এক নেতার 'আমার সোনার বাংলা' গাওয়া নিয়ে তদন্তের মুখে আসামের কংগ্রেস

ছবির উৎস, Screengrab
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'আমার সোনার বাংলা' গানটির প্রথম দুই লাইন গেয়ে নিজের বক্তৃতা শুরু করেছিলেন আসামের বাঙালি অধ্যুষিত শ্রীভূমি জেলার এক কংগ্রেস নেতা।
সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পুরো জেলা কংগ্রেস কমিটির বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত সোমবার, বরাক উপত্যকায় বাংলাদেশ লাগোয়া জেলা শ্রীভূমিতে (সাবেক করিমগঞ্জ জেলা) কংগ্রেসের একটি সভা ছিল। বুধবার থেকে সেই সভার ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও শেয়ার করতে থাকেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা।
ওই ভিডিওতে দেখা যায় এক প্রবীণ কংগ্রেস নেতা বিধুভূষণ দাস 'আমার সোনার বাংলা' গানটির প্রথম দুই লাইন গাইছেন এবং তারপরে 'বন্ধুগণ' বলে তার ভাষণ শুরু করতে যাচ্ছেন।
ভিডিওটি ব্যাপকভাবে শেয়ার করতে শুরু করেন বিজেপির নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সামাজিক মাধ্যম। তারা বলতে থাকেন যে বাংলাদেশের এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা যখন উত্তর-পূর্ব ভারত তাদের দেশের অংশ বলে দাবি করছেন, সেরকমই একটা সময়ে দলীয় সভায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গেয়ে কংগ্রেস আসলে বাংলাদেশি নেতাদের সেই 'আখ্যান'কেই জোরদার করছে।
তবে যে কংগ্রেস নেতার গান গাওয়া নিয়ে বিতর্ক, সেই বিধুভূষণ দাস বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে সেদিনের সভা শুরু হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা 'বন্দে মাতরম্' গেয়ে, আর শেষে গাওয়া হয়েছিল ভারতের জাতীয় সংগীত 'জন গণ মন অধিনায়ক' দিয়ে।
আসাম কংগ্রেস অবশ্য বলছে যে, ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ঠিকই, কিন্তু তাই বলে গানটি ভারতে কেন গাওয়া যাবে না? তারা এও বলেছে, রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া নিয়ে এই বিতর্ক তুলে বিজেপি আসলে তাদের বাঙালি-বিরোধী মনোভাব আবারও স্পষ্ট করল।
'গানের এক কলি গেয়ে কোনো অন্যায় করিনি'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শ্রীভূমি জেলার যে প্রবীণ কংগ্রেস নেতার 'আমার সোনার বাংলা' গাওয়া নিয়ে বিতর্ক এবং পুলিশি তদন্ত হচ্ছে, সেই বিধুভূষণ দাসের সঙ্গে বিবিসি বাংলা কথা বলে বৃহস্পতিবার সকালে।
তার কাছে জানতে চাওয়া হয় যে তার দলের ওই সভায় ঠিক কী কী হয়েছিল সোমবার।
"জেলা কংগ্রেস কমিটির একটা সভা ছিল সেদিন, হাজির ছিলেন আসাম কংগ্রেস সেবাদলের প্রেসিডেন্ট দীপ বায়েন। আমরা শুরু করেছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম্ গান গেয়ে। সভা শেষ হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে। মাঝে ভাষণ চলছিল"।
"কংগ্রেসের এক কর্মী হিসেবে আমাকেও ভাষণ দিতে বলা হয়। ভাষণ দিতে উঠেই আমার মনে পড়ে গেল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটা। তখনই আমার মনে হলো যে রবীন্দ্রনাথ আর বাংলার সম্মাননায় আমি এই গানটির এক কলি গাইব"।
"এক কলিই কিন্তু গেয়েছি – আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। আমি কোনো অন্যায় করিনি। যদি অন্যায় করে থাকি, তাহলে শাস্তি তো পেতেই হবে," বলছিলেন মি. দাস।
বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীদের একাংশ যে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাওয়াকে 'দেশদ্রোহিতা'র শামিল বলছে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মি. দাস বলেন, "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গাওয়া কখনই দেশদ্রোহিতা হতে পারে না। এই গান তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯০৫ সালে, তখন তো কারও জানাই ছিল না যে বাংলাদেশ নামে একটি দেশের জন্ম হবে, সেদেশের জাতীয় সংগীত হবে এই গান!"

ছবির উৎস, Getty Images
'ভারতের জাতীয় সংগীতের বদলে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত'
কংগ্রেসের দলীয় সভাটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই বিজেপির নেতারা তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করতে শুরু করেন।
কোথাও লেখা হয় বাংলাদেশের এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতারা যখন ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলকে তাদের অংশ বলে দাবি করতে শুরু করেছেন, তখনই কংগ্রেস সেদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে তাদের আসল 'প্রীতি' কাদের প্রতি, সেটা স্পষ্ট করল।
অন্যদিকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, "শ্রীভূমি জেলার কংগ্রেস কমিটি ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়ার বদলে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গেয়েছে। এটা ভারতের নাগরিকদের ও ভারতের জাতীয় সংগীতের মর্যাদাহানি।
"বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কিছু নাগরিক দাবি করছেন যে উত্তর পূর্বাঞ্চল এক সময়ে বাংলাদেশের অংশ হয়ে যাবে। কংগ্রেসের জেলা কমিটি সেদেশের জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে সেই দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি যাতে শ্রীভূমি জেলা কংগ্রেস কমিটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়," বলছিলেন মি. বিশ্ব শর্মা।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ অবশ্য তার দলের সভায় 'আমার সোনার বাংলা' গাওয়ার পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেছেন যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই গানটি বাঙালিদের অনুভূতির প্রকাশ।
"বিজেপি সবসময়েই বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি আর বাংলার মানুষকে অপমান করে এসেছে। এখন তারা যেটা করছে, তাতে আবারও স্পষ্ট হল যে তারা বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহ্য আর তার দর্শনের ব্যাপারে কতটা অজ্ঞ। আমার মনে হয় বাংলার মানুষ আর দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিরা বুঝতে পারছে যে বিজেপি শুধুই ভোটের জন্য তাদের ব্যবহার করে, অথচ কখনই তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি বা তাদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে না," সাংবাদিকদের বলেছেন মি. গগৈ।

ছবির উৎস, Dainik Bartalipi
'রবীন্দ্রনাথের গান কেউ গাইতে পারবে না?'
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়া এবং এ নিয়ে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আর পুলিশি তদন্ত বাঙালি অধ্যুষিত বরাকের বহু মানুষকে বিস্মিত করেছে।
তারা বলছেন যে, রবীন্দ্রনাথের গান গাইলে পুলিশি তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে কেন?
শিলচরের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. তপোধীর ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "রবীন্দ্রনাথের গান বা তার কোনো কবিতা বা লেখা কেউ বলতে পারবে না, এটার মতো বিস্ময়কর ঘটনার কথা আমি ভাবতেই পারি না। এরকম ঘটনা যখন হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা এক ভয়ংকর সময়ের মধ্যে প্রবেশ করেছি"।
"এর নিন্দা জানানো ছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই। আশা করব সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে থেকে এর একটি তীব্র প্রতিবাদ হোক," বলছিলেন অধ্যাপক ভট্টাচার্য।








