দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযান কি সফল হবে?

ঢাকার ক্যাসিনোতে র‍্যাবের অভিযান চলছে।
ছবির ক্যাপশান, ঢাকার ক্যাসিনোতে র‍্যাবের অভিযান চলছে।
    • Author, আবুল কালাম আজাদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নজিরবিহীন এক অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে।

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এই অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে এটি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে সেই প্রশ্নও উঠেছে।

রাজধানীর হাজারীবাগে আওয়ামী লীগ নেতা এবং মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে সোচ্চার।

বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পেছনে চাঁদাবাজি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন মি. আলম এবং তার সংগঠন।

পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে ধর্মঘট করে টানা কয়েকদিন মাংস বিক্রি পর্যন্তও বন্ধ রেখেছিলেন তারা।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
ছবির ক্যাপশান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

আরো পড়তে পারেন:

রবিউল আলমের দাবি: শুধু চাঁদাবাজি বন্ধ করলেই মাংসের দাম কেজিতে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কমবে এবং আরো কিছু পদক্ষেপ নিলে আবারো ৩শ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করা সম্ভব।

"শুধু ক্যাসিনো বন্ধ করলেই দেশে আইন প্রতিষ্ঠা হবে না। কারণ চাঁদা বা সন্ত্রাসের জন্মদাতা গরুর হাট। এদেরকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। অন্তত মাসে একবার তদন্ত করুক," বলেন তিনি।

সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রবিউল আলমের অভিযোগ দেশের পশুর হাটগুলো নিয়ন্ত্রণ হয় ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়।

তিনি মনে করেন দলের ভাবমূর্তি এবং দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে মাংসের দাম কমাতে পশুর হাটকে চাঁদাবাজমুক্ত করা দরকার।

পশুর হাট ছাড়াও নানা ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি ছাড়াও সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি, শেয়ার বাজার কারসাজি, অর্থ-পাচার, মাদক, ঋণ-খেলাপির মতো অনিয়মের অভিযোগ আছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।

বর্তমানে এসব প্রভাবশালী নেতাদের টার্গেট করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে অভিযান চালাচ্ছে - সচরাচর এমনটি দেখা যায় না।

সাধারণত সরকার পরিবর্তন হলেই এরকম অভিযান চোখে পড়ে।

বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ।
ছবির ক্যাপশান, বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও আচমকা এ অভিযান সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারেননি। সরকার প্রধান এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনায় চলছে এ অভিযান যাকে ক্ষমতাসীনরা 'শুদ্ধি অভিযান' বলেও আখ্যায়িত করছে।

কিন্তু সরকারের এ অভিযান কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছে বিরোধী দল বিএনপি।

দলটির নেতা মওদুদ আহমদ বিবিসিকে বলেন, সব আমলেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি থাকে তবে সেটি তার ভাষায় এতটা নিয়ন্ত্রণহীন কখনোই ছিল না।

মি. আহমদ বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন ও জবাবদিহিতামুক্ত সরকারের পক্ষে দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সফল হওয়া সম্ভব নয়।

"এটা কিসের শুদ্ধি অভিযান? এটা তো লোক-দেখানো। আজকে সুষ্ঠু গণতন্ত্র না থাকার কারণে, জবাবদিহিমূলক সরকার না থাকার কারণে এগুলোর বিচার হবে না। কারণ হলো যে সরকারের মদদপুষ্ট খুব প্রভাবশালীরা এর সঙ্গে জড়িত। আজকে ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি কি জেলে আছে? তাদেরকে কি গ্রেফতার করা হয়েছে?"

এখনও পর্যন্ত যেসব অভিযান চালানো হয়েছে তাতে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে অবৈধ জুয়া, মাদক এবং ক্যাসিনো খুঁজে পাওয়া যায়। ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে জড়িতদের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা, শত শত ভরি স্বর্ণ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হতেও দেখা যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুর রাজ্জাক।
ছবির ক্যাপশান, আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুর রাজ্জাক।

আরো পড়তে পারেন:

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের প্রশ্ন - ক্যাসিনোর যন্ত্রপাতি কিভাবে আসলো, আর যাদেরকে ধরা হচ্ছে তাদের পৃষ্ঠপোষক কারা?

ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, "যাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে আপাতদৃষ্টিতে এটি যথার্থ, কিন্তু এটা কিন্তু টিপ অব দ্য আইসবার্গ বা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এসব কিন্তু ছাত্র বা যুব সংগঠনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত তাদেরকেও ধরতে হবে। দেখতে হবে এরা কতটা জবাবদিহিতার আওতায় আসে।"

প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা চলছিল কিভাবে সেটি যেমন প্রশ্ন, তেমনি একজন ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে গণপূর্ত বিভাগের বেশিরভাগ কাজ কিভাবে পেল তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

অনেকেই মনে করেন, ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই এগুলো সম্ভব হয়েছে।

টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, "আমাদের রাষ্ট্র-কাঠামো দুর্নীতির কাছে ক্যাপচার হয়ে গেছে, দখল হয়ে গেছে।"

দুর্নীতি দমন কমিশন বলছে, ক্যাসিনো ব্যবসাসহ বর্তমান অভিযানে যাদের ধরা হচ্ছে এবং যাদের যোগসাজসের কথা শোনা যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে এখনো তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে কমিশন জানিয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান ইকবাল মাহমুদ।
ছবির ক্যাপশান, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান ইকবাল মাহমুদ।

এ অভিযান সফল হতে আরো গভীরে যেতে হবে বলে মনে করেন কমিশন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

দুর্নীতি দমনে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি বলেন, কমিশনের মূল কাজই হলো দুর্নীতি প্রতিরোধ। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় আরো সময় লাগবে বলেও তিনি বলছেন।

"যে দুর্নীতি সমাজের সর্বস্তরে ব্যাপকহারে ছড়ানো সেই জঞ্জাল কি এক কমিশনের পক্ষে সরানো সম্ভব? নো।"

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় চলমান অভিযানকে এযাবৎ কালের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সবচেয়ে কঠোর অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে বলা হচ্ছে চলমান অভিযানের পরিধি আরো বাড়বে এবং এবার কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "আমরা চাচ্ছি যে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাক। আমরা সত্যিকার অর্থে গুড গর্ভন্যান্স যেটা আমরা বলেছি আমাদের ঘোষণাপত্রে, আমরা এটা মিন করি, এটাই আমরা জাতির কাছে প্রমাণ করতে চাচ্ছি।"

"দলের সভানেত্রী ভেবেছেন, যারা অপকর্ম করছে সে যেই হোক, যারা বিপথগামী, তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।"

তবে এ অভিযান শেষ পর্যন্ত কতদূর যায় এবং পরিণতি কী দাঁড়ায় সেদিকেই দৃষ্টি সাধারণ মানুষ ও পর্যবেক্ষকদের।

মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলছেন, পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করে গরুর মাংসের দাম কমাতে পারলেই কেবল তিনি বলবেন এ অভিযান সফল।

আরো পড়তে পারেন: