মেয়ের 'মৃত' ধর্ষককে যেভাবে খুঁজে বের করলেন বিহারের এক মা

মেয়ের ধর্ষককে শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর মা।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, মেয়ের ধর্ষককে শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর মা।

গত বছর ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারে এক নারীকে জানানো হয় যে তার মেয়ের ধর্ষক মারা গেছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলাটি খারিজ হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি এই দাবি বিশ্বাস করেননি এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর পথ ধরে তিনি প্রকৃত সত্য উদঘাটন করেন, যার ফলে মামলাটি আবার পুনরায় চালু হয়। শেষ পর্যন্ত তার মেয়ে ন্যায়বিচার পায়।

বিবিসির সৌতিক বিশ্বাস এক মায়ের অধ্যবসায়ের সেই অসাধারণ গল্পটি তুলে ধরেছেন।

গত বছর সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকালে, ভারতের পবিত্রতম নদী গঙ্গার তীরে এক শ্মশান ঘাটে দু’ব্যক্তি হাজির হয়।

তারা সেখানে গিয়েছিল এক হিন্দু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পালন করতে। তারা চিতার জন্য লাকড়ি বয়ে আনছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাদের সাথে ছিল না কোন মৃতদেহ।

তারা শ্মশানে পৌঁছানোর পর ঘটনা অদ্ভুত মোড় নেয়।

মৃত্যুর নাটক

ঐ লোকেরা একটি চিতা তৈরি করে। তারপর তাদের মধ্যে একজন চিতার ওপর শুয়ে পড়ে। নিজেকে সাদা কাফনে ঢেকে চোখ বন্ধ করে রাখে। অন্য ব্যক্তি তার ওপর আরও কিছু লাকড়ি স্তূপ করে যতক্ষণ পর্যন্ত সারা দেহ ঢেকে গিয়ে শুধু প্রথম ব্যক্তির মুখটি দেখা যায়।

এর পর এই দৃশ্যের দুটি ছবি তোলা হয়। কে বা কারা ছবি তুলেছিল বা তৃতীয় কোন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিল কি না তা স্পষ্ট নয়।

‘মৃত’ এই লোকটির নাম নীরজ মোদী। ৩৯-বছর বয়সী এই লোক সরকারি স্কুলের একজন শিক্ষক। তার সাথে অন্য লোকটি ছিল তার বাবা রাজারাম মোদী। ৬০-বছরেরও বেশি শুকনো পাতলা এক কৃষক।

এরপর রাজারাম মোদী একজন আইনজীবীকে সাথে নিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে এক আদালতে যান এবং একটি হলফনামা পেশ করেন যে তার ছেলে নীরজ মোদী ২৭শে ফেব্রুয়ারি তাদের গ্রামের বাড়িতে মারা গেছে। হলফনামার সাথে তিনি শ্মশানঘাটে তোলা দুটি ছবি এবং চিতার জন্য কেনা কাঠের রসিদও তিনি প্রমাণ হিসেবে সরবরাহ করেন।

ছবিতে দৃশ্যত 'মৃত' নীরজ মোদী, যিনি ছিলেন ধর্ষণ মামলার আসামী।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, ছবিতে দৃশ্যত 'মৃত' নীরজ মোদী, যিনি ছিলেন ধর্ষণ মামলার আসামী।

ভুয়া সার্টিফিকেট

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এই ঘটনা ঘটে নীরজ মোদীর বিরুদ্ধে এক ধর্ষণের অভিযোগ গঠনের ছ’দিন পর। ২০১৮ সালের অক্টোবরে মোদীর বিরুদ্ধে ১২-বছর বয়সী এক মেয়েকে ধর্ষণ করার অভিযোগ আনা হয়। মেয়েটি ছিল তার ছাত্রী। মেয়েটিকে আখের ক্ষেতে একা পেয়ে সে তার ওপর হামলা চালায়। ধর্ষণ করার পর হামলাকারী হুমকি দিয়েছিল যে ঐ ঘটনার দৃশ্য সে মোবাইল ফোনে ধারণ করে রেখেছে এবং ঘটনা জানাজানি হলে সে ঐ ফুটেজ অনলাইনে ছেড়ে দেবে।

মেয়েটির মা থানায় অভিযোগ দায়ের করার সাথে সাথে মোদীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দু’মাস কারাগারে থাকার পর সে জামিনে বের হয়।

তবে গত বছর নীরজ মোদীর ‘মৃত্যুর’ পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তার বাবা আদালতকে তার মৃত্যুর খবর জানানোর দু’মাস পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যু সার্টিফিকেট জারি করে। গত মে মাসে, "মামলার একমাত্র আসামি" মারা যাওয়ায় আদালত মামলার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু শুধু একজন সন্দেহ করেছিলেন যে ঐ শিক্ষক বিচার এড়ানোর জন্য তার মৃত্যুর ঘটনা সাজিয়েছে এবং সাজার হাত থেকে বাঁচতে আত্মগোপন করেছে। ঐ ব্যক্তি ছিল ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটির মা, শারীরিকভাবে দুর্বল এক নারী যিনি মোদী পরিবারের সাথে একই গ্রামে একটি খুপরি বাড়িতে থাকতেন।

ছেলে নীরজ মোদীর চিতায় লাকড়ি ঢালছেন বাবা রাজারাম মোদী।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, ছেলে নীরজ মোদীর চিতায় লাকড়ি ঢালছেন বাবা রাজারাম মোদী।

"যে মুহূর্তে আমি জানলাম যে নীরজ মোদী মারা গেছেন, তখনই বুঝেছিলাম সেটা ছিল এক ডাহা মিথ্যা। আমি জানতাম সে বেঁচে আছে," সম্প্রতি আমার সাথে দেখা হওয়ার বলছিলেন ঐ নারী।

ভারতে প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে সাতটি মৃত্যু ঘটে সে দেশের প্রায় সাত লক্ষ গ্রামে এবং শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বাড়িতে। ভারতের ৫৪-বছর পুরোনো আইনের আওতায় জন্ম এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলির নিবন্ধন বাধ্যতামূলক – তবে ঐ আইনে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করতে হয়না।

বিহারে যখন কেউ মারা যায়, তখন মৃত ব্যক্তির পরিবারের কোন একজন সদস্যকে তার নিজের বায়োমেট্রিক পরিচয়ের নম্বর জমা দিতে হয় এবং মৃত্যুকে প্রত্যয়ন করার জন্য গ্রামের পাঁচজন বাসিন্দার সই নিতে হয়।

এরপর এগুলি স্থানীয় পঞ্চায়েতে জমা দিতে হয়। রেজিস্ট্রারসহ পঞ্চায়েত সদস্যরা কাগজপত্রগুলি যাচাই করেন এবং সবকিছু ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যুর সার্টিফিকেট জারি করেন৷

ধর্ষণের শিকার মেয়েটির আইনজীবী জয় করণ গুপ্তা বলছিলেন, "আমাদের গ্রামগুলিতে মানুষের বাস বেশ ঘন এবং সবাই ঘনিষ্ঠ। সবাই অন্য সবাইকে চেনে। কারও মৃত্যু হলে তা সবাই জানতে পায়, (মৃত্যুর কথা) কেউ শোনেনি এমন ঘটনা ঘটে না।"

রাজারাম মোদী পাঁচজন গ্রামবাসীর সই এবং বায়োমেট্রিক তথ্য জমা দেন এবং হলফনামায় বলেন যে তার ছেলে মারা গেছে, এবং তার ছেলের মৃত্যুর সার্টিফিকেট রয়েছে। ঐ কাগজে মৃত্যুর কোন কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে জ্বালানি কাঠের দোকান থেকে রসিদে জানা যায় যে নীরজ মোদীর মৃত্যু হয়েছে ‘রোগে’ ভুগে।

গত মে মাসের একদিন ভুক্তভোগীর মা একজন আইনজীবীর কাছ থেকে জানতে পারেন যে নীরজ মোদীর বিরুদ্ধে মামলাটি বন্ধ হয়ে গেছে কারণ সে মৃত।

হামলার পর মেয়েটির স্কুলে যাওয়া বন্ধ, সে এখন বেশিরভাগ সময় বাড়ির অন্ধকার ঘরে বসে থাকে।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, হামলার পর মেয়েটির স্কুলে যাওয়া বন্ধ, সে এখন বেশিরভাগ সময় বাড়ির অন্ধকার ঘরে বসে থাকে।

মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ

"কিন্তু শিক্ষকের মৃত্যুর কথা কেউ জানলো না কেন? মৃত্যুর পর কেন কোনো পারলৌকিক আচার অনুষ্ঠান হলো না? কেন এই মৃত্যু নিয়ে কোনো কথা হলো না?" আমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন ঐ মহিলা।

তিনি জানালেন, এরপর তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকদের কাছে জানতে চান নীরজ মোদী কী আসলেই মারা গেছে? কিন্তু কেউই শোনেনি খবরটা। এরপর বিষয়টির তদন্তের আবেদন নিয়ে তিনি আদালতে গেলে বিচারকরা তাকেই প্রমাণ করতে বলেছিলেন যে আসামী জীবিত রয়েছে।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঐ মেয়েটির মা স্থানীয় এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন যে, জাল নথির ভিত্তিতে পঞ্চায়েত একটি মৃত্যুর সার্টিফিকেট জারি করেছে, এবং এর তদন্ত হওয়া উচিত।

এর পর ঘটনা ঘটতে থাকে দ্রুত।

ঐ কর্মকর্তা তদন্তের নির্দেশ দেন এবং ঘটনাটি পঞ্চায়েতকে জানান। পঞ্চয়েত সদস্যরা তখন রাজারাম মোদীর কাছে তার ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে আরও প্রমাণ চান: "মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির ছবি, দাহ করার ছবি, জ্বলন্ত চিতার ও শেষকৃত্যের ছবি এবং [নতুন] পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য।"

পঞ্চায়েত সদস্যরা প্রায় ২৫০টি বাড়ির বাসিন্দাদের সাথে দেখা করেন। নীরজ মোদীর মৃত্যুর কথা কেউ শোনেনি বলেই তাদের মনে হয়। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু হলে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মাথা মুণ্ডন করতে হয়। কিন্তু মোদী পরিবারের সদস্যরা তখনও কেউই মাথা ন্যাড়া করেননি।

নীরজ মোদীর মৃত্যুর এই সার্টিফিকেট পরে বাতিল করা হয়।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, নীরজ মোদীর মৃত্যুর এই সার্টিফিকেট পরে বাতিল করা হয়।

ঐ ঘটনার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা রোহিত কুমার পাসওয়ান বলেন, "এমনকি নীরজ মোদীর আত্মীয়রাও তার মৃত্যু কিংবা তার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানতো না। তারা বলেছিল, যদি তার মৃত্যু হতো তাহলে বাড়িতেই তার শেষকৃত্য করা হতো।"

এরপর পঞ্চয়েত সদস্যরা রাজারাম মোদীকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু তিনি তার ছেলের মৃত্যুর স্বপক্ষে নতুন কোন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন। পঞ্চায়েত সেক্রেটারি ধর্মেন্দ্র কুমার বলেন, "আমরা যতই তাকে প্রশ্ন করছিলাম, ততই তিনি এসব প্রশ্নের কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।"

শেষপর্যন্ত তদন্তের উপসংহারে বলা হয়, নীরজ মোদী নিজের মৃত্যু জাল করেছেন এবং ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড়ের জন্য বাবা ও ছেলে দুজনেই নথি জাল করেছেন।

পুলিশ তার তদন্তে দেখতে পেয়েছে, ঐ স্কুল শিক্ষক তার পাঁচজন ছাত্রের বাবা-মায়ের বায়োমেট্রিক তথ্য জোগাড় করেন এবং নিজের মৃত্যুর সার্টিফিকেটের জন্য একটি কাগজে তাদের সই জাল করেন। তিনি অভিভাবকদের বলেছিলেন যে ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করার জন্য তাদের বায়োমেট্রিক পরিচয়ের নম্বরগুলো প্রয়োজন।

এরপর ২৩শে মে কর্মকর্তারা নীরজ মোদীর মৃত্যু সার্টিফিকেট বাতিল করে দেন। পুলিশ তার বাবাকে আটক করে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনে। "আমি আমার কর্মজীবনে কখনও এধরনের কোন মামলার তদন্ত করিনি," বলছিলেন মি. পাসওয়ান, "প্লটটি যে খুব নিখুঁত ছিল, তা কিন্তু না।"

জুলাই মাসে আদালত মামলাটি পুনরায় চালু করে বলে, আদালতকে "প্রতারিত এবং বিভ্রান্ত করা হয়েছে" এই উদ্দেশ্য নিয়ে যাতে অভিযুক্তরা "শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে।"

ঐ শিক্ষককে খুঁজে বের করার লড়াইয়ে নিরলসভাবে যুক্ত মেয়েটির মা নীরজ মোদীকে গ্রেপ্তারের জন্য আদালতে যান।

ধর্ষণের অভিযোগে নীরজ মোদীর (ডানে) ১৪ বছরের সাজা হয়।

ছবির উৎস, THE NEWS POST

ছবির ক্যাপশান, ধর্ষণের অভিযোগে নীরজ মোদীর (ডানে) ১৪ বছরের সাজা হয়।

'মানুষ কীভাবে বাতাসে উধাও হতে পারে?'

নিজেকে মৃত ঘোষণা করার নয় মাস পর অক্টোবর মাসে নীরজ মোদী আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। বিচার চলাকালে তিনি ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু তিনি যখন আদালত থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন, তখন তিনি হতাশ এবং তার হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা।

গত মাসে মেয়েটিকে ধর্ষণের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে আদালত নীরজ মোদীকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পাশপাশি ভুক্তভোগীকে তিন লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়ারও আদেশ জারি হয়। প্রতারণা আর অসততার অভিযোগে রাজারাম মোদীও এখন কারাগারে রয়েছেন, যার সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড। বাবা ও ছেলে দু’জনের বিরুদ্ধে ডেথ সার্টিফিকেট জাল করার অভিযোগ রয়েছে।

"যে আমার মেয়েকে লাঞ্ছিত করেছে তার শাস্তি নিশ্চিত করতে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি আদালতে যাতায়াত করেছি। এবং হঠাৎ একদিন তার আইনজীবী আমাকে বলে যে সে মারা গেছে। একজন মানুষ কীভাবে বাতাসে উধাও হতে পারে?" বলছিলেন ঐ মা।

"ঐ উকিল আমাকে বলেছিল যে ঐ মৃত্যুকে মিথ্যা প্রমাণ করতে হলে একটি নতুন মামলা লড়তে হবে যেখানে অনেক টাকা খরচ হবে। অন্যরা আমাকে বলেছিল যে আসামীরা জেল থেকে বের হয়ে এলে প্রতিশোধ নেবে।

"আমি এসব পাত্তা দিইনি। আমি বলেছিলাম টাকার ব্যবস্থা আমি করব। ভয় আমি পাই না। আমি বিচারক ও কর্মকর্তাদের বলেছি: আপনারা “সত্য খুঁজে বের করুন।"

ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বাড়ি বিহারের এক অজ পাড়াগাঁয়ে।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বাড়ি বিহারের এক অজ পাড়াগাঁয়ে।

ওই গ্রামে গিয়ে যা দেখা গেল

ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য বিহারের গভীরে খোলা নর্দমা, ঝোপঝাড়, হলুদ সরিষার ক্ষেত এবং ধোঁয়াটে ইঁটের ভাটা পেরিয়ে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আমি ভুক্তভোগীর গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম।

স্যাটেলাইট ডিশ দিয়ে ঢাকা ইঁটের বাড়িগুলির মধ্য দিয়ে সরু একটি পাকা রাস্তা সাপের মতো একেবেঁকে গেছে। দুই স্কুলপড়ুয়া ছেলে এবং এক মেয়েকে নিয়ে ঢেউতোলা টিন ও টালির ছাদের ছোট একটি জানালাবিহীন ইঁটের ঘরে ঐ মা থাকেন। তার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে এবং তিনি অন্য জায়গায় থাকেন।

বিষন্ন অন্ধকার ঘরে জিনিসপত্র ছিল: একটি দড়ির খাটিয়া, শস্য রাখার একটি ইস্পাতের পাত্র, একটি মাটির চুলা এবং কাপড় শুকানোর একটি দড়ি। পরিবারটির কোনো কৃষি জমি নেই।

গ্রামে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে। কিন্তু কোন কাজ নেই। মেয়েটির বাবা তাই ১,৭০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণাঞ্চলীয় এক রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছেন। সেখানে তিনি লোডার হিসাবে কাজ করেন এবং বাড়িতে টাকা পাঠান।

ভারত সরকার টয়লেট-নির্মাণের এক বিশাল কর্মসূচির পর ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন যে ভারতের শতভাগ গ্রামে আর খোলা জায়গায় মলত্যাগ করা হয় না। কিন্তু এখানে এই মেয়েটির বাড়িসহ অনেক বাড়িতে এখনও কোন টয়লেট নেই।

এ কারণেই মেয়েটি পাশের একটি আখ ক্ষেতে গিয়েছিল প্রাকৃতিক কর্ম সারতে। বিচারক কুশ কুমার তার রায়ে বলেছেন, সেই সময়টিতে নীরজ মোদী পেছন থেকে মেয়েটিকে জাপটে ধরে এবং জোর করে তাকে চেপে ধরে তাকে ধর্ষণ করে। নীরজ মোদী মেয়েটিকে চুপ থাকতে বলে, বিচারক বলেছিলেন, কারণ সে এই কাজের একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিল এবং তাকে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি ভিডিওটি ভাইরাল করে দেবেন।

'আমার মেয়ের জীবন অচল হয়ে গেছে। তার কী হবে?'

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, 'আমার মেয়ের জীবন অচল হয়ে গেছে। তার কী হবে?'

হামলার ১০ দিন পর আতঙ্কিত মেয়েটি তার মাকে বিষয়টি খুলে বলে। তার মা পুলিশের কাছে যান: পরের ক’দিন ধরে তার মেয়ে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেয় "নীরজ মোদী স্কুলে প্রায়ই আমাকে মারধর করত," সে পুলিশকে জানায়।

পুলিশ নীরজ মোদীকে গ্রেপ্তারের পর মেয়েটি আবার স্কুলে যাতায়াত শুরু করে, কিন্তু সে যখন জামিনে বেরিয়ে আসে তখন মেয়েটির স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চার বছর ধরে মেয়েটি স্কুলে যায়নি। তার স্কুলের বইগুলো বাতিল মাল হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।

'মেয়েটির কী হবে?'

ভীত এবং ফ্যাকাশে মেয়েটির এখন বেশিরভাগ সময় কাটে অন্ধকার ঘরের মধ্যে। "স্কুল ছাত্রী হিসেবে তার জীবন শেষ। তাকে বাইরে যেতে দিতেই আমি খুব ভয় পাই। আশা করছি কোন একদিন তার বিয়ে দিতে পারবো," বলছিলেন তার মা।

এই ঘটনায় অনেক প্রশ্নেরই এখনও জবাব মেলেনি। কাগজপত্র ঠিকমতো যাচাই না করে কীভাবে পঞ্চায়েত সার্টিফিকেট ইস্যু করলো? মেয়েটির মা বলছেন, "যখন আমি তাদের চ্যালেঞ্জ করলাম, তারা বলেছিল যে তারা ভুল করেছে।"

ক্যানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রভাত ঝা, যিনি বিশ্বের অকালমৃত্যুর সবচেয়ে বড় মাপের গবেষণা চালিয়েছেন, তিনি বলছিলেন, নীরজ মোদীর ঘটনাটি "খুবই অস্বাভাবিক এবং বিরল" এক ঘটনা।

"আমাদের কাজে, আমরা এমন একটি ঘটনাও দেখিনি।"

গ্রামে মৃত্যু ঘটলে তা কারও নজর এড়াতে পারে না, বলছেন ভূক্তভোগীর আইনজীবী জয়করণ গুপ্ত।

ছবির উৎস, SWASTIK PAL

ছবির ক্যাপশান, গ্রামে মৃত্যু ঘটলে তা কারও নজর এড়াতে পারে না, বলছেন ভূক্তভোগীর আইনজীবী জয়করণ গুপ্ত।

"[আইনের] অপব্যবহার খুব সম্ভবত বিরল, এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য আরও বিধিনিষেধ দেয়ার সময় আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ এসব বিষয় পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলতে পারে," বলছিলেন মি. ঝা।

কারণ: যেহেতু ভারতে মৃত্যু ও চিকিৎসা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি এবং ধনীর তুলনায় দরিদ্রের সংখ্যা কম হিসেব করা হয়, তাই পারিবারিক সম্পদের হস্তান্তর এবং অন্যান্য প্রচেষ্টাকে এটা আরও কঠিন করে তোলে এবং এটা "সম্ভবত দারিদ্র্যের ফাঁদ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।''

এখন বাড়িতে এই মায়ের জীবনও দৃশ্যত ওলটপালট হয়ে গেছে। কখনও তিনি ঝগড়াটে, কখনও তিনি নির্বিকার। কিন্তু সব সময়েই তিনি উদ্বেগের মধ্যে থাকেন।

"প্রকৃত সত্য জানার জন্য আমি গ্রামবাসী ও কর্মকর্তাদের কাছে তদবির করেছি। আমি খুশি যে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে যে ব্যক্তি এবং যে তার জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করেছে সে এখন জেলে।

"কিন্তু আমার মেয়ের জীবন অচল হয়ে গেছে। তার কী হবে?"