বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা হয় না কেন

ঢাকায় যাত্রীরা বলছেন, গণপরিবহনে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় যাত্রীরা বলছেন, গণপরিবহনে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে।
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করেন না- সড়কপথে যাত্রীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী একটি সংগঠন এই তথ্য জানিয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ভয়ে এবং মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের আশ্রয় নেয়ার প্রবণতা কম।

ঢাকার রাস্তায় যাত্রীবাহী বাসের বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাস্তার নৈরাজ্য নিয়ে সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিচ্ছে না, সেটাও অত্যন্ত উদ্বেগের।

সর্বশেষ ঢাকার রাস্তায় বাসের ধাক্কায় আহত কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আলাউদ্দিন সুমনের মৃত্যু হয় বৃহস্পতিবার রাতে। নগরীর একটি ফ্লাইওভারে বাসের ধাক্কায় পা থেঁতলে যাওয়ার পর আলাউদ্দিন সুমন হাসপাতালে পাঁচদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন।

একই ফ্লাইওভারে বৃহস্পতিবার সকালে দু'টি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি বাসের ধাক্কায় একটি ইংরেজি দৈনিকের বিজ্ঞাপন বিভাগের কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনের মৃত্যু হয়।

সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল যে থামছে না, এনিয়ে মানুষ আতঙ্কিত।

যাত্রীবাহী বাসের বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

ছবির উৎস, MUNIRUZZAMAN

ছবির ক্যাপশান, যাত্রীবাহী বাসের বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছিলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের কোন ঘটনা আলোচিত হলেও দীর্ঘ সময় পর দু'একটির বিচার হতে দেখা গেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্তরা আইনের আশ্রয় নেন না। "প্রতিদিন আমাদের সড়ক মহাসড়কে ৬৪জন মানুষ মারা যাচ্ছে। একদিকে ট্রাফিক আইনের দুর্বল ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের শিথিলতা। অন্যদিকে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে সাহস করেন না। অথবা কেউ যদি মামলা করেন,তার দীর্ঘসূত্রিতার কারণেও অনেকে বিচার চাইতেও আগ্রহী হয় না।"

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, "যে সমস্ত সড়ক দুর্ঘটনা হয়, তার ৮০ শতাংশই কিন্তু আপোষ নিষ্পত্তি হয়ে যায়। যে ২০ শতাংশ মামলায় পর্যন্ত গড়ায়, তারও ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে আসামীরা খালাস পেয়ে যায়। যার কারণে কেউ মামলা করতে আগ্রহী হয় না।"

আরো পড়তে পারেন:

তিনি জানিয়েছেন, হতাহতের ঘটনা না ঘটলে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ ঘটনাস্থলেই ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে অন্য পক্ষের সমঝোতা বা মিটমাট করে দেয়। কয়েকদিন আগে ঢাকার রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়ে ঘটনাস্থলেই সমঝোতা করেছেন মোহাম্মদপুরের একজন বাসিন্দা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানিয়েছেন, বিমানবন্দর সড়কে একটি বাস তার প্রাইভেট কারে ধাক্কা দিলে অনেক বিতর্কের পর বাসচালক তাকে তার গাড়ি ঠিক করার জন্য অল্প কিছু অর্থ দিলে তারা সমঝোতা করে ফেলেন।

পরিবহন খাতের প্রভাবের কারণে আইনের আশ্রয় নিয়ে কোন লাভ হবে না বলে তিনি মনে করেন।

তবে আইন প্রয়োগ না করার অভিযোগ মানতে রাজী নন ঢাকার ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মীর রেজাউল আলম।

"আইনের প্রয়োগ আমরা করছি। প্রতিটি ঘটনায় বাস এবং এর চালক আটক হচ্ছে। আমরা চার্জশিটও দিচ্ছি," বলেন তিনি।

গত মাসে দুই বাসের মাঝে পড়ে হাত হারানো তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিব হোসেন মারা যান। দুই বাসের মাঝে তার ঝুলে থাকা হাতের ছবি নিয়ে গণমাধ্যমে এবং সামাজিক নেটওয়ার্কে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

এরকম সমালোচনা সত্ত্বেও ঢাকার রাস্তায় পরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার সেই প্রশ্নে পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে তারা একে অপরের উপর দায়িত্ব চাপাতে চান।

সরকারের একজন মন্ত্রী শাজাহান খান দুর্ঘটনার জন্যে যাত্রীদেরকেও দায়ী করছেন।
ছবির ক্যাপশান, সরকারের একজন মন্ত্রী শাজাহান খান দুর্ঘটনার জন্যে যাত্রীদেরকেও দায়ী করছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মনে করেন, কেউ দায়িত্ব না নেয়ায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না।

এই পরিস্থিতির জন্য পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিভিন্ন পক্ষের। কিন্তু মন্ত্রী শাজাহান খান, যিনি সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনেরও কার্যকরী সভাপতি, তিনি কোন অভিযোগই মানতে রাজী নন।

তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।

"যে লোকটি চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড় দিলেন, তার ট্রাফিক রুল মানতে হবে না?আমার প্রশ্নটি হলো, ট্রাফিক রুল মানার জন্য চালক, শ্রমিক মালিক সবাইকেই আমরা বাধ্য করছি। এবং যতটা সম্ভব করছি। আমাদের সক্ষমতারও কিছুটা অভাব আছে। ঢাকায় ট্রাফিক পুলিশের প্রয়োজন এখন প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজারের মতো। সেখানে আছে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার। এই স্বল্পতা নিয়ে চলা তো মুশকিল।"

কিন্তু পরিস্থিতিকে সরকার আসলে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সন্দেহ রয়েছে।