ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯: মাঠের কোন ক্যামেরা কী কাজ করে?

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রতিটি ম্যাচ যখন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, তখন বিশ্বজুড়ে তা দেখেন কোটি কোটি দর্শক। কিন্তু কীভাবে এই কাজটি করা হয়?
আইসিসির যে দলটি এই খেলাগুলো টেলিভিশন সম্প্রচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের একজন বাংলাদেশের সৌমেন গুহ।
তিনি এবারের বিশ্বকাপের বহু ম্যাচে 'ক্যামেরা ক্রু'র একজন সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।
তার সাথে কথা হয়েছে বিবিসি বাংলার, তিনি জানিয়েছেন এই কাজের বিস্তারিত।
মিস্টার গুহ বলেন, "টেলিভিশন প্রোডাকশনে ক্রিকেট প্রোডাকশন একটা বিশাল জগত। একে একটু আলাদা করে দেখতে হয়।"
"কারণ এখানে যা হয় তা সরাসরি হয়। এখানে ফিল্মে, টেলিভিশন নাটকের মতো স্ক্রিপ্ট লিখে ভাগ ভাগ করে শুটিং, ডাবিং, মিক্সিং বা মিউজিক অ্যাড করার কোন সুযোগ নেই।"
তিনি জানান, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ কিভাবে সম্প্রচারিত হবে তার পরিকল্পনা, কেমন প্রযুক্তি এবং কি কি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে তার পরিকল্পনা গত বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই শুরু হয়েছিলো।
ওই বিশ্বকাপের পর আইসিসি পর্যালোচনা করে যে সেই আসরে কি কি কমতি ছিল এবং আগামী বিশ্বকাপ প্রডাকশনে কি কি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় বা আরও ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে গিয়ে নতুন কিছু করা যায় কিনা - তা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়।
আরো পড়তে পারেন:
বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ সম্প্রচারের জন্য কত জন লোক মিলে কাজ করেন এমন প্রশ্নের উত্তরে মিস্টার গুহ বলেন, "সাধারণত একটা ক্রিকেট প্রোডাকশনের জন্য ন্যূনতম ৭০-৮০ জন লোক লাগে।"
"আর বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে একটি ম্যাচ কাভার করতে ১২০-৩০ এমনকি ১৫০-৬০ জন পর্যন্ত লোক কাজ করেন। এবার প্রতিটি গ্রুপে ১৫০-১৬০ জন লোক কাজ করছেন।"
মাঠের কোথায়, কোন ক্যামেরা থাকে?
এ সম্পর্কে মি. গুহ বলেন, "প্রথমত উইকেটের জন্য একটা ক্যামেরা থাকে। এটা দুই সাইডেই থাকে। বল ফলোর জন্য দুই সাইডে থাকে।"
"গ্রাউন্ডে স্লিপ ক্যামেরা থাকে দুটো। মিড উইকেটে একটা ক্যামেরা থাকে। তার বিপরীতে একটা রিভার্স মিড উইকেট থাকে।"
তিনি বলেন, "স্লিপের বিপরীতে রিভার্স স্লিপ থাকে। হাই ৪৫ অ্যাঙ্গেলে ক্যামেরা থাকে। আবার লো ৪৫ অ্যাঙ্গেলেও ক্যামেরা থাকে।"
এছাড়া থাকে স্পেশাল ক্যামেরা।
একজন বোলারের হাত থেকে কিভাবে বলটি ঘুরে ঘুরে ব্যাটসমানের ব্যাট পর্যন্ত যায়, তার প্রত্যেকটি মুভ আলাদা করে দেখানোর জন্য এক ধরণের হাইস্পিডের ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। যেটাকে স্পিন ভিশন ক্যামেরা বলা হয়।
এই ক্যামেরা অনেক সময় অন্যান্য পজিশনেও ব্যবহার করা হয়।
এগুলোর জন্যই থার্ড অ্যাম্পায়ার ডিসিশন বা ডিআরএস এর সিদ্ধান্ত দেয়া সহজ হয়।
ক্রিকেট খেলায় যেসব নতুন নিয়ম-কানুন চালু হয়েছে তার জন্য ক্যামেরার কাজটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ অনেক কিছুর রিপ্লাই দেখার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
প্রযুক্তির সাথে সাথে কাজটা কিভাবে বদলেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে মিস্টার গুহ বলেন, "কাজটা বদলায়নি বরং উন্নত হয়েছে। ক্যামেরার ফাংশন উন্নত হয়েছে। এখনকার বেশিরভাগ ক্যামেরা সফটওয়ার দিয়ে চলে।"

প্রোডাকশন টিম
বাংলাদেশের এই ক্যামেরাম্যান খেলা সম্প্রচারের জন্য একটি প্রোডাকশন টিমের গঠন সম্পর্কেও বিস্তারিত জানান।
তিনি বলেন, "একটি প্রোডাকশন টিমে প্রথম থাকেন একজন ডিরেক্টর। তারপর একজন প্রডিউসার, যার দায়িত্বে সব ক্যামেরা পারসন।"
"আমরা যে রিপ্লে দেখি তার আলাদা ডিপার্টমেন্ট। এগুলোর মেশিনও আলাদা। এই ডিপার্টমেন্টে সব ফুটেজ সারাদিন রেকর্ড হতে থাকে।"
তিনি জানান, "এখানকার কর্মীরা এতো বেশি চৌকস যে তাদের কাছে প্রতিটি বলের হিসেব থাকে। তারা কাগজে কলমে লিখে রাখেন। যার কারণে রিপ্লে দেখতে তেমন দেরি হয় না," তিনি বলেন।
এরপর আছে গ্রাফিক্স ডিপার্টমেন্ট। আর থ্রি ডি-ডাইমেনশনের উপস্থাপনের জন্য কাজ করে হকাই ডিপার্টমেন্ট।
ডিআরএসের সাহায্য ছাড়াও ব্যাটসম্যানের কোন বল কোনদিকে গেলো এবং একটা মাঠের ডাইমেনশন কি - সেটাও দেখানো হয় এই ডিপার্টমেন্টের সহায়তায়।
মাঠের মধ্যে কোন তার বা মাইক্রোফোন না থাকলে শব্দ পাওয়া যায়। তার কারণ হচ্ছে মাঠে 'আন্ডার গ্রাউন্ড কেবলিং' করা থাকে।
স্ট্যাম্পের পেছনে একটা গর্ত থাকে যার মধ্যে অডিও ডিভাইস থাকে।
যার কারণে উইকেট কিপারের কথা শোনা যায়।
এছাড়াও সারা মাঠে অনেকগুলো মাইক্রোফোন কেবলিং করা থাকে।
রান-আউটের জন্য হকাই ডিপার্টমেন্টের আরও চারটে ক্যামেরা থাকে। এলবিডাব্লিউয়ের জন্য দুটি ক্যামেরা থাকে।
যেভাবে যুক্ত হলেন বিশ্বকাপের লাইভ কভারেজে
ক্রিকেটের ক্যামেরা পারসনদের জন্য টেকনিক্যাল দক্ষতা ছাড়াও ক্রিকেট সম্পর্কে ভালো ধারণা এবং খেলোয়াড়দের চেনাটা জরুরী।
ফটোগ্রাফি থেকে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন মিস্টার গুহ।
তারপর কাজ করেছেন বাংলাদেশের দুটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে।
তবে স্পোর্টসে কাজ করার আগ্রহ থেকে লাইভ ক্যামেরায় ক্যামেরাম্যানদের কাজ দেখতে গিয়ে পরিচয় হয় বিদেশি ক্যামেরা পারসনদের সাথে।
পরে তাদের কাছ থেকেই কাজ করার প্রস্তাব পান।
এ পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপের খেলায় কাজ করেছেন মিস্টার গুহ।
এছাড়া দুটো টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ এবং বাংলাদেশে অনেক ইন্টারন্যাশনাল সিরিজ কাভার করেছেন তিনি।
নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের ররি পেকট্রাস পুরষ্কার পান।








