'পদ্মার ভাঙন: পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু করা হয়নি কিছুই' - বলছে সরকারি গবেষণা সংস্থা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কাছে পদ্মা নদীর ভাঙন সম্পর্কে প্রায় চার মাস আগেই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিলো, দাবি করেছে সরকারেরই একটি গবেষণা সংস্থা।
পদ্মা নদীর ভাঙনে নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার পাঁচ হাজারের মতো বাড়ি ঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু আগেভাগে পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস বলছে, তাদের বাৎসরিক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস ছিল যে এবার বড় ধরণের ভাঙন হবে।
ভাঙনে যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের একজন নড়িয়া উপজেলার মুলফৎগঞ্জের বাসিন্দা মারিয়া আক্তার যূথী। মা, দুই বোন ও এক ভাইকে নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
"যে বাড়িতে আমি ছোট থেকে বড় হইছি, আমাদের সেই বাড়ির পেছনে সুন্দর একটা বাঁশঝাড় ছিল, ফুলের বাগান ছিল, একটা উঠান ছিল। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে চোখের সামনে সবকিছু পদ্মা নদী হয়ে গেলো" - মৃত বাবার রেখে যাওয়া একমাত্র ভিটে বাড়িটুকু কিভাবে চোখের সামনে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে তার বর্ণনা করতে গিয়ে বলছিলেন তিনি।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
যূথী বলছিলেন - যে রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতেন, যে স্কুলে পড়ালেখা করেছেন, তার কাছেই ছিল যে মসজিদ আর হাসপাতাল - সব কিছু এখন নদী গর্ভে।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ও সাবেক একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান বলছিলেন, ১৯৯৬ সালে প্রথম তাদের এলাকায় ভাঙন দেখেছেন। আজ যেখানে পদ্মা নদী, তারও পাঁচ ছয় কিলোমিটার ভেতরে একসময় জমি দেখেছেন তিনি।
২০০৯ সালে প্রথম তাদের গ্রামের কাছাকাছি আসতে শুরু করলো পদ্মার ভাঙন।
মিঃ দেওয়ান বলছিলেন, তারা তখন থেকেই এলাকা রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।
২০১২ সালের দিকে দুই কিলোমিটার জায়গা বালির বস্তা দিয়ে অস্থায়ী ভাবে ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু তার অনেক যায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি জানালেন, এ বছর একটি বড় প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি করা হলেও সেটির কোন ধরনের বাস্তবায়ন তারা দেখেন নি।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলছেন, "গত বছর থেকে তীব্রতর ভাবে নদী ভাঙা শুরু করলো। তখন তেমন কিছু করা হয়নি। তবে এই বছর জানুয়ারি মাসের দুই তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুরেশ্বর থেকে কুন্ডেস্বর পর্যন্ত প্রায় নয় কিলোমিটার জায়গা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ এবং নদীর মধ্যেখানে একটি চ্যানেল কেটে পানি অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য একটি প্রকল্প পাশ করে দিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, এই যে নয়টি মাস চলে গেলো এ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে আমাদের কপালে এখন দুর্দশা।'
কিন্তু এমন দুর্দশা যে নেমে আসছে সে ব্যাপারে আগেভাগেই পূর্বাভাস ছিল।
সরকারের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস অন্তত চার মাস আগে তাদের বাৎসরিক প্রতিবেদনে এমন ভাঙনের কথা উল্লেখ করেছিলো বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সহকারী নির্বাহী পরিচালক ডঃ মমিনুল হক সরকার।
তিনি বলছেন, "প্রতি বছর যেভাবে দেই এবছরও পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিলো এবং এ বছর আমাদের পূর্বাভাস ছিল যে বিরাট ভাঙন হবে। আমাদের যে প্রেডিকশন, দেখা গেছে যে তা প্রায় ঠিকই আছে"

ছবির উৎস, Rehman Asad
গত বারো বছর ধরে বাংলাদেশের নদী ভাঙন সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়ে আসছে এই সংস্থাটি। সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে তারা এমন প্রতিবেদন দিয়ে থাকে।
মিঃ সরকার বলছেন, এখন বর্ষার সময় তেমন কিছুই করা সম্ভব নয়। তিনি বলছেন, "বর্ষার সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড অনেক সময় বালির বস্তা দিয়ে থাকে। বালির বস্তা যে সবসময় কাজ করবেই তা বলা যায়না তবে অনেক সময় সাহায্য করে। মুল কাজটি হওয়া উচিত এ বছর পরিকল্পনা করা যে আগামী বছর শুকনার সময় আমরা এই কাজটি করে ফেলবো। তাহলেই শুধু সম্ভব"
কিন্তু এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই কাজ আরো অনেক আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল।
একটি স্থায়ী শহর রক্ষা বাঁধের কাজ আরো অনেক আগেই শুরু করা উচিত ছিল। কিন্তু সে ব্যাপারে ঠিক কি করা হচ্ছে জানতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেনের কাছে।
তিনি বলছেন, "পানি কমলেই ওখানে এগারোশো কোটি টাকার প্রোটেকশন কাজ শুরু হবে। আর পদ্মার মাঝখানে যেখানে একটা চর ডেভেলপ করেছে ঐ চরটা কাটা হবে। এটা অনুমোদন হয়ে গেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে এর কন্ট্রাক্ট দেয়া হয়েছে"
কিন্তু ঐ এলাকায় অনেকদিন ধরেই ভাঙন হচ্ছে। স্থায়ী কিছু আরো আগেই করা উচিৎ ছিল কিনা তা জানতে চাইলে মিঃ হোসেন বলেন, "আমাদের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল সবসময় ভাঙে। তাহলে আমাদের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর পুরো দুই পারই বাঁধাই করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মাটি হচ্ছে অ্যালুভিয়াল সয়েল। যদি এক পার বাঁধান তাহলে অপর পার ভাঙা শুরু করবে"
তবে তিনি বলছেন এখন বিশেষ অগ্রাধিকার বিবেচনায় এই অঞ্চলের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজ শুরু করা হয়েছে








