রাজবাড়ীতে 'পিটিয়ে হত্যা'র ঘটনা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images
রাজবাড়ী জেলার পাংশায় একজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ঘটনার ব্যাপারে তিনটি মামলা হয়েছে। একটি মামলায় হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আসলে কী ঘটেছিল সেখানে-এ নিয়ে পুলিশ, স্থানীয় লোকজন ও নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।
পাংশা উপজেলায় পরিচিত নাম সন্ত্রাসী সম্রাট। এই নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সম্রাটের আসল পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে।
স্থানীয়দের অনেকে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকাবাসীর আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল এই নামটি। পুলিশের তালিকায় যার আসল নাম অমৃত মণ্ডল।
বুধবার গভীর রাতে পাংশার হোসেনডাঙা গ্রামে গণপিটুনিতে এই অমৃত মণ্ডলেরই মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে সে।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা অবশ্য দাবি করেছেন, ২০১৪ সালে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন অমৃত মণ্ডল। এরপর আর কখনই বাড়িতে ফেরেনি সে। সন্ত্রাসী সম্রাটের নাম শুনলেও অমৃতই যে সম্রাট এটিও নিশ্চিত নন তারা।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পাংশা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি কেবলই চাঁদাবাজির ঘটনা নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, সেটি যাচাই করবেন তারা।
"যে গ্রামে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে সেখানে এক মাস আগে সম্রাটের নাম করে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। যাদের কাছে চাওয়া হয়েছিল তারা পুলিশকে বিষয়টি জানায়নি, কেনো জানানো হলোনা এ নিয়ে আমরা তাদেরকেও প্রশ্ন করেছি," বিবিসি বাংলাকে বলেন পাংশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মঈনুল ইসলাম।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা এবং দেশি বিদেশি কিছু গণমাধ্যমে এই ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়। যেখানে ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু দাসের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে সংখ্যালঘু হত্যার বিষয়টিকে আবারো সামনে আনা হয়েছে।
এসব আলোচনার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে পাংশার ঘটনা নিয়ে একটি বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মামলার এজাহার এবং পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সম্রাট বাহিনী।
হোসেনডাঙ্গা এলাকার কৃষক শহীদ শেখের কাছে এক মাস আগে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসী সম্রাট। টাকা না দেওয়ায় একাধিকবার তাদেরকে নানা হুমকিও দেওয়া হয়।
গত বুধবার রাতে কৃষক শহীদ শেখের বাড়িতে হানা দেয় ছয় থেকে সাত জনের একটি সশস্ত্র দল। অস্ত্রের মুখে অর্থ দাবি করে এবং মারধর করে শহীদ শেখের ছেলে এবং ভাতিজাকে।
তাদের চিৎকারে আশপাশের বাসিন্দারা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এসময় গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে সম্রাট ও সেলিম নামে দুইজন।
ওই এলাকার ওয়ার্ড মেম্বর আব্দুল আলি বিবিসি বাংলাকে জানান, বুধবার রাতে সম্রাট ও তার বাহিনী শুরুতে হোসেনডাঙার সাজুরিয়া ইট ভাটায় হামলা করে। সেখানে ভাটা শ্রমিকদের মারধরের পর শহীদ শেখের বাড়িতে যার তারা।
"ওই বাড়িয়ে গিয়ে মারধর করছিল, চাঁদা চাইছিল মনে হয় পায় নাই। পরে এলকাবাসী ডাক ভাঙে ওগের ধরে মারধর করেছে," বলেন মি. আলি।
তিনি বলেন, ভারতে থেকেও দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতো অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাট। সরকার পরিবর্তনের পর এলাকায় তার কার্যক্রম বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।
রাত সোয়া বারোটার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে সম্রাট ও সেলিমকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাটকে মৃত ঘোষণা করেন। আর গুরুতর আহত সেলিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পাংশা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মঈনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, গ্রামবাসীদের কাছ থেকে সম্রাট এবং সেলিমকে উদ্ধারের সময় তাদের কাছে থাকা একটি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটার গান এবং চার রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।

