আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সৌদি যুবরাজের জন্য অভাবী পাকিস্তানের লাল গালিচা
পাকিস্তানের অর্থসঙ্কট এখন চরমে। বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ কমতে কমতে মাত্র ৮০০ কোটি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। বাজেট ঘাটতি বেড়েছে চলেছে। বিদেশী সাহায্যের এতটা প্রয়োজন সাম্প্রতিক সময়ে কখনই হয়নি পাকিস্তানের।
এই সঙ্কটের মাঝে রোববার পাকিস্তান সফরে আসছেন ক্ষমতাধর সৌদি যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমান, যিনি এমবিএস নামেও পরিচিত। তাকে খুশী করতে যতটা মেহমানদারি সম্ভব সব কিছুরই আয়োজন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
ইসলামাবাদে বিবিসির আবিদ হুসেইন বলছেন - কারণ খুব সহজ: তার টাকা চাই, অনেক টাকা এবং সেটা চাই খুব দ্রুত।
এবং ইঙ্গিত রয়েছে, এমবিএস পাকিস্তানকে কয়েকশ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দেবেন। অবশ্য সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্কের গভীরতা শুধু টাকা দিয়ে বিচার্য নয়।
কেমন আড়ম্বর হবে এমবিএসের পাকিস্তান সফরে
এমবিএসের সফর উপলক্ষে পাকিস্তানে এবার যে তোড়জোড় তেমনটি শেষবার দেখা গিয়েছিল যখন ২০০৬ সালে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ এসেছিলেন।
ইমরান খান নিজে বলেছেন, নিরাপত্তার দিকটি তিনি নিজে দেখছেন। সফরটি এমন সময় হচ্ছে যখন ভারত-শাসিত কাশ্মীরে একটি সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রোববার যখন এমবিএসের বিমান পাকিস্তানের আকাশ সীমায় পৌঁছুবে, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে ইসলামাবাদে আনবে। সে সময় অন্য সমস্ত বিমান চলাচল স্থগিত থাকবে।
যুবরাজ সালমানের সফর সঙ্গীর সংখ্যা এক হাজার। তাদের জন্য ইসলামাবাদের পাঁচ তারকার হোটেলে প্রায় সব রুম বুক। ৩০০ টয়োটা ল্যান্ডক্রজার গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছ
সৌদি যুবরাজ থাকবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে। এই সম্মান এর আগে আর কোনো বিদেশী অতিথি কখনই পাননি।
সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের সময় হাজার হাজার পায়রা একসাথে আকাশে ছাড়া হবে।
কেন টাকার জন্য মরিয়া পাকিস্তান?
পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন মাত্র ৮০০ কোটি ডলার। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আমদানির পাওনা শোধ করা যে কোনো সময় কঠিন হয়ে পড়বে।
আই এম এফ-এর কাছ থেকে জরুরী সাহায্য নেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। চাইছেন।
কঠোর শর্তের কারণে সেই সাহায্য যেন খুব বেশি না নিতে হয়, তার জন্য ইমরান খান বিদেশী বন্ধু দেশগুলোর কাছ থেকে সাহায্য চাইছেন। ১৯৮০র দশক থেকে পাকিস্তানকে ১৩ বার আইএমএফ-এর মুখোমুখি হতে হয়েছে।
যুবরাজ সালমানের সফরের ঠিক কদিন আগে এসেছিলেন আবুধাবির যুবরাজ মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
সে সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানকে ৬০০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে পাকিস্তান ৩০০০ কোটি ডলার সাহায্য পাওয়ার আশা করছে।
সৌদি যুবরাজ কোথায় কোথায় বিনিয়োগ বা সাহায্যের প্রস্তাব দেবেন, তা নিশ্চিত নয়, তবে বন্দর নগরী গাদারে ৮০০ কোটি ডলারের নতুন একটি তেল শোধনাগারে সৌদি বিনিয়োগ আশা করছে পাকিস্তান।
চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে এখন যে ৬০০০ কোটি ডলারের ব্যবসা হচ্ছে, তার জন্য গাদার বন্ধর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনা সাহায্যের সাথে এত বেশি শর্ত জোড়া থাকে যে তা নিয়ে পাকিস্তানের সরকার সবসময় দোটানায় থাকে।
সৌদিদের স্বার্থ কী
পাকিস্তানের যেমন সৌদি টাকা প্রয়োজন, সৌদি আরবেরও পাকিস্তানকে দরকার।
ইয়েমেনের যুদ্ধ এবং সাংবাদিক খাসোগজির হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি যুবরাজ যে ইমেজ সঙ্কটে পড়েছেন, তারই প্রেক্ষাপটে তার পাকিস্তানে এই সফর।
তিনি পাকিস্তানের মত নির্ভরশীল বন্ধু দেশগুলোর কাছ থেকে আরো ভরসা চাইছেন। তার জন্য দাম দিতেও তিনি প্রস্তুত।
এছাড়াও পাকিস্তানের অন্যান্য অনেক গুরুত্ব রয়েছে সৌদিদের কাছে।
দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক বহুদিনের। চার দশক আগে যখন মক্কার পবিত্র স্থাপনাগুলোতে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল, তা মোকাবেলায় পাকিস্তানী সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
লন্ডনের দি ইকোনমিস্ট সাময়িকীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পাদক শশাংক যোশী বলেন, "এটা সবসময় ধরেই নেয়া হয় যে সৌদি আরব যদি কখনো কোনো বড় নিরাপত্তা সঙ্কটে পড়ে, পাকিস্তান সৈন্য সরবরাহ করবে।"
"সৌদি আরবের অনেক পয়সা থাকতে পারে, কিন্তু সামরিক শক্তি তাদের সীমিত। তেমনি পাকিস্তানের টাকা পয়সা কম, কিন্তু খুবই শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী তাদের রয়েছে।"
এছাড়াও, মি. যোশী বলেন, প্রকাশ্যে এ কথা কখনো বলা না হলেও, একটি ধারণা রয়েছে যে যদি সৌদি আরবের কখনো পরমাণু বোমা বানানোর প্রয়োজন হয়, পাকিস্তানই সেই প্রযুক্তি তাদের দেবে।
এছাড়া, পাকিস্তান যেহেতু ইরানের প্রতিবেশী একটি দেশ, সে কারণেও পাকিস্তানের সাথে বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারে সৌদি আরব উদগ্রীব।
ইরান নিয়ে সৌদি স্পর্শকাতরতার কথা ভেবে যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমানের ইসলামাবাদে নামার আগে নগরীর সমস্ত জায়গা থেকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে টাঙানো সমস্ত পোস্টার সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না হওয়ার পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে সম্পর্ক সম্প্রতি কিছুটা চটলেও, এই দুই মুসলিম দেশের পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীলতার কোনো বিকল্প এখনও নেই।