উদ্ভাবনী ক্ষমতায় ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন?

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

উদ্ভাবনী সক্ষমতায় ভারত কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো পেছনের কাতারেই পড়ে আছে।

এমনকি নেপাল এবং পাকিস্তান আগের তুলনায় খারাপ করলেও তাদের অবস্থান এখনো বাংলাদেশের উপরে।

বিশ্বের ১২৯ দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা নিয়ে পরিচালিত ২০১৯ সালের গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১১৬তম। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ একই অবস্থান ছিল।

ওয়ার্ল্ড ইন্টেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন, কর্নেল ইউনিভার্সিটি এবং ইনসেড যৌথভাবে ওই গবেষণাটি করেছে।

তবে বৈশ্বিক এই তালিকায় ভারত কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। গত বছরের তালিকায় ৫৭ নম্বরে থাকলেও, ২০১৯ সালের তালিকায় ভারতের অবস্থান হয়েছে ৫২তম।

বাংলাদেশের পরে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বুরকিনা ফাসো, মালাউয়ি, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া, জিম্বাবুয়ে, বেনিন, জাম্বিয়া, নাইজার, ইয়েমেন ইত্যাদি দেশ।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উদ্ভাবন সক্ষমতার পার্থক্য

২০১৯ সালের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম আর ব্যবসার পরিবেশ নিয় গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক সাব-ক্যাটেগরিতে পয়েন্ট পেয়েছে ৪৫.৫ পয়েন্ট। যে ভারত পেয়েছে ৫৯.৫ পয়েন্ট।

মানব সম্পদ এবং গবেষণায় বাংলাদেশের পয়েন্ট ৮.৮, অথচ ভারতের পয়েন্ট ৩৩.৫।

অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৪০.০ পয়েন্ট আর ভারতের অর্জন ৪৩.০ পয়েন্ট।

বাজার মানে ভারতের পয়েন্ট ৫৬.৩ আর বাংলাদেশের পয়েন্ট ৪১.১।

ব্যবসা মানে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২০.০ আর ভারতের পয়েন্ট ৩১.০।

জ্ঞান ও প্রযুক্তি দক্ষতায় ভারতের পয়েন্ট যেখানে ৩৩.৫, সেখানে বাংলাদেশের পয়েন্ট ১৬.১।

সৃষ্টিশীল দক্ষতায় বাংলাদেশের পয়েন্ট ১৫.০ অথচ ভারতের পয়েন্ট ২৩.৫।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কেন এতোটা পার্থক্য?

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''এর সবচেয়ে বড় কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশুনা করার সময় বাচ্চাদের প্রশ্ন করতে শেখানো হয় না। বরং তাদের মুখস্থ করার শিক্ষা দেয়া হয়। ফলে ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু না করার, জানতে না চাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তীতেও এই প্রবণতা থেকে যায়, তাই উদ্ভাবনী ক্ষমতা তৈরি হয় না।''

প্রতিবেশী ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছেন, ''সেখানে নানা নতুন প্রকল্পে, উদ্ভাবন ও গবেষণায় সরকারের বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও অর্থায়ন করে। কিন্তু এখানে কিন্তু তেমন উদ্যোগ দেয়া যায় না।

''এখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একাডেমির যোগাযোগ বা সম্পর্ক ভালো নয়। ফলে শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে শিক্ষা পায় না। তাই তারা যখন পেশা জীবনে প্রবেশ করছেন, তখন অনেককেই সবকিছু নতুন করে শিখে নিতে হচ্ছে। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও এ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার পেছনে কোন ব্যয় করতে যায় না।''

আরেকটা বিষয় হলো সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি, বলছেন মুনির হাসান।

''দেশে একটি ইনোভেশন নীতিমালা থাকা দরকার, যার আওতায় উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়া হবে, নতুন উদ্ভাবনী বিষয়গুলোকে রক্ষা করা হবে। কিন্তু সেটাই এখনো করা হয়নি।''

''একশো উদ্ভাবনের চেষ্টা করলে ৯৮টা চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু যে দুইটা সফল হবে, সেটাই সবকিছু ছাপিয়ে যাবে। কিন্তু সবাই চায় যেন, সবগুলো চেষ্টাই সফল হোক। সেটা তো আর সম্ভব না।'' বলছেন মুনির হাসান।

মুনির হাসান বলছেন, স্থানীয় উদ্ভাবনকে রক্ষা করাও দেশের দায়িত্ব। যেটা ভারত খুব ভালোভাবে করেছে। ফলে সেখানে উদ্ভাবকরা আরো নতুন নতুন আবিষ্কারে আগ্রহী হয়েছেন।

গবেষকদের মতে কৃষিখাতে বেশ কিছু ভালো গবেষণা হয়েছে, যার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য খাতে নীতির অভাবে সেইরকম কাজ হয়নি।

''সবাই শুধু চায় কোন একটা গবেষণা করে পেপার পাবলিশ করতে। কিন্তু হয়তো বাংলাদেশে সেটার প্রায়োগিক গুরুত্ব খুব একটা নেই। ফলে গবেষণা যেগুলো হয়, সেগুলো অনেক সময় মানুষের কাজে আসে না।''

পরিস্থিতি পাল্টাতে কী করা যেতে পারে?

মুনির হাসান বলছেন, সবার আগে শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার, যাতে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা মুখস্থ বিদ্যার বাইরে নিজে থেকে চিন্তা করতে শেখে।

দেশে একটি উদ্ভাবনী নীতিমালা থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

''সবরকম উদ্ভাবন ও গবেষণায় উৎসাহ দিতে হবে। কোন নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সেটা রক্ষার চেষ্টা করতে হবে।''

এজন্য একটি একাডেমি স্থাপন করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। কারণ বিশ্বের অনেক দেশেই এরকম একাডেমি রয়েছে। ইউনেস্কো ২০০০ সাল থেকেই এরকম একাডেমি স্থাপনে তাগিদ দিয়ে আসছে।

''বিভিন্ন উদ্ভাবনী ও গবেষণার প্রস্তাবগুলো তারা যাচাই বাছাই করে দেখবে, প্রয়োজনে অর্থায়ন করবে। আবার নতুন আবিষ্কারের সার্থক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।''

গণিত অলিম্পিয়াডের সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান বলছেন, ''ভারত বড় দেশ বলে তার হয়তো কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। কিন্তু আমরা তো উদ্ভাবনের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকেও পিছিয়ে আছি। সেটা কাটাতে হলে গবেষণা, উদ্ভাবনের বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের একেবারে নতুন করে ভাবতে হবে যে কোথায় সমস্যা আর সেগুলো কিভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।''