সুইজারল্যান্ডে বারে বিস্ফোরণের পর নিখোঁজ তরুণদের হন্যে হয়ে খুঁজছে স্বজনরা

ওই ঘটনায় এখনো নিঁখোজ অনেকেই

ছবির উৎস, Supplied

সুইজারল্যান্ডের স্কি রিসোর্টে একটি বারে অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ তরুণদের পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। প্রিয়জনদের খোঁজ পেতে তারা অনলাইনে তথ্য চেয়ে আবেদনও জানিয়েছে।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে সুইস কর্মকর্তারা জানান, জনপ্রিয় স্কি রিসোর্ট ক্রঁ-মন্তানা'য় বারে আগুনের সূত্রপাত সম্ভবত শ্যাম্পেনের বোতলের ওপর রাখা ফোয়ারা মোমবাতি থেকেই। সেগুলো ছাদের খুব কাছে চলে যাওয়ায় আগুন ধরে গেছে বলে তাদের ধারণা।

ভ্যালাইসের অ্যাটর্নি জেনারেল বিয়াত্রিস পিলো বলেন, অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত উপকরণ, বারের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ধারণক্ষমতা এবং ঘটনার সময় ভেতরে কতজন মানুষ ছিল, এর সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সুইস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের শনাক্ত করতে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।

আগুনে ৪০ জন নিহত এবং আরও ১১৯ জন আহত হয়েছেন। কর্মকর্তারা বলেন, আহতদের মধ্যে ১১৩ জনকে শনাক্ত করা গেছে, বাকি ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।

এদিকে, ঘটনার দিন রাতে বারে উপস্থিত ছিলেন—এমন প্রিয়জনদের সম্পর্কে যে কোনো তথ্য পেতে পরিবার ও বন্ধুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন জানাচ্ছেন।

১৬ বছর বয়সী সুইস নাগরিক আর্থার ব্রডার্ডের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি বলে জানিয়েছেন তার মা লায়েটিসিয়া।

তিনি বিবিসিকে বলেন, "আমার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩০ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এখনো তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই"।

লায়েটিসিয়া আরও বলেন, তিনি চান তার ছেলে আর্থারের ছবি সবখানে ছড়িয়ে পড়ুক। যাতে কেউ যদি চিনতে পারে। এবং তার খোঁজ মিললে তার মা কে যেন ফোনে জানাতে পারে।

তিনি জানান, তিনি ও তার স্বামী লোজান বিভিন্ন হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটগুলোতে গিয়ে ব্যাকুল হয়ে সন্তানকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও ছেলেকে পাননি। এর আগে স্থানীয় পত্রিকায় তিনি বলেছেন, তার প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে।

ওই পত্রিকাকে তিনি আরও জানান, আর্থারের কয়েকজন বন্ধুকে পাওয়া গেছে, যাদের শরীরের প্রায় অর্ধেক অংশই পুড়ে গেছে।

"এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, ওরা নরক যন্ত্রণা পেরিয়ে এসেছে," বলেন তিনি।

এ নিয়ে আরো পড়তে পারেন
নিখোঁজদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী সুইস নাগরিক আর্থার ব্রডার্ডও রয়েছেন

ছবির উৎস, Laetitia Brodard-Sitre/Facebook

ছবির ক্যাপশান, নিখোঁজদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী সুইস নাগরিক আর্থার ব্রডার্ডও রয়েছেন
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

নিখোঁজ আরেকজন কিশোর ১৬ বছর বয়সী ইতালীয় নাগরিক আচিল ওসভালদো জিওভান্নি বারোসি। নববর্ষের দিনে স্থানীয় সময় রাত দেড়টার দিকে নিজের জ্যাকেট ও মোবাইল ফোন নিতে সে ওই বারে ঢুকেছিল। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

"আমরা জানি না সে এখনো বেঁচে আছে কি না," তার খালা ফ্রান্সেসকা বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এক অনুষ্ঠানে জানান।

তিনি জানান, মিলানের একটি আর্ট স্কুলে পড়ুয়া তার ভাতিজা ছিল চমৎকার মনের মানুষ। একই সাথে সে ছিল একজন অসাধারণ চিত্র শিল্পী।

তিনি বলেন, "আমরা শুধু তার সন্ধান চাই। এর বাইরে আমাদের আর কিছু চাওয়ার নাই"।

ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে এখন পর্যন্ত, তাদের দেশের ছয়জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছে ১৬ বছর বয়সী জুনিয়র গলফার এমানুয়েল গালেপিনি। মূলত জেনোয়া থেকে আসা এই তরুণ বর্তমানে দুবাইয়ে বসবাস করছিল।

ইতালিয়ান গলফ ফেডারেশন জানিয়েছে, গালেপিনি মারা গেছে। তবে তারা আগুনের কথা উল্লেখ না করে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছে, তিনি ছিলেন "এক তরুণ অ্যাথলেট, যার মধ্যে ছিল আবেগ ও সত্যিকারের মূল্যবোধ"।

তার বাবা এদোয়ার্দোকে উদ্ধৃত করে ইতালির টেলিভিশন চ্যানেল টিজি২৪ জানিয়েছে, তার ছেলে তখন বারে ছিল এবং শেষবার তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল মধ্যরাতের দিকে।

ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা এখনো মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করছে না।

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছে ১৬ বছরের জিওভান্নি তামবুরি। তার মা কার্লা মাসিয়েলো, যিনি বলোনিয়া থেকে এসেছেন, লা রিপাবলিককে বলেছেন, জিওভান্নি তামবুরি তার বাবার সঙ্গে ছুটি কাটাচ্ছিল। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত লা কনস্টেলেশনে পৌঁছায়।

দুর্ঘটনার সময় অ্যালিস ক্যালার্গিসও ওই বারে ছিলেন

ছবির উৎস, Supplied

ছবির ক্যাপশান, দুর্ঘটনার সময় অ্যালিস ক্যালার্গিসও ওই বারে ছিলেন

"তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে বলেছে, আগুন লাগার পর তারা পালিয়ে যায় এবং তার (জিওভান্নির) কাছে ফোন ছিল, কিন্তু একসময় আর তাকে দেখতে পায়নি," তিনি সংবাদপত্রকে বলেন। তিনি আরও জানান, তার গলায় ম্যাডোনার ছোটো প্রতিকৃতিসহ সোনার একটি চেইন ছিল।

তার শিক্ষকদের একজন, তানিয়া কাউসিও, যিনি পোর্তা সারাগোজা হাই স্কুলে পড়ান, লা রিপুবলিকাকে বলেন, "তার সৌজন্য ও হাসি আমাকে সবসময় মুগ্ধ করেছে, সঙ্গে ছিল অসাধারণ পরিপক্বতা। আমি যখনই ক্লাসে ঢুকতাম, সে জিজ্ঞেস করতো আমার জন্য কফি নিয়ে আসবে কি না"।

এমিলি প্রালংয়ের বয়স ২২ বছর যিনি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে লা কনস্টেলেশনে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকেও পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ হিসেবে জানানো হয়েছে। তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরাও নিখোঁজ থাকতে পারেন।

তার দাদা পিয়েরে তথ্যের জন্য অপেক্ষাকে 'যন্ত্রণাদায়ক' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ফরাসি সম্প্রচার মাধ্যম বিএফএমটিভিকে বলেছেন, "আমরা সবসময় আশার মধ্যে থাকি, এটি যেকোনো কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে"।

এমিলিকে হয়তো হাসপাতালে তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি, একইসঙ্গে বলেন, "আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে আরও কঠিন পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার জন্য। স্বপ্ন দেখলে চলবে না, এমন এক ট্র্যাজেডির মুখে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে"।

গ্রিস ও সুইজারল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে অ্যালিস কালারজিসের। তবে সে স্থায়ীভাবে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করছিল। গ্রিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও অন্যান্য সূত্রে বলা হয়েছে, নববর্ষের রাতে ওই বারে ছিল সে।

তার ভাই ইনস্টাগ্রামে একটি আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে পরিবারটির কাছে ১৫ বছর বয়সী অ্যালিস বা তার সঙ্গে থাকা তিন বন্ধুর বিষয়ে 'কোনও খবর' নেই। তাদেরও নিখোঁজ হিসেবে জানানো হয়েছে।

গ্রিসের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে।