কলাম্বিয়াতে কেন কোকেন এর ব্যবসা বেড়ে গেছে?

চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণে কলাম্বিয়াতে প্রায়শই রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ছবির ক্যাপশান, কোকেইনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কলাম্বিয়াতে প্রায়শই রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

কলাম্বিয়ার বন্দরনগরী তমাকো খুব ব্যস্ত একটি শহর। দেশটির দীর্ঘ সহিংস সংঘাতের কেন্দ্রে ছিল এই শহরটি।

দেশটির অপরাধী চক্র গুলোর মূল ঘাটি গড়ে উঠেছে এই শহরকে কেন্দ্র করে।

বিশ্বের কোকেন ব্যবসার জন্য শহরটি ভয়াবহ কুখ্যাত। অনেকেই তমাকো শহরটিকে খুব বিশৃঙ্খল এক ময়লার ভাগাড়ও বলে থাকেন।

শহরটির রাস্তার ধার দিয়ে চলে গেছে ময়লা পানির খাল। তার উপর তৈরি হয়েছে বহু কাঠের ঘর।

এখানে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করে না রাস্তার যানবাহন।

কার্লোস এই শহরে ট্যাক্সি চালক হিসেবে কাজ করেন তাকে প্রতিবেদক জিজ্ঞেস করেছিলেন সাবেক বিদ্রোহী বাহিনী ফার্কের সাথে সরকারের শান্তি চুক্তির পর কি তাদের জীবনে আসলেই শান্তি ফিরে এসেছে?

তিনি বলছেন, "এটা একটা হাস্যকর কথা। শান্তি চুক্তি সাক্ষর হওয়ার পর থেকে আমাদের এখানে খুন খারাবি, মারামারির মতো সন্ত্রাস দুশো গুন বেড়ে গেছে। তমাকো শহরে মরতে আমরা ভয় পাইনা। বরং বেঁচে থাকা নিয়েই আমাদের যত শঙ্কা"

শহরটির অধিবাসীরা মনে করেন কলাম্বিয়ার সরকার তাদের ভুলে গেছে।

এই শহরের চারপাশের ভূমিতে যে কোকেন চাষ হয় সেটিই এখানকার কৃষকদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

কোকেনের কাঁচামাল কোকা চাষ কলাম্বিয়াতে অবৈধ হলেও এটি চাষ করেই তাদের পেট বলে বলছেন এলিসা।

কোকা পাতা
ছবির ক্যাপশান, কোকা পাতা থেকে তৈরি হয় মাদকদ্রব্য কোকেইন।

তিনি বলছেন, "আমরা জানি যে এটি চাষ করা অবৈধ। কর্তৃপক্ষ এর চাষের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে সেটাও আমরা জানি"

এলিসার পরিবার গত ৫০ বছর ধরে কোকা চাষ করছেন। কোকা গাছ খুব বেশি লম্বা নয়। ঝোপের-ঝাড়ের মতোই উঁচু বলা চলে। এর পাতা থেকেই তৈরি হয় মাদকদ্রব্য কোকেন।

১২ কিলোগ্রাম কোকা পাতা বিক্রি করে ৩০ হাজার পেসো আয় করেন কৃষকেরা। অর্থাৎ দশ ডলারের মতো।

কিন্তু কোকেনের সবচাইতে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় একগ্রাম কোকেইনের দাম আশি ডলারের মতো।

এর ব্যবসা ও চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণে কলাম্বিয়াতে প্রায়শই রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সরকার শান্তি আলোচনায় ব্যস্ত থাকায় কোকেন উৎপাদন ও চোরাচালানের মতো সমস্যা মনোযোগ পায়নি বলে অভিযোগ করছেন সেখানকার বাসিন্দারা।

সেখানে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে সরকারের সাথে শান্তি চুক্তির পর সাবেক বিদ্রোহী বাহিনী ফার্ক অস্ত্র সমর্পণ করার পর এক ধরনের শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে।

আগে তারাই কোকেন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতো বলে অভিযোগ রয়ছে।

তাদের অনুপস্থিতিতে কোকেইন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু হয়েছে নতুন লড়াই।

সবচাইতে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় এক গ্রাম কোকেনের দাম আশি ডলারের মতো।
ছবির ক্যাপশান, সবচাইতে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় এক গ্রাম কোকেনের দাম আশি ডলারের মতো।

বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেই সংঘাত যেন আরো বেড়েছে, বলছিলেন এলিসা।

তিনি বলছেন, "কিছু লোক হয়ত একটা এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আর অন্যরা অন্য কোনও এলাকার। যখন পাতা তোলার সময় হয় তখন এসব গ্যাং কৃষকদের ভয় দেখায়। আইনের শাসন এখানে এখন অনেক কমে গেছে"

কলাম্বিয়ার সরকার দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ী গ্যাং এর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

তাদের সম্মুখ যুদ্ধ এমনটি মাইন পুতে রাখা জমিতেও কাজ করতে হয় বলছেন দেশটির মাদক বিরোধী বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল এফরাইন গার্সিয়া হার্নান্দেজ।

তিনি বলছেন, "এই এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং নানা গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের সার্বক্ষণিক সংঘর্ষে জড়াতে হচ্ছে। এরকম একটা বিষয় সামলাতে অবশ্যই সময় লাগবে। এখানে কোকেনের উৎপাদন বাড়ছে এবং যেসব যায়গায় যাতায়াত কঠিন সেসব যায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে"

কিন্তু কোকা গাছ জব্দ বা কোকেন ধ্বংস করে পুলিশ চলে গেলেই কৃষকেরা আবার জমিতে কোকো চাষ করেন।

কিন্তু তার কারণ কি। সেটি জিজ্ঞেস করলে এক কৃষক বলছিলেন এর বাইরে আরো কোন কাজ তাদের জানা নেই।

এখানে গড়ে ওঠা এই ব্যবসার উপরই তারা নির্ভরশীল। চাইলেই তারা সরকারের কোকা বিরোধী অভিযানে সম্পৃক্ত হতে পারছেন না।

তিনি বলছেন, "আমরা এর সাথে জড়িত হতে চাই। কোকা উৎপাদনের বিরুদ্ধে আমরাও কাজ করতে চাই। কিন্তু আমাদের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও অন্যান্য সহায়তার ব্যাপারে সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো তা তারা রক্ষা করেনি"

পুলিশ চলে যাওয়ার পর এই কৃষক ও অন্যরা জমিতে ছড়িয়ে থাকা কোকা পাতা যতটুকু সম্ভব তুলে আনার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি না রাখলেও জীবন এখানে থেমে থাকে না।