বাংলা সনের প্রবর্তক আকবর নাকি শশাঙ্ক - এ নিয়ে কলকাতায় নতুন বিতর্ক

ছবির উৎস, prabir bhattacharya
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক বেঁধেছে কলকাতাতেও। নতুন একটি শোভাযাত্রায় বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ককে তুলে ধরা হবে বলে আয়োজকরা জানানোর পরেই বিতর্কের জন্ম।
শশাঙ্ক না মুঘল সম্রাট আকবর- কে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন, সেই বিতর্ক কয়েক বছর ধরে চললেও তা ছিল মূলত অ্যাকাডেমিক আলোচনা।
তবে এবারে শোভাযাত্রা থেকে শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলে প্রচার করা এবং শশাঙ্কের মূর্তি সামনে নিয়ে শোভাযাত্রা করায় আপত্তি তুলছেন দীর্ঘদিন ধরে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করে, এমন সংগঠনগুলি।
শশাঙ্ককে সামনে রেখে যে সংগঠনটি মঙ্গল শোভাযাত্রা করবে ১৫ই এপ্রিল, সেই বঙ্গীয় সনাতনী সংস্কৃতি পরিষদের সঙ্গে আরএসএসের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। যদিও তারা দাবী করছেন যে তাদের সংগঠনে সবাই আরএসএসের ঘনিষ্ঠ নয়।
সংগঠনটির সম্পাদক প্রবীর ভট্টাচার্যের কথায়, “বঙ্গাব্দের প্রবর্তক যে আকবর, সেটা বাংলাদেশ থেকে আসা একটা ভাষ্য। এই তত্ত্ব আগে তো শোনা যায় নি। বাংলা ক্যালেন্ডারের মাসগুলো যদি দেখেন, তাহলে দেখবেন বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ – সবগুলোই হিন্দু নক্ষত্র ও রাশিচক্র অনুযায়ী হয়েছে। একজন মুসলমান শাসক কেন এধরনের মাসের নাম দেবেন?
“যেটা বলা হচ্ছে যে আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে প্রথমত বাংলায় কোনওদিন আসেন নি বা তার সুপরিচিত সেনাপতিরাও আসেন নি। তাই বাংলার জন্য একটা আলাদা ক্যালেন্ডার তিনি চালু করতে যাবেন কেন? এছাড়া, তিনি তো অন্যান্য অনেক প্রদেশেই রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন, কই- সব প্রদেশের জন্য তো ক্যালেন্ডার করেন নি তিনি?” ব্যাখ্যা মি. ভট্টাচার্যের।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
হিন্দুত্ববাদীরা শশাঙ্ককে তুলে ধরার চেষ্টা করছে
আরএসএস দীর্ঘদিন ধরেই মুঘল সাম্রাজ্য এবং মুসলমান শাসনকালকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলে ঐতিহাসিকরা বলে থাকেন।
সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ের স্কুল পাঠ্য ইতিহাস বই থেকেও মুঘল শাসনামলের অধ্যায়টি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার পিছনেও আরএসএসের চিন্তাধারাই কাজ করেছে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন।
হিন্দুত্ববাদীরা শশাঙ্ককে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে তার নাম প্রচারে নিয়ে আসাও সেই প্রচেষ্টারই অঙ্গ বলে মনে করা হয়।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে একজন সামন্ত রাজা। তবে পরে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম গৌড়ভূমির শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
রাজা শশাঙ্ক মারা গিয়েছিলেন ৬৩৭ বা ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। প্রায় ৪৫ বছর তিনি রাজত্ব করেছিলেন এবং তার রাজত্বকাল শুরুর সময় থেকেই, ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দ চালু করা হয়।
বঙ্গাব্দর সঙ্গে খ্রিস্টাব্দের ব্যবধানও ঠিক ৫৯৩ বছরের।

ছবির উৎস, Getty Images
'শশাঙ্ক বঙ্গাব্দ চালু করেন- এই প্রমাণ নেই'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শশাঙ্ক না আকবর কে বঙ্গাব্দ প্রচলন করেছিলেন, এই বিতর্কে সনাতনী সংস্কৃতি পরিষদের ব্যাখ্যার বিরোধিতা করছে ভাষা ও চেতনা সমিতি।
তারাই সিকি শতক ধরে কলকাতায় রাতভর নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠান এবং সকালে শোভাযাত্রা হয়ে আসছে শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত অ্যাকাডেমি চত্বরে।
আবার ঢাকার আদলে দক্ষিণ কলকাতাতেও একটি মঙ্গল শোভাযাত্রা হচ্ছে বছর কয়েক ধরে।
সবথেকে পুরণো বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আর শোভাযাত্রার আয়োজনকারী ভাষা ও চেতনা সমিতির প্রধান ইমানুল হক বলছেন, “বাঙালী হিসাবে গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের জন্য আমরা গর্বিত ঠিকই, কিন্তু তিনি যে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেছিলেন, এমন কোনও তথ্য কিন্তু ইতিহাসে পাওয়া যায় না। আর ইতিহাস তো ইতিহাসই, একটা তত্ত্ব জোর করে চাপানো হচ্ছে।
“যদি শশাঙ্কই বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করে থাকবেন, তাহলে তার যেসব ফলক বা শিলালিপি পাওয়া যায়, সেখানে তো তিনি বঙ্গাব্দের উল্লেখ করতেন! আবার সাহিত্যে যদি দেখেন, শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যের রচনাকার মালাধর বসু লিখছেন, তেরোশো পঁচানব্বই শকে হইল গ্রন্থ আরম্ভন, চতুর্দশ দুই শকে হইল সমাপন। এখানে শক মানে শকাব্দ। তখন যদি বঙ্গাব্দই চালু থাকবে, তাহলে তো তিনি শক না লিখে বঙ্গাব্দই লিখতেন,” বলছিলেন ইমানুল হক।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রা কি বাঙালি ঐতিহ্যকে তুলে ধরে?
প্রবীর ভট্টাচার্যে অবশ্য তাদের তত্ত্বে হিন্দুত্বের প্রসঙ্গ আনতে চাইছেন না।
তার কথায়, “আমাদের এই তত্ত্বে ধর্ম নিয়ে আসছি না। প্রচারে তুলে ধরছি বাঙালী ঐতিহ্য, বাঙালী সংস্কৃতিকে।
“সেজন্যই আমাদের শোভাযাত্রায় সামনে যেমন শশাঙ্কের মূর্তি থাকবে, তেমনই বাঙালী সংস্কৃতি ঐতিহ্যস্বরূপ শ্রীখোল, ঢাক, চামরসহ গৌড়ীয় নৃত্য, কীর্তন, ভাষা, কাব্য আমরা তুলে ধরব।
তিনি আরও বলছেন যে তাদের শোভাযাত্রার নামও মঙ্গল শোভাযাত্রা, তবে ঢাকায় যে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়, সেটা বাঙালি ঐতিহ্য মেনে হয় না।
“তারা প্যাঁচা, সাপ এসব নিয়ে শোভাযাত্রা করে, এগুলো তো বাঙালিয়ানার ঐতিহ্য নয়। বাঙালির ঐতিহ্য হল দুর্গাপুজো, শঙ্খ, তুলসীমঞ্চ, কলাগাছ। আমরা এগুলোকেই তুলে ধরব আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রায়,” বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।
ইমানুল হক মনে করেন, শশাঙ্ককে হিন্দু রাজা বানানোর চেষ্টা যারা করছেন, তাদের ইতিহাসটা ভাল করে পড়া দরকার।
“তার আমলে হিন্দু শব্দটাই তো ছিল না, সেটা তো মুঘল আমলে সরকারিভাবে প্রচারিত হয়, শব্দটা আবার ফার্সি।
“আসলে ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রা বলুন বা আমাদের বর্ষবরণের উৎসব- কোথাও মুসলমান মৌলবাদীরা ফতোয়া জারি করছে, কোথাও সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠরা শশাঙ্ককে তুলে ধরতে চাইছে মুঘল সম্রাট আকবরের বিপরীতে। বাঙালিরা মনে হয় না এটা মেনে নেবে,” বলছিলেন মি. হক।








