অ্যালার্জির কারণে আজ আমি হয়েছি বিউটি ফার্মের মালিক

বিবিসির সাপ্তাহিক দ্য বস সিরিজ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ব্যবসায়িক নেতাদের প্রোফাইল তৈরি করছে। এই সপ্তাহে কথা হয়েছে সাবরিনা ট্যানের সাথে। যিনি বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী ব্র্যান্ড স্কিন ইঙ্ক ডটের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী।

টেকনিক্যাল ক্যারিয়ার ছেড়ে স্কিন কেয়ার শিল্পে আসতে সাবরিনা ট্যানকে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি হল নারী হিসেবে কাজ করা।

কর্মস্থলে একজন নারী হিসেবে তার এই শক্তিশালী অবস্থান সাবরিনার নিজের কাছেই নতুন ছিল।

কেননা তিনি সিঙ্গাপুরে তিন ভাইয়ের সাথে বড় হয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে আইবিএম, ওরাকল এবং হিউলেট-প্যাকার্ডের মতো পুরুষ-কর্তৃত্ব সংস্থাগুলিতে কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, "আমি একটি দলের আরও কয়েকজন নারী সদস্য হিসেবেই কাজ করতাম।"

অনেক সময় সাবরিনার আশেপাশে এমন অনেক নারী কাজ করতেন, যারা নিজেদের চিন্তা ধারণা শেয়ার করতে ইতঃস্তত বোধ করতেন।

তিনি লক্ষ্য করতেন যে অনেক নারী নিজেকে প্রস্তুত বলে ভাবতে পারতেন না।

অথচ তাদের এমন অনেকেই ছিলেন যাদের অনেকেই ওই চাকরির তুলনায় ওভার কোয়ালিফাইড বা বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন।

বিউটি শিল্পে কেন?

"বিউটি শিল্পের দিকে সরে আসাটা আমার জীবনে জন্য বড় ধরণের পরিবর্তন ছিল।" বলেছেন সাবরিনা।

মাত্র এক দশক আগে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, স্কিন ইঙ্ক চালু করার মাধ্যমে।

আরও পড়তে পারেন:

স্কিন ইঙ্ক হল একটি সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ব্র্যান্ড। বর্তমানে তারা তাদের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ জুড়ে বিক্রি করে থাকে।

প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটি এক কোটি ডলার রাজস্ব দিয়ে থাকে। সেখান থেকেই ধারণা করা যায় যে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ কতোটা বিশাল।

৪৫ বছর বয়সী এই নারী তার এই সফলতার পেছনে তার "কারিগরি মানসিকতা"-কে প্রধান কারণ হিসেবে মনে করেন।

এছাড়া আদর্শ ব্যক্তিবর্গের থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়ে থাকেন তিনি। অ্যাপেলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্টিভ জবসকে দেখে তিনিও নিজের একটি স্বতন্ত্র বিউটি কোম্পানি চালু করার স্বপ্ন দেখেন।

"আমি স্কিন কেয়ারে অ্যাপল এর মতো ব্র্যান্ড তৈরি করতে চেয়েছিলাম।" বলেন, সাবরিনা।

অ্যালার্জি থেকে উদ্যোক্তা

সিঙ্গাপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, "ব্যবসা ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করার পর, সাবরিনা তার প্রথম চাকরিটি একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে নেন। সেখানে তিনি ব্যবসায়ের উন্নয়ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করতেন।

বছরের পর বছর সেখানে কাজ করার সময় তাকে ঘন ঘন বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে হতো। এই অতিরিক্ত ভ্রমণের চাপে তার ত্বকে একজিমা সংক্রমণ দেখা দেয়।

একজিমা এক ধরণের চামড়ার অ্যালার্জি। এবং সাবরিনার ত্বক এই অ্যালার্জি সংবেদনশীল ছিল।

ডাই বা রঙের মত পদার্থ সেই-সঙ্গে আবহাওয়া পরিবর্তন সাবরিনার ত্বকে প্রভাব ফেলত।

সব মিলিয়ে তিনি বেশ হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং সমাধান চাইছিলেন।

যখন তার দুই শিশুও একজিমায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তখন তিনি বাধ্য হয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

"আমার মনে ব্যাস, যথেষ্ট হয়েছে। এখন আমাদের স্কিনকেয়ার রুটিনকে আরও উন্নত করা প্রয়োজন। পুরো বিষয়টি আমার নিজের হাতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।"

এরপর ২০০৭ সালে তিনি জাপানে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বা কারণ অনুসন্ধানের অভিযান শুরু করেন।

সাবরিনা মূলত বিশ্বের অন্যতম বড় একটি প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান করতে চেয়েছিলেন, এটা জানতে যে কেন তার ক্ষেত্রে কোন পণ্য কাজ করেনি।

"আমি রসায়নবিদ এবং বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। ড্রাগ-স্টোর থেকে শুরু করে মার্কেটের বিউটি কর্নার কোনটাতে যাওয়াই বাদ রাখিনি।"

পরে সাবরিনা আবিষ্কার করেন যে জাপানিরা কিছু বিশেষ উপাদান ব্যবহারের ব্যাপারে উৎসাহী। অবশেষে তিনি একটি ল্যাব বা পরীক্ষাগার খুঁজে পান যা তার চাহিদার কথা বুঝতে পেরেছিল।

সাবরিনা চেয়েছিলেন, ত্বকের যত্নে এমন প্রসাধনী তৈরি করতে যা সবার ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমস্যার সমাধান করবে।

জাপানের এই সফরটি তাকে তার লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরণের আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল।

বাধা পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক

তার স্বামীও মনে করেছেন যে এটি বেশ ইন্টারেস্টিং আইডিয়া। কিন্তু, সাবরিনার দুশ্চিন্তা ছিল যে তিনি ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে কিভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন।

