'ক্যান্সার হবার পর থেকে সংসার বলতে কিছুই নাই'

    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালে এসেছেন এস এম মুসলিম। পেশায় গাড়ি চালক। চোখের নিচে তার কালি পড়ে গেছে।

অসুস্থ স্ত্রীর মতোই তাকেও যেন অসুস্থই দেখাচ্ছে। বলছিলেন, দু বছর আগে যখন স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসার স্তন ক্যান্সারের খবর জানলেন - তখন পরিবারে যেন এক দুর্যোগ নেমে এলো।

"ক্যান্সার আমাদের মতো পরিবারের জন্য একটা বিরাট ধাক্কা তেমন পয়সা নাই। কি করি, সেই দু:শ্চিন্তা। আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম"।

এসব কথা বলতে গিয়ে গলা বুঁজে গিয়েছিলো এই মানুষটির। তিনি বলছেন, স্ত্রীর ক্যান্সার হওয়ার পর থেকে তার পরিবারের বাকি সব কিছুই যেন থমকে গেছে। "উনি অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আমারা পরিবারের সব কিছু থেমে গেছে। এই যে চিকিৎসা করাইতে ঢাকায় আসছি, ঘরে তালা। আমার সংসার বলতে কিছুই নাই"

বলা হয় ক্যান্সার এমনি একটি রোগ - যা যে কোন পরিবারের উপর ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনে।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম মানসিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর শুরু হয় আসল সংগ্রাম।

অর্থের জন্য সংগ্রাম করতে হয় কোনো কোনো পরিবারকে। কিন্তু শুধু আর্থিক বিষয় নয় - একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর দীর্ঘ দিনের সেবা, ডাক্তারের কাছে ছুটোছুটি - অনেক পরিবারেই সকল কর্মকাণ্ডে ছেদ তৈরি করে।

বাংলাদেশে শুধু ক্যান্সার বিশেষায়িত চিকিৎসার হাসপাতাল আছে চারটি। কয়েকটি বেসরকারি ও কিছু বড় সরকারী হাসপাতালে একটি করে ক্যান্সার ইউনিট থাকলেও দেশটিতে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোটে ১২০ জনের মতো।

চিকিৎসার জন্য তাই বেশিরভাগ মানুষকে ক'দিন পরপরই বড় শহরেই দৌড়াতে হয়।

নোয়াখালীর চাটখিলের কবির হোসেনের পরিবার তার বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এভাবেই ছুটছেন পাঁচ বছর যাবত। তিনি মূত্রাশয়ের ক্যান্সারে ভুগছেন। মি. হোসেন বলছেন, পরিবারের সকল অর্থ, শ্রম, আবেগ আর মনোবল যেন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই ঘুরছে।

"আমি দেশের বাইরে থাকি - তাই সব ছোটাছুটি আমার স্ত্রীকেই করতে হয়। ক'দিন পর পর ঢাকায় আসতে হয়। আত্মীয় স্বজনদের বোঝে-শোনে এমন কাউকে আনতে গেলে টাকা পয়সা দিতে হয়। অনেকে আবার আসতেও চায়না। চব্বিশ ঘণ্টাই মনের মধ্যে দু:শ্চিন্তা আব্বাকে নিয়ে"

তিনি আরো বলছেন,"অসুস্থ বাবা ব্যথায় মাঝে মাঝেই কাউকে চিনতে পারেন না। যারা সেবা করতে যান তাদের গালাগাল করেন। এটা দেখা খুবই কষ্টের"

কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীকে নিয়ে একটি পরিবারকে যে বিষয়ে সবচাইতে বেশি সংগ্রাম করতে হয়, সেটি হলো - অর্থের যোগান।

এ ক্ষেত্রে ধনী ও দরিদ্রের অভিজ্ঞতা হয়ত ভিন্ন। তবে কবির হোসেন বলছেন, তার নিজের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

তিনি বলছেন, "প্রথম অবস্থায় দশ বারো লাখ টাকা চলে গেলো। কিছুদিন পর এরকম কয়েক লাখ টাকা করে দিতে দিতে তিরিশ লাখের উপরে খরচ হয়েছে। আমি দীর্ঘ ১৪ বছর বিদেশে থাকি। কাজ করে যে টাকা কামাই হয়েছে তার পুরোটা আব্বার পেছনে খরচ হয়ে গেছে। সংসারের জন্য কিছু যে করবো বা একটু জমাবো - তা আর সম্ভব হয়নি"

কবির হোসেন ও তার ভাইয়েরা বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে পারে বলে তার বাবার চিকিৎসা পাঁচ বছর ধরে চলছে। কিন্তু অনেককে জমি, গয়না বেচতে হয়। পরিবারের সহায় সম্বল খোয়াতে হয়। আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডা নাহিদ সুলতানা বলছেন, অনেক সময় অর্থের অভাবেই অনেক রোগী সেরে ওঠার আগেই ঝরে পড়ে।

"অনেক ক্ষেত্রে যতবার কেমো দেয়ার দরকার ততবার না দিয়ে তারা চলে যাচ্ছে। এর পর দেখা যায় আবার সমস্যা বাড়লে তারা আসছে ।"

ডা সুলতানা বলছেন, কিভাবে একজন ক্যান্সার রোগীর সেবা করতে হয় তার জন্য পরিবারের মানসিক প্রস্তুতির দরকার হয়।

"তাছাড়া পরিবারের একজন প্রিয়জনকে ভুগতে দেখে তাদের যে মানসিক কষ্ট হয় - তা সামাল দিতে রোগী সহ পুরো পরিবারের মানসিক কাউন্সেলিং দরকার। কিন্তু সেটি বাংলাদেশে তেমন নেই।"

চিকিৎসকরা বলছেন বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে মুখ, নাক, কান, গলা ও ফুসফুসে ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি আর মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ও জরায়ু মুখের ক্যান্সার।

প্রাধান্য যেটিরই বেশি হোক না কেন - রোগীর কষ্ট আর পরিবারের সংগ্রামের যায়গায় হেরফের, হয়ত তেমন নেই।