গ্রিনল্যান্ড: যে দেশে বুধবার নারীদের জন্যে 'গর্ভপাত দিবস', জন্মের চেয়েও বেশি গর্ভপাতের হার

প্লাস্টিকের পুতুল। অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ ঠেকাতে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্যে আছে নানা ধরনের উদ্যোগ। তার একটি 'পুতুল প্রকল্প'

ছবির উৎস, PAARISA

ছবির ক্যাপশান, অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ ঠেকাতে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্যে আছে নানা ধরনের উদ্যোগ। তার একটি 'পুতুল প্রকল্প'

"এনিয়ে আমি দ্বিতীয়বার চিন্তা করি না। গর্ভপাতের বিষয়ে আমরা খোলামেলা কথা বলি। আমার মনে আছে, শেষবার যখন গর্ভপাত করি তখন আমি আমার সব বন্ধুসহ পরিবারের সবাইকে জানিয়েছিলাম," বলছিলেন গ্রিনল্যান্ডের ১৯ বছর বয়সী পিয়া। পরিচয় গোপন রাখতে তার নামটি বদলে দেওয়া হয়েছে।

গত দুই বছরে তিনি মোট পাঁচবার গর্ভপাত করিয়েছেন।

"সাধারণত আমি জন্মনিরোধক ব্যবহার করি। কিন্তু কখনো কখনো সেটা করতে ভুলে যাই। এখন আমি সন্তান নিতে পারবো না। কারণ আমি এখন স্কুলের শেষ বর্ষে," বলেন রাজধানী নুকের এই কিশোরী।

গ্রিনল্যান্ডে এরকম আরো বহু নারী আছেন যারা তার মতো বেশ কয়েকবার গর্ভপাত করিয়েছেন।

পরিসংখ্যানে সেটাই দেখা যাচ্ছে। ২০১৩ সালের পর থেকে এই দেশটিতে শিশু জন্মের চেয়ে গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে বেশি। দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর যেখানে ৭০০টি শিশুর জন্ম হয়েছে সেখানে গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে ৮০০টি।

তাহলে গ্রিনল্যান্ডে গর্ভপাতের হার এতো বেশি হওয়ার পেছনে কারণ কী?

রাজধানী নুকে শিক্ষার্থীরা বুধবার বলতেই মনে করেন গর্ভপাতের দিন।

ছবির উৎস, CHRISTIAN KLINDT SOELBECK

ছবির ক্যাপশান, রাজধানী নুকে শিক্ষার্থীরা বুধবার বলতেই মনে করেন গর্ভপাতের দিন।

লজ্জা কম

বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড, কিন্তু এর জনসংখ্যা খুবই কম- মাত্র ৫৬ হাজার।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটিতে যতো নারী অন্তঃসত্ত্বা হন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি গর্ভপাত করে ফেলেন। প্রতি এক হাজার নারীর মধ্যে গর্ভপাতের হার প্রায় ৩০। ডেনমার্কে এই হার মাত্র ১২।

গ্রিনল্যান্ড স্বশাসিত একটি দেশ, কিন্তু পুরোপুরি সার্বভৌম নয়। অনেক কিছুর জন্যেই দেশটি ডেনমার্কের উপর নির্ভরশীল।

অর্থনৈতিক সমস্যা, আবাসনের সঙ্কট এবং শিক্ষার অভাব - এসবই গর্ভপাতের হার বেশি হওয়ার কারণ। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও যথার্থ নয়, কারণ দেশটিতে বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক সরবরাহ করা হয় এবং সেসব খুব সহজেই পাওয়া যায়।

যেসব দেশে গর্ভপাত বৈধ এবং বিনা খরচে সেটা করা যায়, সেসব দেশেও গর্ভপাতের বিষয়ে লাজ-লজ্জা কাজ করে থাকে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডে এরকম কিছু নেই। অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণের ব্যাপারে এই দেশের নারীরা মোটেও চিন্তিত নন। তারা বিব্রতও হন না।

আরো পড়তে পারেন:

অর্থনীতির বড় অংশ আসে ডেনমার্ক থেকে কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের আছে নিজস্ব পার্লামেন্ট।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অর্থনীতির বড় অংশ আসে ডেনমার্ক থেকে কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের আছে নিজস্ব পার্লামেন্ট।

গর্ভপাত দিবস

অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণের সংখ্যা এতো বেশি কেন এই দেশে?

"আমার বেশিরভাগ বন্ধুই একবার হলেও গর্ভপাত করিয়েছে। আমার ও আমার ভাইয়ের জন্মের আগে আমার মা-ও তিনবার গর্ভপাত করিয়েছিলেন," বলেন পিয়া, "কিন্তু তিনি এবিষয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন না।"

"যৌন স্বাস্থ্যের ব্যাপারে নুকের শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রতি বুধবার চালু আছে একটি বিশেষ ক্লিনিক। এই দিনটিকে তারা 'গর্ভপাত দিবস' বলেই মনে করে," বলেন তুরি হেরমান্সদতির, ডেনমার্কের রসকিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিষয়ে পিএইচডি করছেন তিনি।

"গ্রিনল্যান্ডে গর্ভপাতের বিষয়ে কথা বলা নিষিদ্ধ কোন বিষয় বা টাবু নয়। নৈতিকতার দিক থেকেও এটাকে খারাপ হিসেবে দেখা হয় না। এমনকি বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক করা কিম্বা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়াকে খারাপ চোখে দেখা হয় না," বলেন তিনি।

বিনা পয়সায় জন্মনিরোধক সরবরাহ করা হলেও নারীরা এসব ব্যবহার করেন না।

ছবির উৎস, Media for Medical

ছবির ক্যাপশান, বিনা পয়সায় জন্মনিরোধক সরবরাহ করা হলেও নারীরা এসব ব্যবহার করেন না।

