প্রথম আলো সাংবাদিক শামসুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

ছবির উৎস, Facebook Profile
বাংলাদেশের প্রথম সারির দৈনিক প্রথম আলোর সাংবাদিক শাসুজ্জামান শামসের জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
প্রায় ত্রিশ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিক মি. শামসকে ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। বুধবার ভোর রাতে সাভারের বাসা থেকে সিআইডি পরিচয়ে একদল মানুষ তাকে তুলে নিয়ে যায়।
মি. শামসকে রমনা থানায় দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা।
পুলিশ আদালতে বলেছে যে আসামী মি. শামস জামিনে মুক্তি পেলে মামলার তদন্তে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ যুক্তি দেখিয়ে পুলিশের তরফ থেকে মি. শামসকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়।
অন্যদিকে মি. শামসের আইনজীবী তার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলাতে জামিন আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানী শেষে সাংবাদিক শামসকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।
এর আগে গত ২৯শে মার্চ তেজগাঁও থানায় মি. শামসের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি দায়ের করা হয়। সে মামলার বাদী ছিলেন সৈয়দ মো. গোলাম কিবরিয়া নামে এক ব্যক্তি। তার অভিযোগ, প্রথম আলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে ‘ভুল তথ্য, মিথ্যা পরিচয় ও মিথ্যা উদ্ধৃতি’ দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
তবে অভিযোগ হচ্ছে, এই মামলা দায়েরের আগেই মি. শামসকে তার বাড়ি থেকে বুধবার ভোররাতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
মি. শামসকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার বাসায় ছিলেন ঢাকার আরেকটি পত্রিকার সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম সাব্বির।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, রাত চারটার দিকে তিনটি মাইক্রোবাস নিয়ে সাদা পোশাকের একদল লোক বাসা থেকে শামসুজ্জামান শামসকে ধরে নিয়ে যায়। তারা নিজেদের সিআইডির টিম বলে পরিচয় দিয়ে জানিয়েছে তারা ঢাকা থেকে এসেছে।
সেই থেকে বৃহস্পতিবার আদালতে তোলা পর্যন্ত মি. শামসের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ছবির উৎস, Nir Rony
দ্বিতীয় মামলা রমনায়
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গত ২৬শে মার্চ দৈনিক প্রথম আলোয় শামসুজ্জামান শামসের লেখা একটি প্রতিবেদনকে ঘিরেই এতো ঘটনাপ্রবাহ।
ওই প্রতিবেদনে একজন দিনমজুরের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে উদ্বৃত করা হয়, ‘’পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব’’।
এই উদ্ধৃতির সঙ্গে একটি শিশুর ছবি ছিল, যে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে স্মৃতিসৌধের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্ট ও খবরের স্ক্রিনশট বেশ ভাইরাল হয়।
প্রতিবেদনে ওই উক্তিটি আরেক ব্যক্তির হলেও শিশুটির ছবির বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ পোস্টটি সংশোধন করলেও এই খবরটিকে 'মিথ্যা' ও 'রাষ্ট্রবিরোধী' উল্লেখ করে বুধবার রাতে রমনা মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করা হয়।
সেখানে প্রথম আলোর সম্পাদক, ক্যামেরা পারসনসহ, প্রতিবেদনটি প্রচার-প্রকাশে জড়িত অজ্ঞাতদেরও আসামী করা হয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ এর (২), ৩১, ৩৫ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেয়া আব্দুল মালেক।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “প্রথম আলো ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা দেশের শান্তি শৃঙ্খলা এবং দেশের ভাবমূর্তিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। দেশের ভেতরে অস্থিতিশীল ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এর বিচার হওয়া দরকার।”
এই মামলাটি তদন্তের জন্য রমনা থানার একজন পরিদর্শককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই পরিদর্শকই তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছিলেন।
তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে সাংবাদিকরা গতরাতে রমনা থানায় জড়ো হলেও কেউ কথা বলেননি। ফোনে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কেউ সাড়া দেননি। মি. শামসের ফোন বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।

ছবির উৎস, Family Handout
মন্ত্রীরা যা বলছেন
মি. শামসকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গ্রেফতারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে বলেছিলেন, মামলার ভিত্তিতে প্রথম আলোর সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে তাকে কোন বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুতে কিছুই জানা যায়নি। সিআইডি বা স্থানীয় পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আটকের বিষয়টি তাদের জানা নেই।
তবে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, শামসকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি আটক করে। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, “প্রথম আলোর যে তথ্যগুলো পত্রিকায় এসেছে, বা মিডিয়ার মাধ্যমে এসেছে সেগুলোর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেয়ার পরে সে যখন আরও যে বেশ কয়েকটি মামলা বিভিন্ন স্থানে হয়েছে সেই মামলাগুলোয় তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছে।”
এই প্রতিবেদনকে "মিথ্যা" আখ্যা দিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, এ মাধ্যমে প্ররাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "এটি রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এই এ ধরণের সংবাদ পরিবেশন, সর্ব মহলের মতে এটি তো একটি অপরাধ, ডিজিটাল অপরাধ এবং অপরাধ ও সাংবাদিকতা এক জিনিষ নয়। কোন সাংবাদিক যদি অপরাধ করে তার কি শাস্তি হবে না? এই মামলা নিজ গতিতে চলবে।"
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দেশের স্বাধীনতা ইস্যুতে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান,
“বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান, এটা এতো ঠুনকো নয় যে যেকোন কিছুর সাথে এটাকে তুলনা করা যাবে। আমাদের সকলেরই দায়িত্ববান হওয়ার প্রয়োজন আছে।”
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এমন পদক্ষেপ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে নয়, মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে।
গত ২৬শে মার্চ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে পোস্ট দেওয়ার ১৭ মিনিটের মাথায় প্রথম আলো খবরটি সংশোধন করে।
সংশোধনীর বিষয়টি উল্লেখসহ পরে প্রতিবেদনটি আবার অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথমে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের শিরোনাম এবং ব্যবহার করা ছবির মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় ছবিটি তুলে নেয়া হয়েছে এবং শিরোনাম সংশোধন করা হয়েছে।











