'কেউ আমাকে দেবী মনে করে, কেউ ভাবে বেশ্যা’

ছবির উৎস, RUDRANI CHETTRI
যখন রাস্তায় কোনও কারণে দাঁড়িয়ে থাকি, আমার ভয় হতে থাকে যে কোনও ছেলে হয়ত শিস দেবে বা জিজ্ঞাসা করবে, 'তোর রেট কত? চল...'
কখনও আবার মনে হয় কেউ আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ চাইবে।
কেউ আমাকে পরিবারের কলঙ্ক বলে, কেউ আবার মনে করে আমি দেবী।
বেশ্যা তো অনেকেই বলে আমাকে।
কিন্তু রুপেশ থেকে রুদ্রাণী হয়ে ওঠায় আমার কোনও লজ্জা নেই।
বাড়িতে আমিই সবার বড় ছিলাম। কিন্তু কখনও আমার শরীর নিয়ে সহজ হতে পারতাম না। নিজেকে মনে হত একটা ছেলের শরীরে যেন বন্দী হয়ে আছি।
আমার হাবভাব সবই মেয়েদের মতো ছিল - সাজতে ভালবাসতাম খুব।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, RUDRANI CHETTRI
ওই শরীরে বন্দী হয়ে থাকাটা আমাকে পাগল করে দিত, কিন্তু আমি কখনও হেরে জেতে চাই নি।
বাড়ির সবার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করেছিলাম বিষয়টা নিয়ে।
আমার সৌভাগ্য যে বাবা-মা আর ভাই সহজেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল, মেনেও নিয়েছিল।
আমাকে স্বাধীনভাবে থাকতে দিয়েছিল ওরা।
তবে সেই স্বাধীনতা শুধু ঘরের চৌহদ্দির ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আমি কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছি। ছেলেদের ইউনিফর্ম পড়েই স্কুলে যেতে হত আমাকে। জামা-প্যান্ট বা জিন্স পড়ে আমি কখনই সহজ হতে পারতাম না।

ছবির উৎস, RUDRANI CHETTRI
দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ওই একই কনভেন্ট স্কুলে পড়েছি। ওখানেও সবাই আমাকে নিয়ে মজা করত, হেনস্থাও হতে হয়েছে।
তাই কলেজে পড়তে যেতে ইচ্ছা করে নি আমার।
এরপর থেকে আমি তাই বাড়িতেই পড়াশোনা করেছি।
যত বড় হতে লাগলাম, ততই ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করলাম। কিন্তু কোনও সময়েই আমার মনের কথা প্রকাশ করে উঠতে পারি নি - সমাজের চোখে আমি তখন নিজেও তো ছেলে! আমার নাম তো তখনও রুপেশ।
শুধু বাড়ির ভেতরে আমি মেয়ে।
এটা নিয়ে আমি সবসময়ে বিচলিত থাকতাম।
সেই সময়েই আমি সেক্স পরিবর্তন করে মেয়ে হয়ে ওঠার কথা সিরিয়াসলি চিন্তাভাবনা করতে শুরু করি।
বাড়ির লোকেদের পাশে পেয়েছিলাম।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আমার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছিলেন। তিনি এটা বুঝতে চেয়েছিলেন যে আমি সত্যিই মেয়ে হয়ে উঠতে চাই কি না।
ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাকে দেখতে তো মেয়েদের মতোই লাগবে, শরীরও হবে মেয়েদেরই মতো, কিন্তু কয়েকটা ব্যাপারে আমি কখনই নারী হয়ে উঠতে পারব না।
চিকিৎসকরা সম্মতি দিয়ে দিয়েছিলেন।

ছবির উৎস, RUDRANI CHETTRI
২০০৭ সালে আমার রূপান্তরের প্রক্রিয়াটা শুরু হল।
ওই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমাকে অনেকগুলো পরীক্ষানিরীক্ষা আর অপারেশন করাতে হয়েছিল। কিন্তু আমার মাথায় একটা জিনিষ ঘুরত - অপারেশনের যে শারীরিক কষ্ট, সেগুলো তো সহ্য করে নেব, কিন্তু তারপরেও কি আমাকে মানুষ রুদ্রাণী বলে মেনে নেবে?
যদি মেনে না নেয়, তাহলে?
বন্ধুদের সঙ্গে পেয়েছিলাম ওই সময়ে। অনেক লোক আমার চেহারা নিয়ে মজা করত, আমি গোঁড়ার দিকে মুষড়ে পড়তাম। কিন্তু তারপরে আমি একটা চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিলাম ব্যাপারটাকে।
ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বাড়াতে লাগলাম। পরিচিতি বাড়তে লাগল। আমি রূপান্তর-কামী নারী এটা জানার পরে ধীরে ধীরে মডেলিংয়ের অফার পেতে শুরু করলাম। অভিনয়ও শুরু করি তখন থেকেই।
বিদেশ থেকেও মডেলিংয়ের অফার পেতে শুরু করলাম।
এখন ছোট হলেও আমার নিজের একটা বাড়ি আছে। নিজের হাতে সাজিয়েছি ঘরটা।

ছবির উৎস, Image Copyrights RUDRANI CHETTRI
আজ রুদ্রাণী নিজের পরিচয়েই পরিচিত হয়েছে। সমাজ থেকেও সম্মান পাই। লোকে আমার ব্যবহার পছন্দ করে।
একটা মডেলিং এজেন্সি চালাই আমি - আমার মতো অন্যান্যদের সাহায্য করার চেষ্টা করি ওটার মাধ্যমে।
তবে একটা বিষয় অধরাই থেকে গেছে - সেক্স বদল করার পরেও। এ ব্যাপারটা আমাকে সবসময়ে নাড়া দেয়।
আমার জীবনে অনেকে আসে, আর চলে যায়। কেউ আমার জীবনসঙ্গী হতে চায় না।
কারণ আমি নারী হয়ে উঠলেও কখনও মা হতে পারব না।
আরো পড়তে পারেন:








