেকে চিকিৎসা সহায়তা দেন নারীরা," তিনি বিবিসি উর্দুকে বলেন। "আমাদের আন্দোলন যুদ্ধের মতোই, পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। যদি তা না হতো, তাহলে নারীদের পিছিয়ে রাখা হতো না।"
বিবিসির উর্দু প্রতিবেদকদের মতে, যেসব নারীরা অংশ নিয়েছিলন তারা অন্য বিরোধী দলগুলো থেকে এসেছিলেন। তবে তাদেরকেও তেমন সামনে আনা হয়নি।
বিবিসি বাংলার আরো খবর পড়ুন:
সোশাল মিডিয়ায়, এ বিষয়ে আওয়াজ ওঠা শুরু হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক বেনজীর শাহ এ বিষয়টিকে অনেকটা বন্ধই করে দিয়েছেন।
"আমি এটাকে ইতিবাচক ভাবেই দেখি," বিবিসি উর্দুকে তিনি বলেন।
"দুই পুরুষ আর তাদের অহংকারের লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার দরকার নেই এদেশের নারীদের। আর এজন্যই এই বিক্ষোভ হচ্ছে যা মূলত দুই পুরুষের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।"

ছবির উৎস, AFP
"লেবাননে যেমনটা হচ্ছে সেরকম কোন সামাজিক পরিবর্তনের জন্য এই বিক্ষোভ হচ্ছে না, সেখানে নারী ও পুরুষ সমানভাবে অংশগ্রহণ করছে। জেইউআই-এফ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারকে অপসারণের চেষ্টা করছে এবং এর জন্য যে কোন কিছুকে ব্যবহার করতে পারে তারা যেমন ধর্ম।"
"এদেশের নারীদের ইতিহাসের ভুল পক্ষে থাকার কোন দরকার নেই।"
বিক্ষোভ আসলে কী নিয়ে?
মিস্টার খানের জন্য এটি প্রথম কোন বড় চ্যালেঞ্জ। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী, মওলানা ফজলুর রেহমান এবং আরো কয়েকটি বিরোধীদল। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেধে দিয়েছে তারা।
মিস্টার খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার জয় নিরপেক্ষ ছিল না। ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি পর্যবেক্ষক দল নির্বাচনে কোন কারচুপির প্রমাণ পান নি। তবে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব দলের "সমান সুযোগ ছিল না" বলে অভিযোগ ওঠে।
অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বিক্ষোভকারীরা মিস্টার খানের উপর অসন্তুষ্ট। যাদেরকে মিস্টার খান সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাদের জন্য এই অবস্থা বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ছবির উৎস, AFP
"তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি বরং অন্য কারো নির্দেশে এসেছে....তারা জনগণের জন্য কাজ করবে না, বরং তারা শুধু তাদের নির্বাচকদেরকেই খুশি করবে," মিস্টার রেহমান তার সমর্থকদের বলেন।
যাই হোক, বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিক্ষোভের পেছনে মিস্টার রেহমানের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।
একজন চতুর রাজনৈতিক নেতা, গত বছর নিজের আসন হারানোর আগ পর্যন্ত যিনি বছরের পর বছর ধরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
সংবাদের শিরোনামেও তিনি কোন নতুন নাম নন- নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের ২০১২ সালে গুলিবিদ্ধ হওয়া নিয়ে সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করে এবং জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ধর্ম অবমাননার মামলায় অন্যায়ভাবে খ্রিষ্টান নারী আসিয়া বিবির বিচারে "গণআদালতের" আহ্বান জানিয়ে তিনি বেশ কয়েক বার আলোচনায় এসেছেন।

ছবির উৎস, AFP
এএফপি কে কলামিস্ট আরিফা নুর বলেন: "তাকে একটি গেম থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং তিনি মনে করেন যে তিনি তার ন্যায্য স্থানটি পাননি।"
নারীদের না থাকাটা কী বোঝায়?
খালি চোখে দেখলে এটা ভাল দেখায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে জেইউআই-এফ খুবই আলাদা এবং নির্দিষ্ট।
"আমি এটা বলবো না কারণ, ডান-পন্থী একটি দল থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে নারীদের, তার মানে হচ্ছে, সব কিছু মিলিয়ে আসলে নারীদেরকে পুরো রাজনীতি থেকেই বাদ দেয়া হয়েছে," মিস শাহ বিবিসিকে বলেন।
"জেইউআই কখনোই নারী বান্ধব কোন দল ছিল না। তারা অনার কিলিং বিরোধী বিলের বিরোধিতা করেছে এমনকি নারী সুরক্ষা আইন এবং সম্প্রতি বাল্য বিবাহ বিরোধী আইনেরও বিরোধিতা করেছে তারা।"
"আমাদের যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত তা হচ্ছে, অন্য তিনটি দল নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কী করছে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল। ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় নারী প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা খুবই কম। পাঞ্জাবের প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় মাত্র দুই জন নারী রয়েছেন।"