তবুও, তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন এবং তারা দুজনই তাদের চাকরি ছেড়ে এই ব্যবসায় মনোযোগ দেন। সারা জীবনের জমা পুঁজি বিনিয়োগ করেন এই ব্যবসায়।

সাবরিনা চেয়েছেন তার পুরোটুকু ব্যবসায় দিতে। তবে বিপর্যয়ের শঙ্কা প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করতো।

এক বছর পরে সিঙ্গাপুরে তিনি তার প্রথম দোকান খোলেন। দুই বাচ্চা নিয়ে এই ব্যবসা গড়ে তুলতে গিয়ে প্রায়ই রাতে তিনি মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেতেন।

"অনেক সময় আমি আমাদের ড্রাইভওয়েতে গাড়ির মধ্যে বসে ভাবতাম, 'আমি কি সঠিক কাজ করছি?'।"

এভাবে বছর গড়াতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সাবরিনার এই ব্র্যান্ড প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

এই প্রতিষ্ঠানটি ত্বকে ব্যবহারের সিরাম, ক্রিম এবং হাই-টেক সৌন্দর্য সামগ্রী বিক্রি করে থাকে। এখন তারা আরও দুটি দোকান খুলছে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভাগ্য ঘুরে যায়

সাবরিনার ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়, সৌন্দর্যের বৈশ্বিক পাওয়ারহাউস 'সেফোরা'-এর সঙ্গে একটি বিতরণ চুক্তি।

ফরাসি এই প্রতিষ্ঠান তাদের বিশাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে সাবরিনার কোম্পানির বিশাল প্রচারণা করে। ফলে গ্রাহকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, সাবরিনার পণ্যের নাম।

সেফোরা মূলক কাস্টমাইজড স্কিন কেয়ার পণ্যের প্রতি আগ্রহী ছিল। এজন্য তাদের একজন নির্বাহী স্কিন ইঙ্ক স্টোর পরিদর্শনে করেন।

এভাবে সেফোরায় জায়গা হয় স্কিন ইঙ্কের। বর্তমানে স্কিন ইঙ্ক এশিয়ান স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের এই ব্র্যান্ডটি তাদের সমস্ত পণ্য তৈরি করে জাপানে -যা বিশ্বব্যাপী তাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব।

মার্কিন ডিপার্টমেন্ট স্টোরের চেইন নর্ডস্ট্রোমের মতো খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরবর্তীতে নিউইয়র্কের বার্গডোর্ফ গুডম্যান এবং ব্রিটেনের সেলফ্রিজেসের মতো বিলাসবহুল দোকানে ছড়িয়ে পড়ে স্কিন ইঙ্ক।

তাদের কিছু সেবা বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, ব্যস্ত নারীদের জন্য সৌন্দর্য চিকিৎসা।

সাবরিনা বলেন, "চীনে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, পৃথিবীতে কোন কুশ্রী নারী নেই, শুধু অলস নারী আছে"।

সেই অলস নারীদের ত্বকের যত্নের দায়িত্বটিই নিতে চেয়েছে স্কিন ইঙ্ক।

কেন এটি আলাদা

এই ব্র্যান্ডের মূল বিষয়টি হল প্রযুক্তি। যেটা সাবরিনার চিন্তাভাবনাকে পরিচালনা করার পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্যের বিকাশে সহায়তা করে।

অনলাইনে জরিপের মাধ্যমে এবং লাখো গ্রাহকের ত্বক পরীক্ষা করে তথ্য সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য সিঙ্গাপুর, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বহু কর্মী কাজ করছে।

তারা সেই তথ্যের ভাণ্ডার ব্যবহার করেই পণ্য প্রস্তুত করে থাকেন।

তারা জানার চেষ্টা করেন যে - কতজন নারী পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না বা ব্যায়াম করেন না - ইত্যাদি।

সাবরিনা বলেছেন: "প্রযুক্তিতে সবসময় একটি সমস্যা সমাধান করার মানসিকতা থাকে, আমরা সমস্যাটি নির্ণয় করি তারপর মূল সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করব সেটা বের করি।"

মিনটেলের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সৌন্দর্য বিশ্লেষক শ্যারন কোয়েক বলেছেন, "স্কিন ইঙ্কের স্কিন কেয়ার নিয়ে এই ভিন্ন ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবসা শুরু সময় থেকেই সব নজর কাড়ে।"

"যে সময়ে ত্বকের প্রোফাইলিং এবং কাস্টমাইজেশন করার বিষয়টি সেভাবে প্রচলিত ছিলনা। স্কিন ইঙ্ক প্রতিটি চামড়ার ধরণ অনুযায়ী চাহিদা পূরণ করে থাকে,"

সাবরিনা নিজে বিনিয়োগের পাশাপাশি হংকং এবং কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের থেকেও তহবিল সংগ্রহ করে থাকে।

এখানেই শেষ নয়

সাবরিনার এখন লক্ষ্য ফিটনেস স্টুডিও, সুস্থতা কেন্দ্র এবং ত্বকের যত্নে ভেন্ডিং মেশিন চালু করা।

বর্তমানে কোম্পানির প্রতিটি দিকের বিকাশে বিভিন্ন মিটিং করতে হয় সাবরিনাকে। সরবরাহকারীদের সাথে কথা বলা থেকে শুরু করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা কৌশল সবকিছুতে তিনি যুক্ত হন।

এতো ব্যস্ততার মাঝেও তিনি প্রতিদিন সকালে জগিং করেন এবং রাতের বেলা পরিবারের জন্য সময় রাখেন।

মাঝে মাঝে তার কর্মীদের নিয়েও আড্ডার আয়োজন করেন।