জন্মনিরোধক ফ্রি

"জন্মনিরোধক পাওয়া যায় বিনা পয়সায়। এগুলোও পাওয়াও সহজ। কিন্তু আমার বন্ধুরা এসব তেমন একটা ব্যবহার করে না," বলেন পিয়া।

স্টাইন ব্রেনো একজন নার্স। গত কয়েক বছর ধরে গর্ভপাতের বিষয়ে গবেষণা করছেন তিনি।

"আমি যাদের ওপর জরিপ চালিয়েছি, তাদের প্রায় ৫০ শতাংশ জন্মনিরোধকের কথা জানেন কিন্তু তাদের ৮৫ শতাংশ এসব ব্যবহার করেন না কিম্বা ঠিক মতো ব্যবহার করেন না," বলেন তিনি।

তার মতে অনাকাঙ্খিত গর্ভপাতের পেছনে একটি কারণ হতে পারে অ্যালকোহল। তিনি বলেন, "তারা যখন মদ খান তখন তারা জন্মনিরোধক ব্যবহারের কথা ভুলে যান।"

তার মতে নারীরা তিনটি কারণে জন্মনিরোধক ব্যবহার করেন না বলে তিনি মনে করেন।

"প্রথমত যারা শিশুর জন্ম দিতে চান, দ্বিতীয়ত যেসব নারী সহিংসতার শিকার কিম্বা মদ খান এবং তৃতীয়ত তাদের পুরুষ সঙ্গী হয়তো কনডম ব্যবহার করতে রাজি হন না।"

১৯৭৫ সাল থেকে গ্রিনল্যান্ডে গর্ভপাত বৈধ

ছবির উৎস, Sean Gallup

ছবির ক্যাপশান, ১৯৭৫ সাল থেকে গ্রিনল্যান্ডে গর্ভপাত বৈধ

সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন

কোন নারী যদি ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকেন তাহলে তিনি গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অথবা তার বাড়িতে যদি সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটে তাহলেও হয়তো তিনি চাইবেন না যে তার সংসারে শিশুটি আসুক।

"তারা মনে করেন অবহেলিত ও অনাকাঙ্খিত শিশুর চাইতে গর্ভপাতই ভাল," বলেন লার্স মোসগার্ড, একজন ডাক্তার তিনি।

গ্রিনল্যান্ডে পারিবারিক সহিংসতা একটি বড় সমস্যা। প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর একজন বলেছেন যে তারা বাড়িতে তার মাকে সহিংসতার শিকার হতে দেখেছেন।

অনেক সময় পরিবারের শিশুরাও এই সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে।

"গ্রিনল্যান্ডে লোকজনের এক তৃতীয়ায়শ শৈশবে কোন না না কোন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন," বলেছেন ডিতে সলবেক, যৌন নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে গৃহীত সরকারি প্রকল্পে কাজ করেন তিনি।

জন্মনিরোধ সম্পর্কে ধারণা কম

যদিও দেশটিকে বিনামূল্যে জন্মনিরোধক সরবরাহ করা হয় এবং এসব সহজেই পাওয়া যায়, তারপরেও এর সুফল খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।

"মনরিং আফটার পিল বলে যে কিছু আছে সেটা আমি মাত্র একমাস আগে জেনেছি। আমার ধারণা অনেকেই এই বড়ির ব্যাপারে জানে না," বলেন পিয়া।

"আমার মা কখনো আমার সাথে এসব বিষয়ে কথা বলে নি। কিছু কিছু জিনিস আমি স্কুল থেকে শিখেছি। আর বেশিরভাগই জেনেছি বন্ধুদের কাছ থেকে।"

গ্রিনল্যান্ডের লোকজনের মধ্যে মদ খাওয়ার হারও বেশি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রিনল্যান্ডের লোকজনের মধ্যে মদ খাওয়ার হারও বেশি।

আত্মহত্যার হারও সবচেয়ে বেশি

গ্রিনল্যান্ডে শুধু গর্ভপাতের হার নয়, আত্মহত্যার হারও অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে প্রত্যেক বছরে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ৮৩ জন আত্মহত্যা করেন।

যেসব কিশোর কিশোরী কিম্বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন, তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যতো মানুষ আত্মহত্যা করেন তাদের অর্ধেকেরও বেশি অল্পবয়সী পুরুষ।

"নির্যাতন ও সহিংসতার ভেতরে যারা বেড়ে ওঠে তাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি," বলেন মনোবিজ্ঞানী লার্স পিডারসেন।

অ্যালকোহলও দেশটির বড় সমস্যা। এর জের ধরে বেড়েছে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনাও।

"প্রত্যেকেই এমন কাউকে না কাউকে চেনেন যিনি আত্মহত্যা করেছেন," বলেন পেডারসন।

গর্ভপাত ফ্রি

দেশটিতে সবার জন্যে গর্ভপাত ফ্রি। সেকারণে অনেকেই চিন্তাভবনা না করেই গর্ভপাত করে ফেলেন।

তাই কেউ কেউ মনে করেন এই হার কমাতে হলে গর্ভপাতের ওপর চার্জ বসানো উচিত।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই হার বেশি হওয়ার পেছনে ফ্রি গর্ভপাতের কোন সম্পর্ক নেই।

গ্রিনল্যান্ডে ছেলেমেয়েরা ১৪-১৫ বছর বয়স থেকে যৌন সম্পর্ক করতে শুরু করে। জাতীয় পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যাদের বয়স ১৫ তাদের ৬৩ শতাংশ নিয়মিত সেক্স করেন।

তাদেরকে যৌন স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন করতে সরকার ডল প্রজেক্ট নামে কিছু কর্মসুচিও চালু করেছে।

আরো পড়তে পারেন: