ইউরোপের সেই ক্যাম-গার্লদের গল্প

স্টুডিওতে বসে রয়েছেন লানা
ছবির ক্যাপশান, স্টুডিওতে বসে রয়েছেন লানা

সারাবিশ্বেই ওয়েব ক্যাম বা কম্পিউটারে সংযুক্ত ক্যামেরার মাধ্যমে যৌনতা ব্যবসা দিনে দিনে বড় হয়ে উঠছে। তবে এটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে রোমানিয়ায়। সেখানে এটি পুরোদমে একটি যেন শিল্প হিসাবে গড়ে উঠেছে।

সেখানে হাজার হাজার নারী ক্যাম-গার্ল হিসাবে হিসাবে কাজ করছেন, যারা বাড়ি বা স্টুডিওতে বসে এই কাজ করেন।

প্রায় ২৪ ঘণ্টা ব্যাপী এই মার্কেটের বেশিরভাগ ক্রেতাই উত্তর আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপের।

এরকম একটি প্রতিষ্ঠান, স্টুডিও২০তে গিয়েছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা। এই প্রতিষ্ঠানটির রুমানিয়াতেই নয়টি শাখা রয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

বুখারেস্টের একটি বহুতল ভবনের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন বেশ কয়েকজন তরুণী। তারা হাসছেন, কথা বলছেন। এই ভোরের বেলাতেও তাদের মুখে কড়া মেকআপ।

ভবনটির নিচতলার দুইটি ফ্লোর নিয়ে স্টুডিও ২০ এর অফিস। ভেতরে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট কক্ষ রয়েছে, যেগুলো কড়া রঙে সাজানো। ভেতরে সুন্দর করে সাজানো বিছানা, টেবিল আর সোফা রয়েছে। এখানে রুম বন্ধ থাকা মানে, ভেতরে ব্যবসা অর্থাৎ সরাসরি সম্প্রচার চলছে।

সম্প্রচারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন একজন ক্যাম-গার্ল

ছবির উৎস, LORENZO MACCOTTA

ছবির ক্যাপশান, সম্প্রচারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন একজন ক্যাম-গার্ল

ভার্চুয়াল সম্পর্ক আর সাইবার সেক্সের এই দুনিয়ায় এই মেয়েরা মডেল আর তাদের সামনে, ইন্টারনেটের অপর প্রান্তে যিনি বসে আছেন, তিনি মেম্বার বা সদস্য।

রুমের এক প্রান্তে একটি বিশাল কম্পিউটার স্ত্রীন। একটি শক্তিশালী ক্যামেরা আর পেশাদারি ক্যামেরা লাইট। এরকম একটি রুমে বসে ছিলেন লানা, প্রাপ্তবয়স্কদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হয়তো শত শত চোখ এখন তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।

লানা বলছেন, এভাবে দেখলেও তার কোন আয় হবে না, যতক্ষণ না কোন গ্রাহক তাকে গো প্রাইভেট বা ব্যক্তিগতভাবে তাকে দেখতে চাইবে।

প্রতিদিন আটঘণ্টার লানাকে কাজ করতে হয়। এতে তার মাসিক আয় হয় প্রায় ৪ হাজার ইউরো, যা রোমানিয়ার গড় আয়ের প্রায় ১০ গুণ। পাশাপাশি তার নিয়োগকারী স্টুডিও ২০ আয় করে মাসে একই পরিমাণ ইউরো। আর যে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ফি আদায় করে, তারা আয় করে এর দ্বিগুণ, মাসে প্রায় ৮ হাজার ইউরো।

স্টুডিওর একটি ঘরের দৃশ্য

ছবির উৎস, LORENZO MACCOTTA

ছবির ক্যাপশান, স্টুডিওর একটি ঘরের দৃশ্য

লানা যে ওয়েবসাইটের জন্য কাজ করেন, সেখানে প্রতিদিন তিন থেকে চার কোটি সদস্য ভিজিট করে। একই সময়ে সেখানে অন্তত কুড়ি হাজার গ্রাহক থাকে। ফলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ওয়েবক্যাম যৌনতার এই দুনিয়ায় ২০১৬ সালে ব্যবসা হয়েছে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার।

গ্রাজুয়েশনের পর একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন লানা। কিন্তু রোমানিয়ার অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তিনি এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। প্রথম দিনের কথা তার এখনো মনে আছে।

আমি রুমে একাই ছিলাম, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, শত শত চোখ যেন আমার চারদিকে ঘুরছে। আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছিলাম না, তারা কি বলছে, তারা কি চাইছে। এটা ছিল একটা ভীতিকর ব্যাপার। আস্তে আস্তে আমি বুঝতে শিখলাম, কোন কোন ব্যক্তি একজন সম্ভাব্য গ্রাহক হয়ে উঠতে পারে। বলছেন লানা।

মডেলদের উৎসাহ দেয়া হয়, তারা যেন গ্রাহকদের প্রতিদিন ম্যাসেজ পাঠায়
ছবির ক্যাপশান, মডেলদের উৎসাহ দেয়া হয়, তারা যেন গ্রাহকদের প্রতিদিন ম্যাসেজ পাঠায়

কিন্তু ব্যক্তিগত সেই সময়গুলোতে আসলে কি ঘটে?

লানা বলছেন, বেশিরভাগই আলাপচারিতা। কখনো কখনো আমাকে কিছু ভূমিকা রাখতে হয়। তবে খুব কম সময়ে নগ্ন হওয়া বা যৌনতার ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, একজন পেয়িং গ্রাহককে যতক্ষণ সম্ভব অনলাইনে ধরে রাখা।

এই মেয়েদের জন্য প্রশিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী আর ইংলিশ শিক্ষকও নিয়োগ দিয়ে রেখেছে স্টুডিও২০ কর্তৃপক্ষ।

এমনকি মেয়েদের ভৌগলিক প্রশিক্ষণও দেয়া হয়, যাতে বিশ্বের যেকোনো এলাকার গ্রাহকের সঙ্গেই তারা তাদের সেখানকার বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে।

স্টুডিও২০ ভেতরের ছবি
ছবির ক্যাপশান, স্টুডিও২০ ভেতরের ছবি

ইংরেজি প্রশিক্ষক আন্দ্রেয়া বলছেন, মানুষ যেমনটা মনে করে, এটা তেমন শুধুমাত্র যৌনতার ব্যবসা নয়। একজন মডেলকে অনলাইনে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়।

তবে শুধু মেয়েরা নয়, সমকামীদের জন্য স্টুডিও২০র পুরুষ শাখাও রয়েছে।

রুমানিয়ার বাইরে তাদের শাখা রয়েছে কলম্বিয়ার ক্যালে, বুদাপেস্ট আর লস অ্যাঞ্জেলসে।

তবে সব মডেল যে স্টুডিওতে এসে কাজ করেন তা নয়। অনেকে তাদের বাড়িতে বসেও ওয়েবক্যামে কাজ করেন। তবে তাদের মাসিক কোন বেতন নেই। প্রতিদিন যতটা কাজ করবে, সেই অনুযায়ী বেতন পাবেন।

বিবিসি বাংলার আরো খবর: