গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দিনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

ছবির উৎস, focus bangla
- Author, আকবর হোসেন
- Role, প্রযোজক, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
২০০৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ আমাকে টেলিফোন করে বললেন বিডিআরের সদরদপ্তরে গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছেন । বিষয়টা কী হতে পারে তিনি আমার কাছে জানতে চান। আমি সেই অধ্যাপককে সুনিদ্দির্ষ্ট কোন তথ্য দিতে পারি নি। টেলিফোন ছাড়ার পর আমি বিডিআর সদরপ্তরের একটি স্কুলে অধ্যয়নরত আমার পরিচিত একজন ছাত্রের অভিভাবকের সাথে কথা বলি। তিনি আমাকে জানালেন প্রায় এক ঘন্টা ধরে এই গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছেন এবং ভেতরে কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
এরপর সাথে সাথে আমি বাসা থেকে বিডিআর সদর দপ্তরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাই। মিরপুর রোড দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখনই ঘটনার অস্বাভাবিকতা অনুমান করতে পারি। কারণ রাস্তায় দেখি সেনা কনভয় বিডিআর সদর দপ্তরের দিকে যাচ্ছে। ঢাকা নিউমার্কেট এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে দেখি পুলিশ , র্যাব এবং সেনাবাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে । এরই মধ্যে ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলা থেকে স্থানীয় সাংবাদিকদের মারফত জানতে পারি সেখানে বিডিআর সদস্যরা বিদ্রোহ করেছে।
বিডিআর সদর দপ্তর থেকে বেশ খানিকটা দুরত্বে নীলক্ষেত এলাকায় কয়েকঘন্টা অবস্থানের পর অফিসে ফিরে আসি। পিলখানার ভেতরে যে বিদ্রোহ হয়েছে সেটি তখন অনেকের কাছেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। একদিকে সরকারের নানা তৎপরতা, অন্যদিকে স্থানীয় টেলিভিশনে বিডিআর সদস্যদের বক্তব্য প্রচার - সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তখন বেশ উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। একই সাথে ঢাকা সেসময় গুজবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

ছবির উৎস, focus bangla
নানা জনের কাছ থেকে নানা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল । কেউ বলছে পিলখানার ভেতরে ১০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে, কেউ বলছে এখনও যারা ভিতরে আছেন তাদেরও মেরে ফেলা হবে। সরকারের কোন কোন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে ধারণা দিচ্ছিলেন ঢাকায় কারফিউ দিয়ে পিলখানার ভেতরে সামরিক অভিযান চালানো হবে। এছাড়া আরও নানা কথা।
এরই মধ্যে দুপুর নাগাদ সম্পাদক সাবির মুস্তাফা আমাকে জানালেন যে আজ বিবিসি বাংলার সন্ধ্যে বেলার অনুষ্ঠান প্রবাহ এবং রাতের অনুষ্ঠান পরিক্রমা ঢাকা স্টুডিও থেকে উপস্থাপন করা হবে। আর সেটি করতে হবে আমাকেই । এর আগে আমি কখনও পুরো অনুষ্ঠান উপস্থাপন করিনি। বিডিআর বিদ্রোহের মতো দিনে, এত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠান উপস্থাপনার বিষয়টি আমার মধ্যে এক ধরনের চাপ তৈরি করেছিল। এরই মধ্যে দিনের প্রধান সম্পাদকীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো যে মৃতের সংখ্যা নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম যেটাই বলুক না কেন আমরা ততটুকুই প্রচার করব যতটা আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে, যেটি বিবিসি সবসময়ই করে।
সেদিন প্রবাহ অনুষ্ঠানে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে সহকর্মী কাদির কল্লোলের দেয়া সরাসরি ঘটনার বিবরণ, কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটল এবং এর প্রভাব কী হতে পারে সেটি নিয়ে সরাসরি বিশ্লেষণ এবং পিলখানার ভেতরে থাকা একজন বিডিআর সদস্যের টেলিফোনে নেয়া সাক্ষাৎকার অনেকের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল। বিবিসি বাংলায় প্রচারিত এসব সাক্ষাৎকার পরদিন দেশি বিদেশি কয়েকটি গণমাধ্যমে বিবিসির বরাত দিয়ে ছাপা হয়।

ছবির উৎস, focus bangla
২৫ শে ফ্রেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলার প্রবাহ এবং পরিক্রমা অনুষ্ঠানের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই ছিল সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং বিবরণ। প্রতিমুহুর্তে ঘটনা এমনভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল তার সাথে তাল মিলিয়ে অনুষ্ঠানে তৈরি করাটা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ । তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে একদিকে গুজব এবং অন্যদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমের দেয়া তথ্য – এই দুইয়ের মাঝখানে বিবিসি বাংলা কখনোই অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়নি, যে বিষয়টি বিবিসি বাংলার শ্রোতা এবং ঢাকার বুদ্ধিজীবি মহল এবং সরকারের অনেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাঝে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিডিআর বিদ্রোহের সময় দিনের প্রথমভাগে ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এবং সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করা আমার জন্য এক বিরাট অভিজ্ঞতা । প্রতি মুহুর্তে যে ঘটনার নানা তথ্য আসছিল সেসময় কীভাবে সঠিক সংবাদ পরিবেশন করা যায় এবং তা উপস্থাপনা করা যায় আমার জন্য তার এক বড় পরীক্ষা ছিল ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০০৮ । বিবিসি বাংলার সেদিনের অনুষ্ঠান যে অনেকের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে তার প্রমাণও মিলেছে পরবর্তীতে। এর স্বীকৃতি হিসেবে সমগ্র বিবিসিতে Global Reith Award- এর ‘Breaking News Category- তে পুরস্কৃত হয়েছে বিবিসি বাংলা।








