আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইতিহাসে প্রথমবার আউন্স প্রতি স্বর্ণের দাম ৫০০০ ডলার ছাড়ালো
- Author, পিটার হসকিন্স ও অ্যাডাম হ্যাংকক
- Role, বিবিসি
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্সে স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দামে ঐতিহাসিক উত্থান হয়েছিলো। ওই বছর এই মূল্যবান ধাতুর দাম ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার পর এটি এ বছর ফের বাড়লো।
বাংলাদেশে স্বর্ণ বিক্রি হয় ভরি হিসাবে। বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় ২২ ক্যারেট স্বর্ণে এখন ভরিপ্রতি দাম দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৯১ টাকা। স্থানীয় হিসাবে প্রতি ২.৪৩ ভরি স্বর্ণ সমান এক আউন্স হয়।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও নেটোর মধ্যে চলমান টানাপোড়েন এবং বিশ্বজুড়ে আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘণীভূত হওয়ার মাঝেই স্বর্ণের দামের ক্ষেত্রে এই উল্লম্ফন।
এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতিও বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
গত শনিবার তিনি হুমকি দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের পার্শ্ববর্তী দেশ কানাডা যদি চীনের সাথে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে দেশটির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
মূলত, যেকোনো অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা যেসব সম্পদকে নিরাপদ মনে করেন, স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু তার মাঝে অন্যতম। আর এই প্রবণতার কারণেই গত শুক্রবার রুপার দামও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্সে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
গত বছর বিশ্বব্যাপী রুপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছিল।
স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ার পেছনে আরও বেশ কয়েকটি কারণ আছে।
এর মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক বেশি মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল মার্কিন ডলার, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় অঙ্কের স্বর্ণ কেনা। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছরে আবার সুদের হার কমাতে পারে এমন কথাবার্তা বাজারকে স্বর্ণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ, পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাও স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
স্বর্ণের প্রতি সবার বড় আকর্ষণের কারণ হলো এর সীমিত প্রাপ্যতা।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে। এই পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে তিন থেকে চারটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল ভরা যাবে। এই স্বর্ণের বেশিরভাগই তোলা হয়েছে ১৯৫০ সালের পর। কারণ সেসময় খনন প্রযুক্তি আরও বেশি উন্নত হয় এবং স্বর্ণের নতুন খনি আবিষ্কার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে বলছে, ভূগর্ভে এখনও প্রায় ৬৪ হাজার টন স্বর্ণ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে উত্তোলন করা সম্ভব। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আসছে বছরগুলোতে স্বর্ণের সরবরাহ ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এবিসি রিফাইনারির ইন্সটিটিউশনাল মার্কেট বিভাগের গ্লোবাল হেড নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, "হাতে স্বর্ণ থাকা মানে কোনো ঋণের ঝামেলা নেই। যেমন, এটি বন্ডের মতো নয়, যেখানে ঋণগ্রহীতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিংবা, এটি শেয়ারের মতো নয়, যেখানে কোনো কোম্পানির পারফরম্যান্সের ওপর দাম নির্ভর করে।"
তার মতে, অনিশ্চয়তার এই বিশ্বে বিনোয়োগের জন্য স্বর্ণ খুব ভালো এক মাধ্যম।
'স্বর্ণের দিকে ছুটছে মানুষ'
২০২৫ সালটি ছিল স্বর্ণের জন্য রেকর্ড গড়ার এক বছর।
১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম স্বর্ণের দামে সবচেয়ে বড় বার্ষিক উত্থান দেখা গেছে।
কারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে স্বর্ণসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকেছেন।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর মূল্য অতিরিক্ত হয় কি না, এসব আশঙ্কায় আর্থিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে।
আর, এর প্রভাবেই স্বর্ণের দাম বারবার নতুন রেকর্ড গড়ছে।
আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেটালস ফোকাসের গবেষক নিকোস কাভলিস বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তাই এই উত্থানের বড় কারণ।"
সাধারণত অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা বাড়লে স্বর্ণের দাম বাড়ে। আবার সুদের হার কমবে, এমন আশঙ্কার কারণেও স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়।
কারণ সুদের হার কমা মানে সরকারি বন্ডের মতো বিনিয়োগে লাভ কমে যাওয়া। তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ ও রুপার মতো সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
চলতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ দুই দফা সুদের হার কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পেপারস্টোনের রিসার্চ স্ট্র্যাটেজিস্ট আহমাদ আসিরি বলেন, "এগুলোর সম্পর্ক বিপরীতধর্মী। কারণ (সুদ কমালে) সরকারি বন্ডে টাকা রেখে যে লাভ পাওয়া যায়, তখন তা আর তেমন একটা আকর্ষণীয় থাকে না। তাই মানুষ তখন স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
শুধু বিনিয়োগকারীরাই নন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ব্যাপকভাবে স্বর্ণ কিনছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শত শত টন স্বর্ণ তাদের রিজার্ভে যোগ করেছে।
নিকোস কাভলিস বলেন, "মার্কিন ডলার থেকে সরে আসার একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর এতে স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।"
চলতি বছরের শুরু থেকেই স্বর্ণের দাম বাড়তে থাকলেও নিকোলাস ফ্রাপেল সতর্ক করে বলেন, "খবরনির্ভর" এই বাজার স্বর্ণের দাম কমিয়েও ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, "অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ কোনো ইতিবাচক খবর এলো যা বিশ্ব পরিস্থিতির জন্য ভালো। কিন্তু স্বর্ণের জন্য তা ভালো নাও হতে পারে।"
তবে সবাই যে শুধু বিনিয়োগের উদ্দেশ্যেই স্বর্ণ কিনে, তা না।
অনেক সংস্কৃতিতে উৎসব বা বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে স্বর্ণ কেনা হয়।
যেমন, ভারতে দীপাবলি উৎসবকে মূল্যবান ধাতু কেনার জন্য শুভ সময় হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে স্বর্ণ বা রুপার মতো ধাতু কিনলে তা সম্পদ ও সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গ্যান স্ট্যানলির হিসেব অনুযায়ী, ভারতের পরিবারগুলোর হাতে থাকা স্বর্ণের মূল্য প্রায় তিন দশমিক আট ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি'র প্রায় ৮৮ দশমিক আট শতাংশের সমান।
এছাড়া,ভারতের প্রতিবেশী দেশ চীন স্বর্ণের সবচেয়ে বড় একক ভোক্তা বাজার। সেখানে অনেকেই বিশ্বাস করেন, স্বর্ণ কেনা মানে সৌভাগ্য বয়ে আনে।
মি. কাভলিস বলেন, চীনা নববর্ষের সময় সাধারণত স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে।
আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া 'ইয়ার অব হর্স' ঘিরেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।