জাপানের সুমো কুস্তিতে নারীরা নিষিদ্ধ কেন

সুমো কুস্তি জাপানে শত শত বছর ধরে হচ্ছে, এই ছবিটি ২০১১ সালে তোলা

ছবির উৎস, AFP/Getty

ছবির ক্যাপশান, সুমো কুস্তি জাপানে শত শত বছর ধরে হচ্ছে, এই ছবিটি ২০১১ সালে তোলা

জাপানে সুমো কুস্তির কর্তৃপক্ষ 'শুধুমাত্র পুরুষদের' এই খেলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে।

এই খেলাকে ঘিরে সম্প্রতি কিছু কেলেঙ্কারির পর জাপান সুমো এসোসিয়েশন এক বৈঠকে বসেছিল এবিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে। কিন্তু কোন সিদ্ধন্তের কথা তারা ঘোষণা করতে পারেনি।

অতি সম্প্রতি কয়েকজন নারী রিং-এ উঠেছিলেন একজন পুরুষকে সাহায্য করতে কিন্তু তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়। এই ঘটনার পর নারী পুরুষের বিষয়টি আবারও সামনে চলে আসে।

সাধারণত নারীদেরকে 'অপরিষ্কার' হিসেবে বিবেচনা করার কারণে এই খেলায় তাদেরকে অংশ নিতে দেওয়া হয় না। এমনকি তাদের সেখানে প্রবেশেরও সুযোগ নেই।

সমিতির পরিচালক তোশিও তাকানো বলেছেন, "এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন। সেজন্যে তাদের আরো সময়ের প্রয়োজন।"

সুমো নিয়ে কেন এই সমালোচনা?

এই এপ্রিল মাসে মাইজুরু শহরের মেয়র রিয়োজো তাতামি রিং-এর উপর ভাষণ দেওয়ার সময় সেখানে পড়ে যান। তখন কয়েকজন নারী সেখানে ছুটে যান মেয়রকে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু রেফারি তাদেরকে বলেন সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে স্থানীয় মিডিয়াতে খবর বেরিয়েছে যে এরপর ওই রিং-এর উপর লবণ ছিটানো হয়। খেলা শুরু হওয়ার আগে সাধারণত এভাবেই রিংকে 'পবিত্র' করা হয়।

আরো পড়তে পারেন:

রিং এর উপর লবণ ছিটিয়ে সেটিকে পবিত্র করা হচ্ছে

ছবির উৎস, AFP/Getty

ছবির ক্যাপশান, রিং এর উপর লবণ ছিটিয়ে সেটিকে পবিত্র করা হচ্ছে

রেফারির এই সিদ্ধান্তের ফলে তীব্র সমালোচনা হয়েছে জাপান সুমো এসোসিয়েশনের। পরে এই সমিতির প্রধান এজন্যে ক্ষমাও চেয়েছেন।

কিন্তু তার কয়েকদিন পরেই এই সমিতি আবারও আক্রমণের মুখে পড়ে যখন একটি শহরের এক নারী মেয়রকে রিং-এ উঠতে বাধা দেওয়া হয়।

তাকারাজুকা শহরের মেয়র তোমোকো নাকাগাওয়া সুমো সমিতির কাছে জানতে চেয়েছিলেন একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আগে শহরের এক রিং-এ দাঁড়িয়ে তিনি বক্তব্য রাখতে পারেন কিনা। কিন্তু তাকে "ঐতিহ্যকে সম্মান' জানানোর কথা বলে না করে দেওয়া হয়।

পরে রিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, "নারী মেয়ররাও মানুষ। আমি শুধু নারী হওয়ার কারণে বক্তব্য রাখতে না পেরে খুব হতাশ।"

মেয়র তোমোকো নাকাগাওয়া

ছবির উৎস, AFP/Getty

ছবির ক্যাপশান, মেয়র তোমোকো নাকাগাওয়া

নারীদেরকে কেন রিং-এ উঠতে দেওয়া হয় না?

জাপানে সুমো কুস্তি খেলা হচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে। এখনও অনুসরণ করা হয় বহু প্রাচীন রীতিনীতি।

জাপান টাইমসের সাবেক একজন কলামিস্ট মার্ক বাকটন বিবিসিকে বলছেন, এই খেলাটির সাথে জাপানের শিন্তো ধর্মের সম্পর্ক রয়েছে।

"জাপানে এটি কখনোই খেলা হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং এটি জাপানিদের সাইকির সাথে গভীরভাবে জড়িত।"

বহু বছর ধরে যেসব রীতিনীতি চলে আসছে তার মধ্যে রয়েছে যে খেলা শুরু হওয়ার আগে রিং-এর মাঝখানে একটি গর্ত তৈরি করা হয়। তারপর সেটি পূর্ণ করা হয় বাদাম, শামুক জাতীয় সামুদ্রিক প্রাণী এবং সমুদ্রের লতাগুল্ম দিয়ে। আর সেই কাজটা করেন শিন্তো ধর্মের যাজকেরা।

তারপর গর্তটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর সুমো কুস্তিগিররা রিং-এর উপর উঠে পা দিয়ে মাড়াতে থাকেন ও হাতে তালি দেন। তাদের উদ্দেশ্য হলো সেখান থেকে খারাপ প্রেতাত্মাদের তাড়ানো।

"শিন্তো ধর্মে সুমো কুস্তির রিং-কে দেখা হয় পবিত্র একটি জায়গা হিসেবে," বলেন মি. বাকটন।

মঞ্চ থেকে খারাপ প্রেতাত্মা তাড়াতে কুস্তিগিররা কিছু রীতিনীতি অনুসরণ করেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মঞ্চ থেকে খারাপ প্রেতাত্মা তাড়াতে কুস্তিগিররা কিছু রীতিনীতি অনুসরণ করেন।

এই ধর্মে নারীদেরকে তাদের মাসিকের রক্তের কারণে দেখা হয় 'অপবিত্র' হিসেবে। আর একারণে তাদেরকে রিং-এর ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

মনে করা হয়, যে কোন রক্ত জায়গাটিকে অপবিত্র করবে। এমনকি পুরুষ কুস্তিগিরদের শরীর থেকেও যদি কোন কারণে সেখানে রক্ত ঝরে - তখন লবণ ছিটিয়ে জায়গাটিকে পবিত্র করা হয়।

এই রীতির কি পরিবর্তন হতে পারে?

সুমো প্রধান ওগুরামা, যার এই একটিই নাম, তিনি বলেছেন, "এসব রীতিনীতি শত শত বছর ধরে অনুসরণ করা হচ্ছে। আর এটা আমরা মাত্র এক ঘণ্টায় বদলে দিতে পারি না।"

এর আগেও এধরনের ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু সুমো সমিতি কখনও তাদের সিদ্ধান্ত বদল করেনি।

২০০০ সালেও ওসাকার গভর্নর সুমো সমিতিকে অনুরোধ করেছিলেন রিং-এর ভেতরে যেতে অনুমতি দেওয়ার জন্যে। তিনি চ্যাম্পিয়ন এক কুস্তিগিরের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেসময় তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

সারা বিশ্বে নারীরা সুমোতে অংশ নিতে পারে, কিন্তু জাপানে নয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সারা বিশ্বে নারীরা সুমোতে অংশ নিতে পারে, কিন্তু জাপানে নয়।

মি. বাকটন মনে করেন যে সুমো সমিতি কখনোই এই নীতির পরিবর্তন ঘটাবে না, কারণ এটি বহু দিনের সংস্কৃতি। এ ছাড়াও জাপানে নারীবাদের বিষয়ে লোকজন খুব একটা সচেতন নয়।

"সুমো সমিতি শুধু অপেক্ষা করছে কখন এসব কেলেঙ্কারির ঘটনা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যায় তার জন্যে।"

"জাপানে এটা তেমন বড় কোন বিতর্ক নয়," বলেন তিনি।