ভারতে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের লেখার উপজীব্য যা

ছবির উৎস, BBC Bangla
কেউ কলেজের প্রিন্সিপাল, কেউ অধ্যাপক, কেউবা স্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই। কেউ নাচ গান করে অর্থোপার্জন করেন। তবে সকলেই কবিতা লেখেন, কেউ গান বাঁধেন। আরও একটা বিষয়ে এঁদের মধ্যে মিল রয়েছে - এই কবিরা সকলেই রূপান্তরকামী।
ভারতের সাহিত্য আকাদেমি কলকাতায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের নিয়ে আয়োজন করেছিল এক কবি সম্মেলনের।
তাঁদের কবিতায় উঠে এসেছে রূপান্তরকামী হওয়ার কারণে অপমান, জীবন যন্ত্রণা আর লড়াইয়ের কথা। সেদেশের প্রথম সরকারী উদ্যোগে তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের উৎসব ছিল এটি।
পরিবারে সন্তানের জন্ম হওয়ার পরে অনেকেই হয়তো শুনেছেন সাধারণভাবে যেগুলোকে হিজড়াদের গান বলা হয়ে থাকে, সেই গান।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এঁরা গাইছিলেন সম্পূর্ণ অন্য এক পরিসরে - একটা কবি সম্মেলনে। ওটা এঁদেরই সম্মেলন ছিল - তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের কবিতাপাঠের আসর।

ছবির উৎস, BBC Bangla
কবিদের মধ্যে কেউ কলকাতার কলেজে অধ্যাপনা করেন, কেউ গ্রামের স্কুলের মাস্টারমশাই। যেমন মেদিনীপুরের একটি গ্রামের স্কুলের শিক্ষক প্রস্ফুটিতা সুগন্ধা এরকমই একজন রূপান্তরকামী কবি।
"যখন ঠোঁটের ওপর কচি গোঁফের রেখা
হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ধরা,
ক্লাস নাইনে স্যার একদিন ক্লাসে এসে বললেন ফুটবল ম্যাচ হবে,
কে কে খেলবি!
অনির্বাণ বলল, কী রে আকাশ খেলবি নাকি!
স্যার সবার সামনে হেসে বললেন, ও তো মাইচা, ও কী খেলবে
সবাই হেসে উঠল জোরে, স্যারও হাসলেন জোরে।
আমাদের স্কুলের গেটের সামনে যে শিউলি গাছটা ছিল
সেদিন সে তার সব ফুল ঝরিয়েছিল"
এই সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ভারতের সাহিত্য আকাদেমি।

ছবির উৎস, BBC Bangla
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ভারতের প্রথম রূপান্তরী নারী, যিনি একটি কলেজের অধ্যক্ষা হয়েছেন।
কবিতা শোনাচ্ছিলেন মানবীও।
"বর্ধমানের ভাষায় মেয়ে ন্যাংড়া ছেলে
বরিশালে মাইগ্যাপর
ছেলে হয়েও ছেলে নয়, মেয়েও নয়
কেমন একটা মাঝামাঝি।
কোনও একটা দিক নে - হয় ছেলে নয় মেয়ে।
এভাবে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি চাপা পড়বি যে।"
বাংলা ভাষার খ্যাতনামা কবি ও পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমির সভাপতি সুবোধ সরকার বলছিলেন ভারতে শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের নিয়ে সরকারী উদ্যোগে কবি সম্মেলন এই প্রথম হল।
"সরকারী উদ্যোগে তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের নিয়ে এরকম অনুষ্ঠান আগে হয় নি। সে দিক থেকে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাচক্রে কলকাতা বা তার আশেপাশে পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে এরকম বেশ কয়েকজন রূপান্তরী কবি রয়েছেন, যারা বেশ ভাল লিখছেন। তাঁদের জীবনের আবেগ, কষ্ট, ব্যথা বেদনা এগুলো উঠে আসছে লেখায়। এগুলোকে এক্সপ্লোর করা দরকার," বলছিলেন মি. সরকার।

ছবির উৎস, BBC Bangla
যতজন কবিতা পড়লেন, তাঁদের সবার লেখায় বারে বারেই উঠে এসেছে নিজেদের জীবন যন্ত্রণার কথা - আত্মীয় পরিজন থেকে শুরু করে শিক্ষক বা গোটা সমাজের কাছেই কীভাবে ব্যঙ্গের পাত্র হয়ে উঠতে হয়েছে শুধুমাত্র তাদের হাবভাব অন্যরকম বলে.. সেটাই নিজেদের কলমে তুলে ধরেছেন এই কবিরা।
কলকাতার একটি কলেজের অধ্যাপক, ও রূপান্তরকামী কবি দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য বলছিলেন, "আমরা ভীষণভাবে অভ্যস্ত এধরণের জীবন যন্ত্রণা, এরকম অপমানগুলোতে। যেজন্য লিখতে বসলেই এই ভাবনাটাই সবার আগে মাথায় আসে। যদিও অন্য বহু বিষয় রয়েছে যেগুলো নিয়ে লিখি বা লিখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু এটা যেহেতু ট্র্যান্স জেন্ডার কবিদের সম্মেলন, তাই এই যন্ত্রণার বিষয়গুলোই যে আসবে বেশী করে, সেটাই তো স্বাভাবিক।"
মুর্শিদাবাদ থেকে আসা আরেক কবি অরুণাভ নাথ, যিনি নিজেকে অরুণা বলতেই বেশী স্বচ্ছন্দ, তিনি জানাচ্ছিলেন, "সবে তো শুরু হয়েছে আমাদের কবিতা নিয়ে চর্চা। এখন না হয় যন্ত্রণার কথাগুলোই বেশি করে আসুক, তারপরে আমাদের অধিকারের বিষয়গুলো আসবে। আগে তো আমি কে সেটা যেমন মানুষকে জানাতে হবে, তেমনই আমাদের মতো অন্যদেরও জানানো দরকার। তবেই না লড়াইটা লড়তে পারব আমরা।"

ছবির উৎস, BBC Bangla
কবি সুবোধ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে কবিতা হিসাবে কেমন লাগল তৃতীয় লিঙ্গের কবিদের রচনাগুলো?
"একটি রূপান্তরকামী মেয়ে কীভাবে তার জীবনকে দেখছে, তার প্রেম অথবা ব্যর্থতাকে দেখছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের থেকে আলাদা। তবে অন্যদিকে শৈলী অথবা ম্যাচিওরিটির দিক থেকে মূল স্রোতের কবিতার তুলনায় হয়তো তারা এখনও কিছুটা যেন কাঁচা। তবে আমি বলব, এই কাঁচা থাকাটা ভাল। কাঁচা থাকাটাই সততা," বলছিলেন মি সরকার।
রূপান্তরকামীরা কবিতা লিখছেন ঠিকই, তবে এখনও সেগুলো মূলধারার সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে জায়গা করে নিতে পারে নি। তাঁরা বলছেন, সাহিত্য পত্রিকাগুলো তাদের কিছুটা ব্রাত্যই করে রাখে এখনও। তাই নিজেরাই সাহিত্য পত্রিকা বার করেন এই রূপান্তরী কবিদের কেউ কেউ।
আরো পড়ুন:










