বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণে কনডম ও পিলের বিকল্প কী? দৃষ্টিভঙ্গি কি পাল্টেছে?

বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে জন্মদানে সক্ষম দম্পতিদের মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন আর ২০১৯ সালে সে হার দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ১ শতাংশে।

তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শহর অঞ্চলের মতো গ্রামাঞ্চলেও নারীরাই বেশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতায় আছেন।

প্রজনন মাপকাঠিগুলো বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দুই শতাংশের একটু বেশি।

প্রাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দেশটিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো খাবার বড়ি, ইনজেকশন ও কনডম।

বিশেষ করে খাবার বড়ি ও কনডম সম্পর্কে দেশে কমবেশি সব নারী পুরুষের কিছুটা হলেও ধারণা আছে বলে মনে করছেন পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান ড: মো: আমিনুল হক বলছেন মূলত সহজলভ্যতার কারণেই খাবার বড়ি ও কনডম এতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

"দুটিই সহজলভ্য এবং দুটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখন নেই বললেই চলে। আগে খাবার বড়ি নিয়ে টুকটাক যেসব সমস্যা হতো এখন যথেষ্ট ভালো মানের পিল বাজারে থাকায় নারীরা স্বচ্ছন্দে তা ব্যবহার করতে পারছেন।''

তিনি বলেন স্থায়ী পদ্ধতিগুলো নারী পুরুষ কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষার অবস্থা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

কনডম ও খাবার বড়ির বিকল্প আর কী আছে?

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর স্থায়ী ও অস্থায়ী সাতটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছে তাদের বুকলেটে।

এগুলো হলো- খাবার বড়ি, কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট, আইউডি, ভ্যাসেকটমি ও টিউবেকটমি।

এর মধ্যে ভ্যাসেকটমি বা এনএসভি পুরুষদের স্থায়ী পদ্ধতি ও টিউবেকটমি বা লাইগেশন মেয়েদের স্থায়ী পদ্ধতি।

আর অস্থায়ী পদ্ধতির মধ্যে ইমপ্ল্যান্ট ও আইউডি দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি।

তবে অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী খাবার বড়ির মতো না হলেও অনেক নারী ইনজেকশনও গ্রহণ করছেন। এই ইনজেকশনটি প্রতি তিন মাস পরপর নিতে হয়।

আমিনুল হক বলছেন পুরুষদের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী তেমন একটা বিকল্প নেই। তাদের জন্য চালু রয়েছে হয় কনডম ব্যবহার না হয় স্থায়ী পদ্ধতিতে যাওয়া।

"আমাদের সামাজিক নানা কারণে, আগ্রহ থাকলেও অনেকে স্থায়ী পদ্ধতিতে যেতে চান না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীরাও অনেকে চান না তার স্বামী স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করুক"।

মাদারীপুরের মুস্তফাপুর ইউনিয়নে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী শাহনাজ পারভীন বলছেন শিক্ষিত দম্পতিদের অনেকে নিজেরাই চিকিৎসকের সাথে কথা বলে পরিকল্পনা করে থাকেন।

"তারা নিজেরাই হিসেব করে জীবন যাপন করেন। আমি এমন দম্পতিও পেয়েছি যারা ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে জীবন যাপন করছেন দেরিতে সন্তান নিবেন বলে।"

মাঠ পর্যায়ে চিত্র কী? দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে কতটা ?

১৯৮৯ সালে মাদারীপুরের মুস্তফাপুর ইউনিয়নে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন শাহনাজ পারভীন।

সাতাশ বছর ধরে পরিবার পরিকল্পনায় সক্ষম দম্পতিদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করছেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন আগে খু্ব কঠিন ছিলো মানুষকে বোঝানো। তখন মানুষ বুঝতো না যেমন, তেমনি বুঝলেও সহজভাবে গ্রহণ করতে চাইতো না। জড়তাও ছিলো প্রচণ্ড।

"তখন একটা পরিবারে গিয়ে আগে মুরুব্বীদের বোঝাতাম। শাশুড়ি বা মাকে বুঝিয়ে মেয়ে বা পুত্রবধূর সাথে আলাপ করতাম। তাদের বলতাম ২০ বছরের আগে মা হলে কী কী সমস্যা হতে পারে। সেইসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকার জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের প্রস্তাব দিতাম।"

শাহনাজ পারভীন বলছেন এখন আর সেই সমস্যা নেই মোটেই, যদিও তার মতে পুরুষদের মধ্যে এখনো কিছু সংকোচ দেখতে পান তিনি। তবে আগে স্ত্রীকে স্বামীরা যেভাবে বাধা দিতো সেটি আর একদমই নেই।

"এখনো অনেক পুরুষ স্বেচ্ছায় কোনো পদ্ধতি নিতে চায় না। এসব পদ্ধতি তাকে দুর্বল করে দেবে এমন ভয়ও পান গ্রামের অনেক পুরুষ। পদ্ধতি নেয়া দরকার এটি আবার বোঝেনও তারা। কিন্তু সেটি তারা স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিতে চান। সে কারণেই বড়ি খাওয়া এতো বেশি জনপ্রিয়।"

তিনি বলেন, "কর্মজীবন শুরুর পর বহু বছর সংগ্রাম করেছি মানুষকে বোঝাতে। আর এখন নতুন বউ বাড়িতে এলে অনেকে ডেকে নিয়ে পরামর্শ করে। আবার অনেকে এক বাচ্চা হওয়ার পর আসে, দেরি করে পরের বাচ্চা নেয়ার জন্য কী করবে সেই পরামর্শের জন্য।"

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ঝালকাঠি জেলার উপপরিচালক ফেরদৌসি বেগমও বলছেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এখন আর নেই।

"পর্যাপ্ত লোকবল না থাকা ও কমিউনিটি ক্লিনিকের অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব দেয়ায় আগের মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবাটা কমে এসেছে। কিন্তু তারপরেও খুব একটা সংকট নেই। কারণ দম্পতিরা নিজেরাই এখন এগিয়ে আসে, পরামর্শ নেয় পরিবার কল্যাণ কর্মী, স্যাটেলাইট ক্লিনিক কিংবা কমিউনিটি ক্লিনিকে।"

তবে এখনো পুরুষদের এগিয়ে আসার হার কম এবং শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব।