আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
যে খনিজ বিপদ ডেকে আনছে ক্যাসামান্সের বাসিন্দাদের জন্য
সেনেগালের ক্যাসামান্স উপকূলের বালু থেকে খনিজ আহরণের পরিকল্পনা করছে একটি চীনা-অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি, যা ক্ষুব্ধ করে তুলছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
কারণ তাদের আশংকা, এর ফলে সেখানকার পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। তাদের আরো ভয়ের ব্যাপার হলো, কোম্পানির কার্যক্রম শুরু হলে তা সেখানে সশস্ত্র বিদ্রোহেরও জন্ম দিতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
নিয়াফ্রাঙ্গের উপকূলে সবসময়েই ভাঙ্গন লেগে থাকে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশংকা, খনি কোম্পানি কাজ শুরু করলে ভাঙ্গন আরো বেড়ে যেতে পারে।
মাইকেল কোলি নামের একজন স্বেচ্ছাসেবক উপকূল রক্ষী সৈকতের বালু হাতে তুলে দেখাচ্ছিলেন, তার ভেতর সাদা চকচকে যে জিনিসগুলো রয়েছে, সেগুলোই জিরকন।
কৃত্রিম হীরা তৈরি আর মোবাইল ফোনের অনেক পার্টস তৈরিতে জিরকন ব্যবহৃত হয়।
খনি কোম্পানি অ্যাশট্রন ধারণা করছে, নিয়াফ্রাঙ্গের প্রতি একশো টন বালুতে টন টন খনিজ, বিশেষ করে জিরকন পাওয়া যাবে।
উপকূল থেকে দুইশ মিটারের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি করার জন্য গত বছর সেনেগালের সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছে অ্যাশট্রন।
তাদের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
যদিও কোম্পানিটি পরিবেশ রক্ষায় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা আর একশো চাকরি তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। স্থানীয় কমিউনিটি হলে সমবেত হয়ে তারা বিক্ষোভ করছেন। প্রকল্পটির বিপক্ষে গানও তৈরি হয়েছে।
মাইকেল কোলি বলছিলেন, ''কোম্পানিটি যদি এখানে কাজ করতে আসে, তাহলে যেভাবে তারা কাজ করে, তাতে এখানে বিশাল বিশাল গর্তের তৈরি হবে। তখন আপনি দেখতে পাবেন যে সমুদ্র এগিয়ে আসছে। আমাদের গ্রামে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হবে, আমাদের শস্য ক্ষেত হারিয়ে যাবে, আমাদের জীবিকা নষ্ট হবে, আমাদের পরিবেশ বলে কিছু থাকবে না। আরো চিন্তার ব্যাপার হলো, ক্যাসামান্সের বিদ্রোহীরা রেডিওতে বলেছে, ওই কোম্পানি যদি এখানে আসে, তাহলে তারা আবার লড়াই শুরু করবে। আর যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের সবাইকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।''
মানচিত্রে তাকালে বোঝা যায়, গাম্বিয়া আর গায়েনা বিসাউয়ের মধ্যের একটি অঞ্চল ক্যাসামান্স, যে এলাকাটি সেনেগালের বাকি এলাকা থেকে বেশ বিচ্ছিন্ন। ৩৫ বছর আগে স্বাধীনতার দাবিকে ওই এলাকায় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, এখন অবশ্য যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনা চলছে।
এই জিরকন প্রকল্প নিয়ে কি ভাবছে বিদ্রোহীরা?
গভীর বনের ভেতর দেয়া সাক্ষাৎকারে বিদ্রোহী এমএফডিসির নেতা সালিফ সাডিও ওই প্রকল্পের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিলেন।
বিদ্রোহী নেতা সালিফ সাডিও বলছেন, ''আমি এটা পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছি, এটা শুরু করা মানে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া। ক্যাসামান্সে আগে স্বাধীনতা আসবে, পরবর্তীতে অন্য সবকিছু। প্রেসিডেন্ট মাকি সল জানেন, ক্যাসামান্সের সম্পদ তিনি স্পর্শ করতে পারেন না। সেটা করা হবে আমাদের সঙ্গে সব সমঝোতার লঙ্ঘন করা। সেনেগাল সরকার যদি আবার অগ্নুৎপাত শুরু করতে চায়, আমাদের কোন সমস্যা নেই। আমরা যুদ্ধের মধ্যেই জন্মেছি, আমরা যোদ্ধা হিসাবেই জন্মেছি।''
বিবিসির সঙ্গে ইমেইল বার্তায় খনি কোম্পানি আশট্রন জানিয়েছে, জিরকন প্রকল্পে খুব কম মাত্রায় প্রচলিত খনির মতো প্রভাব পড়বে।
কোম্পানি জেনারেল ম্যানেজার টিম চেজ বিদ্রোহীদের হুমকির বিষয়টিও উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, সালিফ সাদিও-র বিরোধিতার বিষয়টি পুরনো। স্থানীয় এমএফডিসির লোকজন এই প্রকল্পের পক্ষেই রয়েছে। গুটিকয়েক সংকীর্ণ ব্যক্তির বক্তব্য বিবেচনায় আনতে চায় না এই প্রকল্প।
আরও পড়তে পারেন:
সেনেগালের রাজধানী ডাকারে খনি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ওসমান চিসি বলছেন, ক্যাসাম্যান্সের উন্নতি করার জন্যই এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে সরকার।
মি. চিসি বলছেন, ''অস্থিরতা তৈরি করার জন্য কেউ খনি কার্যক্রম শুরু করে না। আপনি খনিজ সম্পদ আহরণ করবেন এই বিবেচনায় যে, এসব সম্পদ ওই এলাকার উন্নতিতে কাজে লাগবে, দেশের উন্নতি হবে। এটাই হচ্ছে সেনেগাল সরকারের উদ্দেশ্য এবং নীতি।''
নিয়াফ্রাঙ্গ হচ্ছে উপকূলের ভাঙ্গন প্রবণ এলাকার একটি প্রান্তিক গ্রাম- যেখানে অনেকের কাছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। তা সত্ত্বেও এই এলাকার বাসিন্দাদের কাছে বহু দূরের সরকারের উন্নতির আশ্বাসবাণীর চেয়ে নতুন একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা বরং অনেক বেশি ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।