আন্দামানে হাজার বছর ধরে বিচ্ছিন্ন রহস্যময় জাতির কাছ থেকে ফিরে আসার গল্প

ছবির উৎস, TN Pandit
ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের একটি প্রত্যন্ত দ্বীপে ৬০ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে সবার অগোচরে বসবাস করছে একটি আদিবাসী গোত্র সেন্টিনেলিজ।
সম্প্রতি এই দ্বীপটির বাসিন্দাদের হাতে আমেরিকা থেকে আসা একজন পর্যটক নিহত হওয়ার পর এই বাসিন্দাদের ওপর সবার নজর পড়েছে, যে গোত্রের মানুষরা এখনো বিশ্বের মানুষজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।
গত ১৭ই নভেম্বর জেলেদের নৌকায় করে ওই দ্বীপপুঞ্জের সেন্টিনেল দ্বীপে যান জন অ্যালেন।
জেলেরা জানিয়েছেন, তারা দেখতে পেয়েছেন দ্বীপের আদিবাসী লোকজন সৈকতে একটি মৃতদেহ টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং কবর দিচ্ছে। এখনো তার মৃতদেহ উদ্ধার করতে পারেনি ভারতীয় কর্মকর্তারা।
কিন্তু এই আদিবাসী গোত্র সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?
সেন্টিনেল দ্বীপে বসবাসকারী এই গোত্রের মানুষজনকে ডাকা হয় সেন্টিনেলিজ নামে।
সত্তরের দশক থেকে এই আদিবাসীদের নিয়ে কাজ শুরু করলেও, সরকারি একটি অভিযানের অংশ হিসাবে ১৯৯১ সালে ওই দ্বীপে গিয়ে উত্তেজনার মুখে পড়েছিলেন টিএন পন্ডিত। বিবিসির কাছে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, TN Pandit
''দ্বীপটিতে যাওয়ার পর একসময় আমার দলের লোকজনের কাছ থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম এবং সৈকতের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। একজন তরুণ সেন্টিনেল বাসিন্দা অদ্ভুত আঁকিবুঁকি করা চেহারা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো, ছুরি বের করলো এবং সংকেত দিলো যেন আমার মাথা কেটে ফেলবে। আমি তাড়াতাড়ি আমার নৌকা ডাক দিয়ে পালিয়ে এলাম।''
''তার শারীরিক ভাষায় এটা পরিষ্কার ছিল যে, আমি এই দ্বীপে স্বাগত নই।''
নিষিদ্ধ চেহারা
১৯৭৩ সালে প্রথম ওই দ্বীপে যান টিএন পন্ডিত। তখন তারা এই আদিবাসীদের নিয়ে একটি গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। তারই অংশ হিসাবে সেন্টিনেলিজ আদিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন তারা।
তিনি বলছেন, ''ওই আদিবাসীদের জন্য আমরা হাঁড়িপাতিল, অনেক নারকেল, লোহার তৈরি যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়েছিলাম। পাশের আরেকটি অনজে গোত্রের তিনজন সদস্যকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম যাতে তারা আমাদের সেন্টিনেলিজ লোকজনের কথার অনুবাদ আর আচরণের ব্যাখ্যা করতে পারে।''
''কিন্তু সেন্টিনেলিজ যোদ্ধারা খুবই রাগী আর অদ্ভুত মুখে আমাদের মুখোমুখি হয়, তাদের হাতে ছিল তীর ধনুক। যেন বহিরাগতদের হাত থেকে তাদের নিজেদের ভূমি রক্ষার জন্য সবাই প্রস্তুত ছিল।''
''হাত-পা বেঁধে রাখা একটি জীবন্ত শুকর তাদের উপহার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটিকে তারা বর্শায় বেধে ফেলে এবং পরে মাটিতে পুতে রাখে। ''
এরপরে এই গোত্রটি সম্পর্কে খুবই কম জানা গেছে।

ছবির উৎস, Survival International
এমনটি পোর্ট ব্লেয়ারে একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, সেন্টিনেল দ্বীপের বাসিন্দারা হল আসলে পাঠান দণ্ডপ্রাপ্তরা (আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের একটি গোত্র), যারা ব্রিটিশ কারাগার থেকে পালিয়ে দ্বীপটিতে লুকিয়ে রয়েছে।
যোগাযোগ স্থাপন হলেও কোন সম্পর্ক নয়
এই রহস্যময় আদিবাসী গোত্র সম্পর্কে সত্তরের দশক থেকে শুরু করেন পন্ডিত এবং তার সহকর্মীরা। ১৯৯১ সালে অবশেষে তারা কিছুটা সাফল্য লাভ করেন।
''আমরা দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে গিয়েছিলাম যে, কেন তারা আমাদের গ্রহণ করলো। ''
''আমাদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি ছিল তাদের সিদ্ধান্ত এবং সেটা তাদের শর্ত মতে হয়েছে। আমরা নৌকা থেকে লাফ দিয়ে নেমে গলা পানিতে দাঁড়িয়ে নারকেল এবং অন্যান্য উপহারগুলো তাদের বিতরণ করেছি। কিন্তু তাদের দ্বীপে নামার অনুমতি আমাদের দেয়া হয়নি।''

ছবির উৎস, T N Pandit
পন্ডিত বলছেন, তারা হামলা করবে বলে তিনি কখনো ভীত ছিলেন না, তবে এই আদিবাসীদের কাছাকাছি গেলে সবসময়ে তিন সতর্ক ছিলেন।
''প্রতিবার যোগাযোগের সময় তারা আমাদের হুমকি দিয়েছে, কিন্তু কখনোই সেটা এমন সীমায় পৌঁছায় নি তারা আমাদের হত্যা করবে বা আমরা কেউ আহত হয়েছি। যখনি তারা ক্ষোভ দেখিয়েছে, আমরা পিছিয়ে এসেছি।''
''সেন্টিনেলিজরা খুব লম্বাও নয়, খুব খাটোও নয়। তারা তীর ধনুক বহন করে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, কিন্তু আমরা তাদের ভাষা বুঝতে পারিনি। তবে ওখানে অন্য যে গোত্রগুলো বাস করে, ভাষাটি অনেকটা তার কাছাকাছি ধরণের। ''
''আমরা ইশারায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তারা তখন নারকেল সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল।''
এই আদিবাসী গোত্রের লোকজন তীর ধনুক দিয়ে মাছ শিকার করে বলে জানা গেছে। বুনো শুকর, শিকড়, বনের ফলমূল আর মধু তাদের প্রধান খাবার। তবে এই বাসিন্দারা সাগরে চলাচলকারী লোকজনের কাছে পরিচিত নন।

ছবির উৎস, Indian Coast Guard/Survival International
কাপড় বিহীন এই গোত্রটি সম্পর্কে এখন এরকম উপহার দেয়ার মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম বাতিল করে দিয়েছে ভারতের সরকার।
কঠোরভাবে রক্ষণশীল
নিজেদের এলাকার ব্যাপারে এই বাসিন্দারা খুবই রক্ষণশীল এবং বাইরের কাউকে পেলেই তারা আক্রমণ করে থাকে।
২০০৬ সালে দুই জন জেলে উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপের কাছাকাছি গেলে আদিবাসীদের হামলায় নিহত হয়। ২০০৪ সালের সুনামির পর যখন ভারতীয় কর্মকর্তারা দ্বীপটির ওপর আকাশ থেকে জরিপ করার চেষ্টা করে, তখন দ্বীপের একজন বাসিন্দা তীর ছুড়ে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা চালায়।

ছবির উৎস, Survival International
বর্ণিল ইতিহাস
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে মূলত চারটি আফ্রিকার উপজাতি গোত্র বাস করে। গ্রেট আন্দামানিজ, অনেজ, জারাওয়া এবং সেন্টিনেলিজ। নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বাস করে দুইটি মঙ্গোলয়েড গোত্র-শোম্পেন এবং নিকোবারিজ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর এই দ্বীপে একটি কারা কলোনি স্থাপন করে, যেখানে বন্দীদের আটকে রাখা হতো।
কিছুদিন পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেই তাদের লড়াই শুরু হয়ে যায়।
ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী বাহিনীর সঙ্গে গ্রেটার আন্দামালিজ বাহিনীর সঙ্গে প্রথম লড়াই হয় ১৮৫৯ সালে, যার ফলাফল সহজেই ধারণা করা যেতে পারে।
যুদ্ধ এবং রোগের বিস্তারের কারণে স্থানীয় গোত্রগুলোয় দ্রুত জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। তবে সেন্টিনেলরা বাস করতো একটি দূরের দ্বীপে, ফলে এই দ্বীপের বাসিন্দা ঔপনিবেশিক শাসনের আওতার বাইরে থেকে যায়।

ছবির উৎস, Instagram/JOHN CHAU
সহিংসতা
কিন্তু তাদের সহিংসতার প্রবণতা এখনো রয়ে গেছে। বিষয়টি অবাক করেছে টিএন পন্ডিতকে।
''সেন্টিনেলিজরা একটি শান্তিপ্রিয় জাতি ছিল। তারা মানুষজনের ওপর হামলা করতো না। তারা আশেপাশের এলাকায় কখনো যেতো না বা কারো সাথে ঝামেলাও তৈরি করতো না। এটা আসলে একটা বিরল ঘটনা।''
ভারতীয় নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ড এই এলাকার আশেপাশে নিয়মিত টহল দিতে চায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঝেমাঝে এরকম অনুপ্রবেশ ঘটে এবং আমেরিকান এই পর্যটকের অনেক মানুষজন দ্বীপটিতে চলে যান।
টিএন পন্ডিত মনে করেন, আরো দ্বীপবাসীদের জন্যে যোগাযোগের উদ্যোগ শুরু করা উচিত।
''আমাদের অবশ্যই আবারো চেষ্টা করা উচিত এবং তাদের সঙ্গে সীমিত আকারে যোগাযোগ শুরু করা উচিত। কিন্তু তাদের বিরক্ত করা অবশ্যই আমাদের উচিত হবে না। তারা আলাদা থাকতে চাইলে সেটিকে আমাদের সম্মান জানানো উচিত।''রবণ