ছবির উৎস, SCREEN GRAB
পুলিশ বলছে, নিহত অমৃত মণ্ডল আগে থেকেই ওই এলাকায় নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। তার নামে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানানো হয়।
"এলাকার বাইরে থাকে, মাঝেমধ্যে এসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে আবারও চলে যায়। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এতটাই বেপরোয়া যে কেউ মামলা করতেও সাহস পায় না," বলেন মি. ইসলাম।
তিনি জানান, একাধিক মামলার কারণে ওয়ান্টেড লিস্টে থাকায় গত সরকারের আমলেও তাদেরকে চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কাজের জন্য আটকের চেষ্টা করেছে পুলিশ।
তবে চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে ভুক্তভোগী শহীদ শেখ পুলিশের কাছে আগে থেকেই কোনো অভিযোগ করেছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পাংশা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলছেন, "ভয়ের কারণে থানায় জানায়নি তারা।"
এই ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অস্ত্র আইনে একটি মামলা করেছে পুলিশ, চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা করেছে শহীদ শেখের পরিবার এবং নিহত অমৃত মন্ডল ওরফে সম্রাটের ভাই অমিয় মণ্ডলের স্বাক্ষরে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নিহতের ভাইয়ের স্বাক্ষরে দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অমৃত মণ্ডল ১২ থেকে ১৪ বছর আগে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। সেখান থেকে মাঝে মধ্যে দেশে এসে বিভিন্ন খারাপ লোকজনের সঙ্গে চলাফেরা করতো সে।
হোসেনডাঙা গ্রামের শহীদ শেখের বাড়িতে চাঁদা দাবি করে সে হামলা করে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও বিবিসি বাংলাকে অমিয় মণ্ডল বলেছেন, এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না তিনি। বুধবার পুলিশ বাড়িতে গিয়ে তাদেরকে থানায় ডেকে নেয়। পরে একটি কাগজে সই করিয়ে নেয়এবং তাদের জানায় ঘটনা নিয়ে মামলা করা হবে।।
অমিয় মণ্ডল বলেন, পরিবারের সঙ্গে তার ভাইয়ের কোনো যোগোযোগ ছিল না। সে দীর্ঘদিন ধরে ভারতে তার পরিবার নিয়ে বসবাস করছে বলেও জানান তিনি।
"আমি কিছুই জানতাম না পুলিশ এসে ডেকে নিল, থানায় গিয়ে একটি কাগজে দুইটা সই করায় নিল আর বললো আপনার ভাইয়ের লাশ এটা," বলেন তিনি।
এছাড়া, তার ভাই অমৃতই সন্ত্রাসী সম্রাট কিনা এটিও নিশ্চিত নন তিনি। "আমাকে অনেকে বলেছে যে তুমার ভাই চাঁদা চাইছে, ভারতে গিয়েও নাকি আমার ভাই এই দেশে দল চালায়," বলেন মি. মণ্ডল।

ছবির উৎস, CHIEF ADVISER GOB FACEBOOK
বিবৃতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার
অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাটকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করে সংবাদ প্রকাশ করেছে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও পোস্ট করেছেন অনেকে।
এমন প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
পুলিশের তথ্য ও প্রাথমিক তদন্তে উল্লেখ করে বিবৃতি বলা হয়েছে, ঘটনাটি মোটেই সাম্প্রদায়িক হামলা নয়। এটি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত সহিংস পরিস্থিতির থেকে সৃষ্ট ঘটনা।
"নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী অমৃত মন্ডল ওরফে সম্রাট চাঁদা দাবির উদ্দেশ্যে এলাকায় উপস্থিত হন এবং বিক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতার সঙ্গে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে প্রাণ হারান," বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি মহল নিহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত।
বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক ও সাম্প্রদায়িক বক্তব্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকার বলছে, আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, গণপিটুনি বা সহিংসতা সরকার সমর্থন করে না।
এছাড়া এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।








