মাসুদ আজহার 'গ্লোবাল টেররিস্ট' হওয়ায় কী লাভ হবে ভারতের?

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের নেতা মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘ একজন 'গ্লোবাল টেররিস্ট' বা বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করার পর ভারত একে তাদের বিরাট কূটনৈতিক জয় বলে বর্ণনা করছে।

মাসুদ আজহারকে 'কালো তালিকা'-ভুক্ত করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদে চীন গতকাল তাদের আপত্তি তুলে নেয়।

তারপরই এই পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু এই ঘোষণায় মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে? আর এতে ভারতের সত্যিকারের লাভই বা কতটা হতে পারে?

আরো পড়ুন:

প্রায় বিশ বছর আগে কান্দাহারে একটি ছিনতাই হওয়া ভারতীয় বিমানের যাত্রীদের জীবনের বিনিময়ে মাসুদ আজহারকে কাশ্মীরের জেল থেকে বের করে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল ভারত।

তারপর পাকিস্তানে গিয়ে মাসুদ আজহার জইশ-ই-মহম্মদের প্রতিষ্ঠা করেন, যে সংগঠনকে ভারতে বহু জঙ্গি হামলার জন্য দায়ী করা হয়ে এসেছে।

মাসুদ আজহারকে যাতে গ্লোবাল টেররিস্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তার জন্য গত দশ বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছিল ভারত - বারবার ব্যর্থতার পর অবশেষে বুধবার সন্ধ্যায় তা সফল হয়েছে।

জাতিসংঘর সিদ্ধান্ত সামনে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক নির্বাচনী জনসভায় ঘোষণা করেন, "ভারতের ১৩০ কোটি মানুষের কন্ঠস্বর যে সারা বিশ্ব শুনছে এটা তারই প্রমাণ!"

তিনি একে বর্ণনা করেন 'নতুন ভারতের বজ্রনির্ঘোষ বা হুঙ্কার' হিসেবে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

কিন্তু এই হুঙ্কারে মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে?

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মহম্মদ ফয়সল জানান, "এই শাস্তির মূলত তিনটি দিক আছে।"

"প্রথমত তার বিদেশ সফর নিষিদ্ধ হবে, দ্বিতীয়ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তৃতীয়ত তার অস্ত্র লেনদেন করা চলবে না।"

"একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান অবশ্যই এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।"

তবে মাসুদ আজহার এমনিতেই বিদেশে যান না বহু বছর - তাই ভারতের এই কূটনৈতিক জয়ের লাভটা মূলত 'নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক', মনে করছেন সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত কে সি সিং।

তার মতে, "মাসুদ আজহার এতদিন যেভাবে প্রকাশ্যে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামীর মতো আচরণ করতেন, কাশ্মীর ইস্যুর কথা বলতেন সেটা আর সম্ভব হবে না - কারণ পাকিস্তান তার ওপর রাশ টানতে বাধ্য থাকবে।"

"যদিও তাকে গ্রেফতার করতে হবে না, কারণ সেরকম কোনও শর্ত নেই।"

"তবে মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান কিন্তু এখনই আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের গ্রে লিস্টে আছে।''

''ফলে তাই সেটার কালো তালিকায় যাওয়া ঠেকাতে তাদের কিছু ব্যবস্থা নিতেই হবে", বলছিলেন মি সিং।

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি অবশ্য ভোটের মরশুমে জাতিসংঘের এই ঘোষণায় তাদের রাজনৈতিক লাভও দেখছে।

এদিন বিজেপি সদর দফতরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যেমন সাংবাদিক বৈঠক করে ঘোষণা করেছেন, "পাকিস্তানকে একঘরে করতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে, এটা তারই পুরস্কার।"

তবে এরপরও যে প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে তা হল মাসুদ আজহারের প্রশ্নে চীনের অবস্থান কীভাবে পাল্টাল?

দিল্লিতে সিনিয়র সাংবাদিক সুহাসিনী হায়দার মনে করছেন, চীনের অবস্থান পাল্টানোর পেছনে দুটো প্রধান কারণ।

"এক, য়ুহান শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে নতুন সৌহার্দ্য স্থাপন।"

"আর দ্বিতীয়ত মাসুদ আজহার খুবই অসুস্থ বলে পাকিস্তান থেকেও রিপোর্ট আসছে।"

"ফলে তাকে এবার খরচের খাতায় হয়তো ধরাই যায় বলে পাকিস্তান ও তার বন্ধু চীনও মেনে নিচ্ছে", বলছেন মিস হায়দার।

মাসুদ আজহারকে গ্লোবাল টেররিস্ট হিসেবে ঘোষণায় আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সম্মিলিত চাপও কাজ করেছে তাতে কোনও সংশয় নেই।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও তো একে তাদের কূটনৈতিক বিজয় বলে বর্ণনা করতেও দ্বিধা করেননি।