ওয়ার্ল্ড ভিগান ডে: গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয়

প্যারিসে ভিগানদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, AFP/Getty

ছবির ক্যাপশান, প্যারিসে ভিগানদের বিক্ষোভ

ভিগান লাইফ স্টাইলের প্রধান লক্ষ্য হলো কোনো প্রাণীকে ক্ষতিগ্রস্ত না করা।

খাবারের প্লেটে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, মধু কিছুই থাকবেনা।

ভিগানিজমে বিশ্বাসীরা এটাকে নিয়ে গেছেন আরও দূরে যেমন চামড়া, উল বা মুক্তার মতো বিষয়গুলো থেকেও দুরে থাকতে হবে।

এটাকেই বলা হয় ভিগানিজম, প্রতিনিয়ত এতে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বিশ্বজুড়ে।

আমেরিকায় ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এই জীবনধারায় বিশ্বাসীদের সংখ্যা বেড়েছে ৬০০%, আর যুক্তরাজ্যে গত এক দশকে বেড়েছে ৪০০%।

আর এই আন্দোলন এখন এতোটাই বিস্তৃত যে ফাস্ট ফুড চেইন ম্যাকডোনাল্ডস পর্যন্ত অফার দিচ্ছে "ম্যাকভিগান বার্গার"-এর।

পহেলা নভেম্বর যারা 'ওয়ার্ল্ড ভিগান ডে' পালন করেন, এবং এর বাইরে যারা আছেন, তাদের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি তথ্য।

স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার আশায় অনেকে ভিগান হচ্ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার আশায় অনেকে ভিগান হচ্ছেন

১. স্বাস্থ্য সুবিধা কিংবা অসুবিধা

যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে যারা মাংস কেনার খরচ কমাতে চান তাদের মধ্যে ৫০% এটা করতে চান স্বাস্থ্য সম্পর্কিত চিন্তা থেকে।

সমীক্ষা বলছে, রেড মিট অর্থাৎ গরু ও ভেড়ার মাংস অথবা প্রক্রিয়াজাত করা মাংস ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা যাতে থাকবে আঁশ জাতীয় খাবার এবং অনেক ফল ও সবজি তা কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে।

কিন্তু ভিগানরা কি আসলেই বেশি স্বাস্থ্যবান? ভিগান ডায়েটের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা নিয়ে কিছু সন্দেহ আছে অনেকের মধ্যে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভিগান ও নিরামিষাশীদের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায় উদ্ভিদজাত খাবার যারা খায় তাদের কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় ও তারা বেশি দিন বাঁচবে এমন কথা নেই।

বরং নিরামিষ ভিত্তিক খাদ্য তালিকা যারা মেনে চলেন তাদের ভিটামিন-ডি, যা হাড়ের জন্য খুবই দরকারি, ভিটামিন-১২ ও আয়োডিনের সংকট হতে পারে।

প্রাণীজাত যে কোনো কিছুর বিরুদ্ধে ভিগানরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রাণীজাত যে কোনো কিছুর বিরুদ্ধে ভিগানরা

২. পরিবেশগত দায়িত্ব

ভিগানিজমের প্রসার দিন দিন বাড়লেও একই সাথে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মাংস বিক্রিও।

চীন ও ভারতের মতো জনবহুল দেশগুলোতেও মাংস খাওয়া প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে যেভাবে মাংস উৎপাদন হচ্ছে তা পরিবেশ সম্মত নয় বলে কথা উঠছে।

দু'হাজার তের সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানায়, পশু উৎপাদন ১৪.৫% গ্রিনহাউজ কার্বন নি:সরনের জন্য দায়ী।

মাংস উৎপাদনেও ব্যয় বেশি। যেমন, ৪৫০ গ্রাম লেটুস পাতার জন্য দরকার হয় ১০৪ লিটার পানি। আর একই পরিমাণ গরুর মাংসের জন্য লাগে ২৩,৭০০ লিটার পানি।

জাতিসংঘের হিসেবে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব জনসংখ্যা হবে প্রায় ১০০০ কোটি এবং তখন এখনকার চেয়ে ৭০% বেশি খাদ্য দরকার হবে।

ভিগানরা বলছেন, এটি খাদ্যের বিষয় নয় বরং যৌক্তিক জীবনযাত্রার বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিগান ক্যাম্পেইন জোরালো হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিগান ক্যাম্পেইন জোরালো হচ্ছে

৩. ভিগানিজম কি মূলধারা হয়ে উঠছে?

ভিগানুয়ারি একটা ব্রিটিশ চ্যারিটি সংস্থা যারা জানুয়ারি মাসে ভিগানিজমে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য মানুষকে সহায়তা করে। তারা বলছে, প্রতি বছরই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৯ সালে ১৯০ দেশের আড়াই লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছে।

যেহেতু প্রোটিনের বিকল্প উৎস আছে বাজারে সে কারণে ভিগানিজম বৈশ্বিক ইন্ডাস্ট্রিতে রূপ নিচ্ছে। ইকনোমিস্ট বলছে, ২০১৯ সালে ভিগানই হবে বড় ফুড ট্রেন্ড।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ এ ধরণের ফুড টিপস পেতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।

সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ইন্সটগ্রামে ভিগান বিষয়ে ৯২ মিলিয়ন পোস্ট এসেছে।

উদ্যোক্তারা এর মধ্যে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছেন।

বড় বড় কোম্পানি গুলোও তাই দৃষ্টি দিচ্ছে এখানে।

নেসলের মতো কোম্পানি বলছে, ভিগান পণ্য এখন আর অপ্রচলিত ধারার কিছু না।

এগিয়ে আসছে অন্য প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোও।

ভিগান বার্গার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভিগান বার্গার

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

৪. অতিরিক্ত ভিগানিজমের খারাপ দিক

প্রাণী ও পরিবেশের প্রতি ভালোবাসাই ভিগান আন্দোলনের মূল কথা।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র ভিগানিজম বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি করছে।

কোথাও কোথাও কৃষক ও কসাইরা উগ্র প্রাণী অধিকার কর্মীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

যখন আপনাকে খুনি বা ধর্ষক বলা হয় সেটি যথেষ্ট বাড়াবাড়িই মনে হয়, বলছিলেন একজন ব্রিটিশ কৃষক।

তবে যুক্তরাজ্যের ৪২ ও বিশ্বজুড়ে ১০০ সংগঠনকে নিয়ে গড়ে ওঠা সেভ মুভমেন্ট বলছে তারা অহিংস ক্যাম্পেইন নীতি গ্রহণ করবেন।

আবার কিছু ভিগানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠছে কারণ তারা কাঠবাদাম ও ব্রকলি খাচ্ছেন অথচ এ গুলোর ওপর মৌমাছি নির্ভর করে থাকে।

ম্যানিলায় প্রাণী অধিকার কর্মীদের কর্মসূচি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ম্যানিলায় প্রাণী অধিকার কর্মীদের কর্মসূচি

৫. ভিগানিজম নতুন কিছু নয়

সোজা কথায় বললে, ভিগান শব্দটি এসেছে চল্লিশ এর দশকে যখন ডোনাল্ড ওয়াটসন যুক্তরাজ্যে 'দি ভিগান সোসাইটি' প্রতিষ্ঠা করেন।

নিরামিষাশী এই ব্যক্তি ডেইরি খাতে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতায় খুবই বেদনাহত ছিলেন। তিনি অপ্রাণীজাত নিরামিষাশী ধারণাটি নিয়ে আসেন।

কিন্তু ধারণাটি আসলে প্রাচীন ভারতও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ছিলো প্রায় ২৫০০ হাজার বছর ধরে।

এর শুরুটা ধারণা করা হয় ভারত থেকেই হয়েছিলো।

এটা হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের সাথে সম্পর্কিত।

ইউরোপে প্রাচীন গ্রিসে সেই পিথাগোরাসের সময় থেকে এটি বিদ্যমান ছিলো।

আসলে ভেজেটারিয়ান মূলধারায় আসার আগে যারা মাংস খেতো না বলা হতো তারা পিথাগোরিয়ান ডায়েট অনুসরণ করছেন।