আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
লুটের টাকায় টিভি-ফ্রিজ, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে হামলায় গ্রেফতারদের বিষয়ে যা বলছে পুলিশ
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মব সৃষ্টি করে সম্প্রতি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুইটি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার এবং দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অন্তত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সোমবার সকাল পর্যন্ত এসব ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হামলার রাতে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ লুট করেছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।
এর মধ্য থেকে ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন কর্মকর্তারা। বাকি টাকা দিয়ে ওই ব্যক্তি টিভি ও ফ্রিজ কিনেছেন, যা জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
গ্রেফতারকৃত কারো কারো নামে মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। রয়েছে অতীতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগেও।
হামলার ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ দেখে এমন অন্তত ৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
হামলার তিনদিন পর ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৪০০ থেকে ৫০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে সােমবার মামলা করেছে প্রথম আলাে।
হামলায় সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩২ কোটি টাকা বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে হওয়া ওই হামলার ঘটনা ঘিরে দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন মহলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নিন্দা জানিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার হামলার ঘটনাটিকে 'গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত' এবং 'বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ভয়াবহ মুহূর্ত' বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
কিন্তু হামলাকারীদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক কী ব্যবস্থা নেয়, সেটি দেখার অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে।
ঘটনার তিনদিন পর সােমবার অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে ৩১ জনকে শনাক্ত এবং ১৭ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানানো হলো।
এছাড়া হামলার শিকার গণমাধ্যম দু'টির নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
"পত্রিকা দু'টির সম্পাদকের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বাসায়ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে," সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেন মি. চৌধুরী।
মামলা করেছে প্রথম আলো
মব সৃষ্টি করে কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা চারশ থেকে পাঁচশ জন ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেছে প্রথম আলো।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে রোববার রাতে ঢাকার তেজগাঁও থানায় মামলাটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যমটির কর্মকর্তারা।
মামলায় 'দাঙ্গা সৃষ্টি করে অবৈধভাবে কার্যালয়ে ঢুকে লুটপাট, ক্ষতি করা, হত্যার উদ্দেশ্যে অগ্নিসংযোগ, ভয় দেখানো, পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ এবং অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করার' অভিযোগ করা হয়েছে।
সেইসঙ্গে, পত্রিকাটির কার্যালয়ে হামলা চালানোর জন্য অনলাইনে 'প্রচারণা চালানো ও নির্দেশনা' দেওয়ারও অভিযোগ আনা হয়েছে।
হামলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যে কার্যালয় থেকে লুট হওয়া সম্পদের মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা প্রথম আলো ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলার পাশাপাশি ঘটনার তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে।
এছাড়া আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসকেও বাধা দেয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার এই ঘটনার কারণে প্রতিষ্ঠার পর গত ২৭ বছরে ছুটি বাদের প্রথমবারের মতো ছাপা পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেনি দৈনিক প্রথম আলো।
এছাড়া প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণের কার্যক্রমও প্রায় ১৭ ঘণ্টা বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
একইভাবে, সাড়ে তিন দশকের ইতিহাসে দ্য ডেইলি স্টারও ১৯শে ডিসেম্বর তাদের ছাপা পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেনি।
তবে প্রথম আলোতে হামলার ঘটনায় মামলা হলেও ডেইলি স্টারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ হয়নি হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
"ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ডেইলি স্টারের মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে," সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ডিএমপি'র অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম।
গণমাধ্যম দু'টি ছাড়াও ১৮ই ডিসেম্বর গভীর রাতে ধানমন্ডিতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন ও শেখ মুজিবের বাসভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এছাড়া পরদিন ১৯শে ডিসেম্বর রাতে ঢাকার তোপখানা রোডে অবস্থিত সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়।
পরিকল্পিতভাবে ওই হামলা চালানো হয়েছে অভিযোগ করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানায় উদীচী।
গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান
গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে ঘটনার ঘটনার তিনদিন পর সোমবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানাে বিবৃতিতে নয়জনের গ্রেফতারের তথ্য জানানো হয়।
পরে দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জানায়, হামলার ওইসব ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
""হামলার ভিডিও বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত ৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হল," ব্রিফিংয়ে বলেন ডিএমপি'র অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম।
তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান পুলিশের কর্মকর্তারা।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
গ্রেফতার হওয়া নয় ব্যক্তির মধ্যে সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছে পুলিশ। অন্য দু'জনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
এছাড়া গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলায় ঘটনার ভিডিও দেখে অন্তত ৩১ ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাই কমিশনারের বাসভবনের সামনে 'বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টাকারীদের' মধ্যে তিনজনকে ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে বলে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানানো হয়েছে।
লুটের টাকায় টিভি-ফ্রিজ
গত ১৯শে ডিসেম্বর গভীর রাতে যারা দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছিলেন, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল বিভিন্ন ফুটেজে তাদের অনেককে ঘটনাস্থল থেকে অর্থ, ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ নানা মালামাল লুট করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
ভিডিও ফুটেজ দেখে লুটপাটকারী কয়েক জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তাদের মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সোমবার বিবৃতিতে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
ঢাকার তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ওই ব্যক্তিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় থেকে গ্রেফতার করা হয়।
হামলার সময় নগদ এক লাখ ২৩ হাজার টাকা লুট করেছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে প্রেস উইং থেকে পাঠানাে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যে নগদ ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
বাকি টাকা দিয়ে লুটকারী ওই ব্যক্তি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ কিনেছেন, যা ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের নামে মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ঢাকার কারওয়ান বাজার রেললাইন এলাকা থেকে।
একই এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া আরেক জনের নামে অতীতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দু'টি মামলা রয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘোষণা আসার পর একদল হামলাকারী দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়, এতে দুটি অফিসেই ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।
শুক্রবার সকালে বিবিসি সরেজমিনে গিয়ে দেখেতে পেয়েছে, ঢাকার কারওয়ানবাজারে অবস্থিত প্রথম আলোর চারতলা ভাবনটি পুরোপুরি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গা থেকে তখনও ধোয়া উঠতে দেখা যায়।
আর হামলাকারীদের দেওয়া আগুনে ডেইলি স্টার অফিসের নিচ তলা ও দোতলা পুড়ে গেছে। অফিসের ভেতরে ভাঙচুর করে ফেলে রাখা জিনিসপত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়।