গভীর রাতে সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীকে ডিবি পুলিশের তুলে নেওয়ার ঘটনায় কী জানা যাচ্ছে

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে রাত ১২টার দিকে তুলে নেওয়া হয় বাসা থেকে। আসামির খাতায় নাম লিখিয়ে মোবাইল জব্দ করে, পরনের জুতা-বেল্ট খুলে রাখা হয় গারদে। প্রায় ১০ ঘণ্টা হেফাজতে রাখার পর সকালে আবারও পৌঁছে দেওয়া হয় বাসায়।

এভাবেই নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন সাংবাদিক ও একটি সংগঠনের মিডিয়া পরামর্শক মিজানুর রহমান সোহেল।

বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, কেন বা কোন অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়েছিল সে বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না তার।

মূলত বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ বা এমবিসিবি নামে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠনের এক কর্মসূচির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল মি. সোহেলের পিআর প্রতিষ্ঠান।

তিনি বলছেন, "রাতে ডিবির লোক এসে আমাকে বলে ডিবি প্রধান আমার সঙ্গে কথা বলতে চান, আমাকে নিয়ে যাবে আবার দিয়েও যাবে। তবে কী কারণে বা কী কথা বলবেন এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না"।

"আমি ছাড়া সংগঠনটির নেতা আবু সাঈদ পিয়াসকেও ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়," জানান তিনি।

বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ বা এমবিসিবি'র সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকে রাত ১টার দিকে তার মিরপুরের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় বলে সাংবাদিকদের জানান তার স্ত্রী।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মি. পিয়াস হেফাজতেই ছিলেন।

এদিকে মি. সোহেল দাবি করছেন, কেন বা কোন অভিযোগে তাকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল রাতে এ বিষয়ে তাকে কিছু জানানো হয়নি।

সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে তাকে হেফাজতে নেওয়ার পেছনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন মি. সোহেল। এই অভিযোগ নিয়েও তৈরি হয়েছে আলোচনা।

গোয়েন্দা পুলিশ অবশ্য বলছে, তথ্যগত ভুল বোঝাবুঝির কারণে সাংবাদিক সোহেলকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে সকালেই তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।

তবে এই ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকেই। তাদের প্রশ্ন, 'ভুল করে' যে কাউকে তুলে নেওয়া অতীতের ঘটনাক্রমের পুনরাবৃত্তি কি না।

'একজন বিশেষ সহকারীর ইশারায় ঘটানো হয়েছে' এমন অভিযোগ নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যেখানে অভিযোগের তীর প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দিকে।

যদিও তাকে জড়িয়ে "একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভিত্তিহীন প্রচারণা চালাচ্ছে" বলে দাবি করেছেন মি. তৈয়্যব। তার দাবি, অবৈধ ফোন আমদানিকারকরা এনইআইআর বন্ধ করতে এবং বৈধ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এদিকে, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে মোবাইল ফোন বিক্রির দোকান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ বা এমবিসিবি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানি, চোরাচালান, চুরি, জালিয়াতি এবং শুল্ক ফাঁকি রোধে সম্প্রতি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর চালুর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি।

যার মাধ্যমে আগামী ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব মোবাইল ফোন নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের।

এই ঘোষণার পর থেকেই সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে। অনেকে এই পদক্ষেপকে ব্যাক্তিস্বাধীনতা হরণ এবং সরকারের ডিজিটাল নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

এছাড়া মোবাইল হ্যান্ডসেট খাতে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে মনোপলি বা একক সুবিধা দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ।

পাল্টাপাল্টি এমন অবস্থানের মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে গণমাধ্যমকর্মী ও জনসংযোগের কাজে যুক্ত মিজানুর রহমান সোহেলকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনা। বুধবার সকালে মি. সোহেলকে আবারও তার বাসায় দিয়ে আসে গোয়েন্দা পুলিশ।

মি. সোহেল বিবিসি বাংলাকে জানান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ নামে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠনের হয়ে মিডিয়া ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ছিল তার প্রতিষ্ঠান টাইমস পিআর।

তার দাবি, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতেই তাকে এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদককে গভীর রাতে হেফাজতে নিয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "এনইআইআর বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাত্র নয়জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারাদেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। এর মাধ্যমে একজন বিশেষ সহকারী (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) তার স্কুল বন্ধুকে ব্যবসায়ীকভাবে লাভবান করারও চেষ্টা করছেন," বলেও দাবি মি. সোহেলের।

গোয়েন্দা পুলিশ অবশ্য বলছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই সংগঠনটির নেতা মি. পিয়াসকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে সাংবাদিক সোহেলকে তথ্যগত ভুলের কারণে তুলে আনা হয়েছিল বলেও দাবি ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলামের।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, মোবাইল ফোন বিক্রেতাদের সংগঠনটি সংবাদ সম্মেলনের জন্য যে বিজ্ঞপ্তি তৈরি করেছিলেন সেখানে সভাপতির নামের পরে মি. সোহেলের প্রতিষ্ঠানের নাম ও ফোন নম্বর থাকায় তাকে আনা হয়েছিল। পরে তাকে আবার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মি. ইসলাম বলছেন, "যেহেতু আমরা এই অর্গানাইজেশন সম্পর্কে কিছু জানি না, তাদের সম্পর্কে জানতেই সংগঠনের সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি আমরা"।

সংগঠনটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না জানতে চাইলে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আছে কিছু কোয়ারিস"।

তবে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদককে কেন হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বা কখন তাকে আদালতে তোলা হবে, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

বিশেষ সহকারী যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন

এই ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে ঘিরে নানা আলোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যমে।

তার নাম উল্লেখ না করলেও "একজন বিশেষ সহকারীর ইশারায়" এগুলো করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক মি. সোহেল। এছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সমিতির নেতারাও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।

এমন প্রেক্ষাপটে মি. তৈয়ব্যের পক্ষে একটি বার্তা গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। যেখানে দাবি করা হয়েছে, "এনইআইআর বাস্তবায়নের সঙ্গে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে জড়িয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে সত্যের অপলাপ করা হয়েছে"।

এছাড়া নিজের ফেসবুক পেজেও একটি পোস্ট দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

যেখান তিনি দাবি করেছেন, একজন সাংবাদিককে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় তাকে জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ওই সাংবাদিককে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেছেন মি. তৈয়্যব।

তিনি বলছেন, মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ নামের সংগঠনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিওটিতে নিবন্ধিত নয়। "অবৈধ আমদানিকারক চক্রই নতুন সংগঠন বানিয়ে এনইআইআর বিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে" বলেও দাবি করেন তিনি।

এছাড়া সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মি. তৈয়্যব। বলেছেন, "একজন সাংবাদিক কীভাবে একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের 'সভাপতি' পরিচয়ে ভুয়া টাইটেল, ভুয়া পরিচয় ও নিজের ফোন নম্বর ব্যবহার করে স্মাগলিং-অভিযুক্ত গোষ্ঠীর হয়ে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন?"

গোয়েন্দা পুলিশের ভূমিকায় সমালোচনা

সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেল এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকে গভীর রাতে তাদের বাসা থেকে গোয়েন্দা হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় নানা সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ব্যবসায়ী মি. পিয়াসের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে মোবাইল ফোন বিক্রির দোকান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ বা এমবিসিবি।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি পিয়াসকে আজকের মধ্যে মুক্তি না দিলে সারা দেশে কঠোর আন্দোলনে নামবেন তারা।

গভীর রাতে গ্রেফতারের এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন অনেকেই।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, কারো বিরুদ্ধে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ থাকলে তার সঙ্গে কথা বলা বা জিজ্ঞাসাবাদ করা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু রাতের গভীরে কাউকে বাসা থেকে নিয়ে যেতে হবে সাধারণ বিবেচনায় এটা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

"এই ধরনের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অতীতে যে অভিযোগ ও সমালোচনা ছিল এগুলো দেখলে তারই পুনরাবৃত্তি কি না এমন প্রশ্ন সামনে আসে। এগুলো সামনে এলে পুরোনো ধরনের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় যার বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছিল," বলেন তিনি।

মি. হক বলছেন, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এমন কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ ঠিক হবে না যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আবারও বিতর্কিত হয়।