ডেঙ্গু জ্বর: ব্যর্থতা থেকে কী শিক্ষা নিচ্ছে সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো?

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিত্র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিত্র

ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক করতে ও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটাতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঈদ উল আযহার আগে থেকেই বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করেছিলো ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

কিন্তু ততক্ষণে ঢাকার হাসপাতালগুলো সয়লাব হয়ে পড়েছিলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীতে, এমনকি জ্বরে আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া শুরু হয়েছিলো ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলা ও উপজেলাতেও।

পাশাপাশি বাজারে উর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে মশারি, কয়েল বা অডোমাসের মতো পরিচিত মশা প্রতিরোধী সামগ্রীর দাম। এমন পরিস্থিতিতে ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

জুলাইয়ের শুরু থেকেই পত্রপত্রিকার খবরে জায়গা করে নিয়েছিলো এডিস মশা আর ডেঙ্গু। কিন্তু সরকারি হিসেবেই সব রেকর্ড ভঙ্গ হয় ৭ই অগাস্ট যেদিন একদিনেই নতুন রোগীর সংখ্যা ছিলো প্রায় আড়াই হাজার। সব মিলিয়ে ২২ই অগাস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন জেবা মাহবুবা। তিনি বলছেন ঈদের আগের ওই সময়টাতে আতঙ্ক কীভাবে ঘিরে ধরেছিলো তাকে।

"নিউজগুলোতে দেখতাম প্রচুর মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, মানুষ মারাও যাচ্ছে। বাচ্চারা স্কুলে যেতো ভয় লাগতো যে কখন মশা কামড়ায়। আমাদের এখানে কনস্ট্রাকশন কাজ হচ্ছে অনেক, পানি জমে থাকে,'' তিনি বলেন।

''বাচ্চারা স্কুল থেকে এসে যদি বলতে কোথায় জ্বলছে,শুনেই ভয় লাগতো মশা কামড়ালো কিনা। বাসার সব গাছ মাটিতে রেখে দিলাম। দুটার পর সব নেট লাগিয়ে দেই। কিছুক্ষণ পর পর স্প্রে করি। কারণ কখন কোথায় এডিস মশা তাতো আমাদের জানা নেই"।

মূলত ঈদের আগে থেকেই ভয় আর আতঙ্কে হাসপাতালগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় শুরু হয়। আবার ঈদের ছুটির পর বেশি আক্রান্ত হবার খবর আসতে থাকে ঢাকার বাইরে থেকে। পেশায় শিক্ষক চট্টগ্রামের সেগুফতা পারভীন বলছেন ডেঙ্গু আতঙ্ক সবার মধ্যেই একটা বড় মানসিক চাপ তৈরি করেছে এবার।

"বাচ্চা পর্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলো। ছোট বাচ্চা পর্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে বলছিলো দরজা বন্ধ রাখো। ঘর এমন রাখো। তারাও খুব সতর্ক হয়ে পড়েছিলো। এটা আসলে মনের উপর একটা বড় চাপ তৈরি করেছে। ডেঙ্গু আগেও হতো, এটা নতুন ইস্যু ছিলোনা। কিন্তু এবার এতোটা ছড়ালো কিভাবে? বিষয় হলো এটা।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

জেবা মাহবুবা
ছবির ক্যাপশান, জেবা মাহবুবা

ডেঙ্গুকে ঘিরে জনমনে এই ভয় আর আতঙ্ক এতো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো যে সরকারের উদ্যোগে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা জায়গা ঠিক করা হয় এবং হাসপাতাল ক্লিনিকে সংকট দেখা দেয় টেস্ট কীটের।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তা চায় বাংলাদেশ। সারাদেশে সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত নির্দেশনা ও সামগ্রী পাঠানো হয়। এর মধ্যেই গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক অভিযান চালানো হচ্ছে ঢাকায়। এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানার ঘটনাও ঘটছে।

কিন্তু উনিশ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমের পর ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর সংখ্যা কমবেশি দেখা গেলেও এবার কার ব্যর্থতায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির এমন অবনতি হলো? মশা বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কবিরুল বাশার বলছেন বড় ধরণের ব্যবস্থাপনা সংকট আর মানুষের অসচেতনতাই এবারের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

"চারটি উপাদান- পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল কন্ট্রোল ও কমিউনিটি ইনভলবমেন্ট- এ চারটি একসাথে না করলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আসবেনা। এজন্য সারা বছর কার্যক্রম থাকতে হবে। শুধু সিজন আসলে কাজ করলে হবেনা। আমাদের যে পরিকল্পনা তাতে এ চারটি বিষয় একযোগে আসেনি। আবার জনগণেরও যে ব্যর্থতা নেই তাও কিন্তু না"।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান বলছেন গত বছরই ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত পাওয়া সত্ত্বেও যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া আর সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাই এবারের প্রাদুর্ভাবের কারণ।

"নিয়ন্ত্রণে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলেই এমন হয়েছে পরিস্থিতি। গত বছরই জ্বরের ধরণটা ও তীব্রতা ভিন্ন বলে ইঙ্গিত মিলছিলো। আবার যে ঔষধ আনা হয়েছিলো সেগুলোও কার্যকর ছিলোনা, সেটিও গত বছরেই জানা গিয়েছিলো। এগুলো নিয়ে আগেই পদক্ষেপ নিলে এমন হতোনা পরিস্থিতি"।

আবার এতোদিন ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রকোপ খুব একটা না থাকায় এবারেও শুরুতে ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ততটা সক্রিয় ছিলোনা। আবার সরকারি ভাবে চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো এবং জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের প্রস্তুত করা হয়েছিলো।

কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি শুরুতে। তবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পরেও কি তৎপর হয়েছে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদগুলো? সেটি জানতে কথা বলেছিলাম কুষ্টিয়ার শিরিন আখতারের সাথে।

"শুরুর দিকে আমাদের এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ে তৎপরতা দেখা যায়নি। গত ২০/২৫ দিন ধরে ইউনিয়ন কাউন্সিল ও স্থানীয়রা মিলে ঝোপ ঝাড় পরিষ্কার করছেন। মশার ঔষধও দেয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কাজ চলছে"।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার

ছবির উৎস, কবিরুল বাশারের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া

ছবির ক্যাপশান, কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার

ওদিকে বেশ কিছু জেলা শহরের মতো ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত হয়েছে চুয়াডাঙ্গাতেও। এ পর্যন্ত ৭২ জন আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গেছে সেখানে। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেনো তারা ডেঙ্গু মোকাবেলায় আগে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারেননি তারা।

"ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন হবে আমরা বুঝতে পারিনি। আবার পৌরসভার কর্মকর্তাদের ভিন্ন কর্মসূচির কারণে আমরা কিছুটা সমস্যায় ছিলাম। তবে ডেঙ্গুর বিস্তার দেখে আমি নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেছি। ড্রেনগুলো পরিষ্কার করছি। আমরা যেটা বুঝছি তা হলো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সারা বছর কাজ করতে হবে। তাই এখন যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলো সারা বছর অব্যাহত থাকবে। দুটি কমিটি করছি যারা এলাকাগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার তদারকি করবেন"।

তবে ডেঙ্গুকে ঘিরে যে প্রবল সমালোচনা হয়েছে ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনকে নিয়ে তারা কি ভাবছে। এবারের পরিস্থিতি থেকে তারা কি শিক্ষা নিচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন তারা বিশেষজ্ঞদের সাথে।

চূয়াডাঙ্গার মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী

ছবির উৎস, আরিফুল ইসলাম ডালিম

ছবির ক্যাপশান, চূয়াডাঙ্গার মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী

আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার যে অভিযোগ উঠছে সেটি মানছেন কি-না এবং মানলে সেখান থেকে কি শিক্ষা নিচ্ছেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলছেন অনেকদিন পর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হলো এবার, সে কারণেই নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে সময় লেগেছে তাদের। এখন সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য তাদের এবং এরপর তারা দৃষ্টি দেবেন ভবিষ্যতের দিকে।

"এটা তো অনেক দিন পর হলো। অনেক বছর এ ধরণের পরিস্থিতি হয়নি। এ অবস্থা যেনো আর ভবিষ্যতে হয় এবং যে সময়সীমা ঠিক করেছি নিয়ন্ত্রণের জন্য, যদিও গতিটা ধীর তবুও অল্প অল্প করে ডেঙ্গু কমতে শুরু করেছে। আমরা আশা করি যে সময়সীমা ঠিক করেছি তার মধ্যেই এটা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। এরপরই আমরা পাঁচবছর মেয়াদী একটি মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা নিবো । এখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা,যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থা ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞ- সবাইকে নিয়েই আমরা এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে চাই"।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার দুজনেই বলছেন এবারের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সমন্বিত একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে না পারলে এডিস মশা সামনে আরও ভোগান্তির যে কারণ হয়ে উঠবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আবার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হলে নগরবাসীকেও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন হতে হবে গৃহ ও আবাসভূমিকে মশা মুক্ত রাখার জন্য।